ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে খুলনার ৭০ শতাংশ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার

নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে খুলনার একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। এতে একদিকে বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অন্যদিকে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। কিন্তু এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন দপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনা নগরীর মধ্যে ২৯৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের অনুমোদন রয়েছে। অনুমোদনের বাইরেও রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। তবে প্রায় ৭০ ভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। শতাধিক প্রতিষ্ঠানের নেই মেডিকেল বর্জ্য অপসারণের কোনো পদ্ধতি। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২৯৬টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলনা নগরীতে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৮৯টির লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে। বাকি লাইসেন্সগুলো ২০২৫ সালের আগে বিভিন্ন বছরে নবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের রয

ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে খুলনার ৭০ শতাংশ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার

নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে খুলনার একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ।

এতে একদিকে বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অন্যদিকে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। কিন্তু এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।

বিভিন্ন দপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনা নগরীর মধ্যে ২৯৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের অনুমোদন রয়েছে। অনুমোদনের বাইরেও রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। তবে প্রায় ৭০ ভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। শতাধিক প্রতিষ্ঠানের নেই মেডিকেল বর্জ্য অপসারণের কোনো পদ্ধতি।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২৯৬টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলনা নগরীতে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৮৯টির লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে। বাকি লাইসেন্সগুলো ২০২৫ সালের আগে বিভিন্ন বছরে নবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র।

খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮২ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল প্র‌্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী- বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ল্যাবরেটরি পরিচালনা করা যায় না। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করাও বাধ্যতামূলক। নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে খুলনার অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স অনুমোদনের সময় অনেকগুলো শর্ত পূরণ করেই সনদপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ অনুমোদন পাওয়ার পর শর্ত মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে না। এ কারণে পরবর্তীতে তারা লাইসেন্স নবায়ন করতে পারে না। তাদেরকে পড়তে হয় জটিলতায়। এ কারণে খুলনা শহরের প্রায় ৭০ ভাগ ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক এখন নিয়মিত নবায়নকারী নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নেই নিয়মমতো জনবল। বিভিন্ন সময় এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে তাদেরকে সতর্কও করাও হয়েছে।

খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, খুলনা নগরীর প্রায় ৭০ ভাগ বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনেক দুর্বলতা রয়েছে। ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মধ্যে মাত্র ৪৯টির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে। বাকিদের সতর্ক করা হচ্ছে। যারা যারা ছাড়পত্র নিয়েছে, তাদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এসবপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে থাকা রক্ত, ব্যবহৃত সুঁই ও রাসায়নিক বর্জ্য সঠিকভাবে ধ্বংস না করলে রোগ ছড়াবে। এজন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে পরিবেশগত আইন ও মান না মানলে চারপাশের বাতাস ও মাটি দূষিত হবে। এজন্য তাদের নিরাপদ অবস্থায় নিয়ে আসা জরুরি।

একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক ঘুরে এবং এনজিওর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেডিকেল বর্জ্য নিরাপদে ফেলার জন্য বিভিন্ন রঙের এবং নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ঝুড়ি বা পাত্র ব্যবহার করার নির্দেশ থাকলেও তা মানছে না প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান। অনেক মেডিকেল বর্জ্য বাসাবাড়ির আবর্জনার সঙ্গেই বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ড্রামে করে নিয়ে মেডিকেল বর্জ্য শহরের সেকেন্ডারি বর্জ্য স্টেশনে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করার পাত্র, তুলা, অপারেশন ওয়েস্ট ইকুইপমেন্ট, উচ্ছিষ্ট গজ ব্যান্ডেজসহ সুঁই, সিরিঞ্জ জাতীয় মেডিকেল বর্জ্য। স্বদিচ্ছা ও প্রদিপন এনজিও সিটি করপোরেশন এলাকার মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে। এর মধ্যে স্বদিচ্ছা খুলনা মহানগরীর ১ থেকে ১৮নং ওয়ার্ড পর্যন্ত এবং প্রদিপন ১৯ থেকে ৩১নং ওয়ার্ড পর্যন্ত থাকা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের মেডিকেল বর্জ্য দুই ভাগে সংগ্রহ করে।

স্বদিচ্ছা এনজিওতে কর্মরত জীবন কৃষ্ণ কর বলেন, আমরা নগরীর ১ থেকে ১৮নং ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রায় ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করি। কিন্তু তাও তুলনামূলক কম বর্জ্য হয়। বাসাবাড়ির বর্জ্য বেশি হয়। এরপর তা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয়।

প্রদিপন এনজিওতে কর্মরত ফেরদৌসুর রহমান বলেন, আমরা ১৯ থেকে ৩১নং ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রায় ১৩৬টি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য অপসারণ করি। প্রতিষ্ঠানগুলো বর্জ্য তাদের মতো করে রাখে। আমাদের সংগ্রহকারীরা তা সংগ্রহ করে নেয়। শুক্রবার ব্যতীত বাকি দিনগুলো মেডিকেল বর্জ্য অপসরণ কাজ চলমান থাকে।

পরিবেশ আন্দোলনের খুলনা জেলার সমন্বয়কারী ও নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্র না থাকা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি বিতর্কিত বিষয়। কারণ শর্ত পূরণ না করে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেলো কীভাবে? সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

তিনি আরও বলেন, নগরীতে গড়ে ওঠা এসকল ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক সেন্টার মনিটরিং করে আইনের মধ্যে আনা জরুরি। নইলে কিছু প্রতিষ্ঠানের কারণে খুলনার পুরো স্বাস্থ্যগত পরিবেশ ভেঙে পড়বে।

খুলনা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, আমরা সবগুলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক পরিদর্শন করছি। তালিকার আওতায় নিয়ে আসছি। যাদের ছাড়পত্র নেই, তাদেরকে আমরা ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য বলছি।

খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি। লিখিতভাবে বক্তব্য চাওয়া হলেও এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

তবে খুলনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের সংখ্যা তালিকার থেকেও বেশি। প্রায় সাড়ে তিনশোর কাছাকাছি। অনেকে আবেদন নিয়েই ফুল দমে কাজ করছে। যা ঠিক নয়। সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রশাসনে রদবদল হওয়ার পর পূর্বে দায়িত্বে থাকা একটি চক্র অফিসের অনেক নথিপত্র লোপাট করে চলে গেছে। বর্তমান তালিকাটাও একজন গণমাধ্যম কর্মীর কাছে থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে আমরা এ বিষয়ে নজর দিয়ে শুধুমাত্র প্রকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রস্তুত করছি। আর বাকিদের মনিটরিং করে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ খুব শিগগিরই দেওয়ার উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি।

এফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow