দগ্ধ রোগীকে নিয়ে দৌঁড়াদৌড়ির সঙ্গী হয় শয্যা সংকট। আবার সংকটাপন্ন-মুমূর্ষু অবস্থায় নেওয়া হয় ঢাকায়। নেওয়ার সময় পথিমধ্যে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া।
এটি চট্টগ্রামে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়া রোগীর চিকিৎসা ও শেষ পরিণতির চিত্র। স্বাধীনতার পর প্রায় পাঁচটি দশক পার করলেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর এবং বাণিজ্যিক রাজধানীর আগুনে পোড়া-দগ্ধ রোগীর ভাগ্যটা এভাবেই লেখা।
তবে দীর্ঘ সময় পর বিলম্বে হলেও চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সংলগ্ন গোয়াচি বাগান এলাকায় পৃথক বার্ন এবং প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট নির্মিত হচ্ছে।
প্রথম দিকে স্থান সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্মাণে জটিলতাসহ নানা সমস্যা-সংকট পেরিয়ে এখন আলোর পথে চমেক হাসপাতাল বার্ন ইনস্টিটিউট নির্মাণ। এরইমধ্যে মিলছে সরকারি অর্থের দুই দফা বরাদ্দ। কাজ শেষ হয়েছে ৩৫ শতাংশ। চীন থেকে আসছে নির্মাণসামগ্রী। ফলে এখন ভবন নির্মাণ কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। বর্তমানে চতুর্থ তলার কাজ চলছে।
ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে ২৮ পদে ৪৭১ জনবলের প্রস্তাব। তাছাড়া, চীনা প্রযুক্তিতে পাহাড় রক্ষা করে ভবন নির্মাণ করার প্রক্রিয়াটি এখন চট্টগ্রামে পাহাড় রক্ষার দৃষ্টান্ত হিসাবে কাজ করছে।
চমেক হাসপাতাল সংলগ্ন গোয়াচিবাগান এলাকায় ২৮৪ কোটি ৭৬ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ বার্ন ইউনিট চট্টগ্রাম’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীন ৩৬ হাজার বর্গফুটের বার্ন ইউনিটটি নির্মিত হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ দেবে ১০৪ কোটি ৯৩ লাখ ৩১ হাজার ৯৫৫ টাকা এবং চীন দেবে ১৭৯ কোটি ৮৩ লাখ ১৯ হাজার ৬০০ টাকা। ২০২৬ সালের জুন মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে প্রকল্পের মেয়াদকাল আরও এক বছর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ( চমেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০১৪ সালে প্রকল্পটির প্রস্তাব দেয়। প্রশাসনিক নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। ২০১৬ সালে চীনা প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকাটি পরিদর্শন করে। তখন স্থান পছন্দ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ২০২২ সালে চীন প্রতিনিধি দল একাধিকবার স্থান পরিদর্শন করে গোয়াছি বাগান এলাকাটি পছন্দ করেন। কিন্তু সেখানে কাজ শুরু করলে পরিবেশকর্মীরা পাহাড় কাটাপড়ার অভিযোগ করেন।
এরপর সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পাহাড় না কাটার নিশ্চয়তা দিয়ে আবারও শুরু হয় নির্মাণ কাজ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আবারও স্থবির হয়ে পড়ে কাজ। তবে এখন সব সমস্যা-সংকট পেরিয়ে নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের দুই কিস্তি। আরও দুই কিস্তির টাকা একসঙ্গে আসার কথা।
চমেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রকল্প পরিচালক ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, বার্ন ইউনিট নির্মাণ নিয়ে নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে এখন দ্রুত গতিতে কাজ চলছে। মিলছে প্রকল্পের দুই কিস্তির টাকা। শিগগিরই মিলবে তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির টাকাও। প্রকল্পের ৪৩ শতাংশ অর্থ খরচ হয়েছে।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে চীন থেকে আনা হয়েছে সব ধরনের প্রয়োজনীয় নির্মাণ সামগ্রী। সামগ্রীগুলো ছাড়াতে কাস্টমসে যাবতীয় ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করা হয়েছে। কাজ এগিয়ে নিতে এখন আর কোনো বাধা নেই। সংকট পেরিয়ে এখন আলোর পথে। এটি নির্মিত হলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষ এর সুফল পাবেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ১৫০ শয্যার বার্ন ইউনিটে থাকবে শিশুদের জন্য পাঁচটিসহ ২০টি বার্ন আইসিইউ বেড, ২৫টি এইচডিইউ বেড এবং তিনটি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার। রোগী আসা-যাওয়ার সুবিধায় থাকবে তিনটি রাস্তা। ছয়তলা বিশিষ্ট ইউনিটের প্রথমতলায় থাকবে জরুরি ওয়ার্ড এবং ওপিডি, দোতলায় তিনটি অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ, চারতলায় হাইডিপেন্সি ইউনিট (এইচইউ), চার ও পাঁচতলায় থাকবে সাধারণ ওয়ার্ড এবং ছয়তলায় ওয়ার্ডের সঙ্গে থাকবে কার্যালয়। বার্ন ইউনিট পরিচালনায় প্রয়োজনীয় ৪৭১ জন জনবলের প্রস্তাবনা গত বছরের মে মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
জানা যায়, বর্তমানে চমেক হাসপাতালের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৫০ শয্যার বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিনিয়তই শয্যার বাইরে মেঝে ও ফ্লেরে রোগী রাখা হয়। গড়ে ভর্তি থাকে ৭০-৭৫ জন। প্রতিদিন নতুন রোগী আসে ১৫ জন। আগুন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণসহ নানা কারণে দগ্ধ রোগী বাড়ছে। কিন্তু ওয়ার্ডে নেই আইসিইউ শয্যাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম। ফলে দগ্ধ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হয় ঢাকা।
বার্ন ইনস্টিটিউটের জন্য ২৮টি পদের বিপরীতে ৪৭১ জন জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে- পরিচালক, সহকারি পরিচালক, সিনিয়র কনসালটেন্ট, জুনিয়র কনসালটেন্ট, আবাসিক চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার, রেজিস্ট্রার-সহকারী রেজিস্ট্রার, নার্স, পুষ্টিবিদ, টেকনিশিয়ান, আয়া-ওয়ার্ডবয়সহ প্রয়োজনীয় পদের জনবল। এটি এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন।
বার্ন ইনস্টিটিউট নির্মাণে পাহাড় কাটা হচ্ছে- এমন অভিযোগ নিয়ে গত বছরের জুন মাসে নির্মাণ কাজ বন্ধ করার আবেদন করেছিলেন পরিবশেকর্মীরা। পরে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চায়নার প্রকৌশলীরা আস্বস্থ করলেন যে, পাহাড় অক্ষত রেখেই স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এরপর থেকে আবারও পুরোদমেই কাজ এগিয়ে চলছে।
প্রকল্প পরিচালক ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, তখন কাজ কিছু দিন বন্ধ ছিল। পরে আমরা সবাইকে নিয়ে হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে সভা করে ভিডিওর মাধ্যমে দেখানো হয়েছিল যে, কীভাবে পাহাড় অক্ষত রেখে স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। পাহাড়কে পাহাড়ের মতো প্রাকৃতিক অবয়ব ঠিক রেখেই এখন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সিডিএসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এসে সরেজমিন পরিদর্শনও করে গেছেন- কীভাবে পাহাড় অক্ষত রেখে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছে। বলা যায়, চট্টগ্রামে পাহাড় রক্ষায় এটি এখন একটি দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে।