রমজানের শুরুতেই জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যেও ছিল কিছুটা সংশয়। ফলে ঈদ বাজার শুরুর আগেই অনেক ব্যবসায়ী আশঙ্কা করেছিলেন, এবারের বেচাকেনা আগের বছরের তুলনায় কম হতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ধীরে ধীরে ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। রমজানের মাঝামাঝি থেকে নগরীর বিভিন্ন শপিংমল, বিপণিবিতান ও পাইকারি বাজারগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অস্থিরতাও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশায়। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী আয় কমতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বাংলাদেশের বড় একটি অংশের প্রবাসী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ কমে গেলে দেশের ভোক্তা বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবুও এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই চট্টগ্রামের ঈদ বাজার ধীরে ধীরে জমে উঠছে এবং ব্যবসায়ীরা শেষ সময়ের বেচাকেনা নিয়ে আশাবাদী।
ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে কেনাকাটার উৎসব। রমজানের শুরু থেকেই নগরীর শপিংমল, বিপণিবিতান, পাইকারি বাজার এবং পাড়ার দোকানগুলোতে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ক্রেতাদের উপস্থিতি। রমজান যত শেষের দিকে এগোচ্ছে, ততই জমে উঠছে ঈদের বাজার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবারের ঈদকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে প্রায় ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান নেই, তবে বাজারের আকার, ক্রেতাদের উপস্থিতি এবং পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনার গতি দেখে ব্যবসায়ীরা এমন ধারণা করছেন।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে শুধু চট্টগ্রামের বাসিন্দারাই নয়, আশপাশের অন্তত আট থেকে দশটি জেলার মানুষ ঈদের কেনাকাটার জন্য এই শহরের বাজারগুলোর ওপর নির্ভর করেন। ফলে ঈদের সময় চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে এক বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নগরীর শতাধিক বড় শপিংমল, প্রায় তিন হাজার ছোট-বড় মার্কেট, হাজার হাজার পাইকারি ও খুচরা দোকান এবং গ্রাম-শহরের অসংখ্য অস্থায়ী দোকান মিলিয়ে ঈদকে ঘিরে তৈরি হয় বিশাল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। শুধু পোশাকই নয়, জুতা, প্রসাধনী, গয়না, শিশুদের খেলনা, ব্যাগ, ঘড়ি, আতর ও বিভিন্ন ফ্যাশন পণ্যের বেচাকেনাও কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন তৈরি করে। তবে ঈদ বাজারের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে থাকে পোশাক খাত।
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ উপলক্ষে প্রায় সব মার্কেটই এখন বর্ণিল সাজে সেজেছে। দোকানের সামনে ঝুলছে নতুন ফ্যাশনের পোশাক, রঙিন ব্যানার ও আলোয় সাজানো ডিসপ্লে। বিকেল গড়াতেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করে এবং রাত পর্যন্ত চলে কেনাকাটা। বিশেষ করে নারীদের পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। নগরীর স্যানমার ওশান সিটি, কোহিনূর সিটি, ফিনলে স্কয়ার, আফমি প্লাজা, বালি আর্কেড, ভিআইপি টাওয়ার, মিমি সুপার মার্কেট, নিউমার্কেট এলাকা, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও জিইসি মোড়ের বিভিন্ন শপিংমলে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই ঈদের কেনাকাটা করতে এসব মার্কেটে আসছেন।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের বাজারে ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে তারা দেশীয় পোশাকের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন ডিজাইনের পোশাক আমদানি করেছেন। এবারের ঈদ বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে পাকিস্তানি পোশাক। ফ্যাশন ট্রেন্ডে পরিবর্তনের কারণে তরুণী ও নারীদের মধ্যে পাকিস্তানি ডিজাইনের থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, সারারা, ঘারারা ও ফারসি ধরনের পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
নগরীর বালি আর্কেডের লেডিস পয়েন্ট দোকানের স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম বলেন, এবারের ঈদ বাজারে পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তরুণীদের মধ্যে এসব পোশাকের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে তাদের দোকানে বিক্রি হওয়া নারীদের পোশাকের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই পাকিস্তানি ডিজাইনের। এর মধ্যে ফারসি, সারারা, জারারা, অর্গানজা থ্রি-পিস ও সুতার কাজ করা পোশাকের চাহিদা বেশি। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ কমেনি। সব শ্রেণির ক্রেতাদের কথা বিবেচনা করে এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের পোশাক রাখা হয়েছে।
একই ধরনের কথা জানান নগরীর কোহিনূর সিটির লেডিস ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহমেদ। তিনি বলেন, এবারের ঈদে বাজারে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিনই বিক্রি বাড়ছে। তাদের দোকানে ফারসি, সারারা ও ঘারারা পোশাকের চাহিদা বেশি। বিভিন্ন পোশাকের দাম এক হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। কিছু ডিজাইনার পোশাকের দাম আরও বেশি।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের পোশাক নির্বাচনেও এখন ফ্যাশনের নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সাদিয়া সুলতানা বলেন, পাকিস্তানি পোশাকের ডিজাইন ও কাটিং ভিন্ন ধরনের হওয়ায় এগুলো এখন বেশি জনপ্রিয়। অনেক সময় একই ধরনের পোশাকে ভিন্ন ভিন্ন নকশা পাওয়া যায়, যা তরুণীদের কাছে আকর্ষণীয়। তাই ঈদের পোশাক হিসেবে তিনি পাকিস্তানি থ্রি-পিসই বেশি পছন্দ করেন।
আরেকজন নারী ক্রেতা জানান, কয়েক বছর আগে ভারতীয় পোশাকের জনপ্রিয়তা বেশি ছিল। বিশেষ করে ভারতীয় টেলিভিশন সিরিয়ালের চরিত্রের নামে পোশাক বাজারে দাপট দেখাত। কিন্তু এখন সেই প্রবণতা বদলে গেছে। বর্তমানে পাকিস্তানি পোশাকই বাজারে বেশি দেখা যায়।
শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রেও বাজারে ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। শিশুদের জন্য দেশীয় পোশাকের পাশাপাশি চীন ও থাইল্যান্ডের তৈরি পোশাকও বিক্রি হচ্ছে। শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে অভিভাবকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি পোশাক বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো টেরিবাজার। বহু বছর ধরে এই বাজারটি চট্টগ্রামসহ দক্ষিণাঞ্চলের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রধান নির্ভরতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সরু গলি, ঘনবসতিপূর্ণ দোকান আর ক্রেতা–বিক্রেতার কোলাহলে দিনভর সরগরম থাকে টেরিবাজার। এখানে ছোট-বড় শত শত দোকানে দেশীয় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা নানা ধরনের থ্রি-পিস, শাড়ি, লেহেঙ্গা, গাউন, শিশুদের পোশাক ও ফ্যাশন আইটেম বিক্রি হয়। ঈদ মৌসুমে এই বাজারের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ভোর থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারি দরে পোশাক কিনতে ভিড় করেন।
টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, ঈদ মৌসুমকে ঘিরে টেরিবাজারে প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এবছরও ব্যবসা ভালো হবে বলে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা। তিনি জানান, ক্রেতাদের চাহিদা মাথায় রেখে বাজারে নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক আনা হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের নতুন আইটেম, থ্রি-পিস, ফ্যাশনেবল ড্রেস ও ট্রেন্ডি পোশাকের বড় সংগ্রহ পাওয়া যাচ্ছে টেরিবাজারে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে শুধু নগরীতেই নয়, আশপাশের জেলাগুলোতেও বড় ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম তৈরি হয়। চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারগুলো থেকে কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন জেলার খুচরা ব্যবসায়ীরা পোশাক কিনে নিয়ে যান। ফলে ঈদের সময় চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে পুরো অঞ্চলের প্রধান পোশাক সরবরাহ কেন্দ্র।
নগরীর ঐতিহ্যবাহী রিয়াজউদ্দিন বাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বড় পাইকারি পোশাক বাজার। এখানে প্রায় ১৫ হাজার দোকান রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকই পাইকারি বিক্রেতা। হাসিনা শপিং, বিনিময় টাওয়ার, রহমান ম্যানশন, প্যারামাউন্ট সিটি ও সালেহ ম্যানশনসহ কয়েকটি মার্কেট এই পাইকারি ব্যবসার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
তামাকুমন্ডি লেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক কালবেলাকে বলেন, রমজানের আগে জাতীয় নির্বাচন থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি অনিশ্চয়তা ছিল। অনেকেই তখন বড় পরিমাণে পণ্য আনতে দ্বিধায় ছিলেন। পরে আবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবও কিছুটা পড়েছে। এসব কারণে শুরুতে বাজারে গতি কিছুটা কম ছিল।
তিনি আরও বলেন, ঈদ উপলক্ষে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়লেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ব্যবসায়ী সমিতির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক টিমও বাজারজুড়ে নজরদারিতে রয়েছে।