জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলে না যশোরবাসীর, নেপথ্যে যত কারণ

কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি হলেই যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার চিত্র এখন সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পৌর কর্তৃপক্ষ জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা পদক্ষেপ নিলেও সঙ্কটের পুরোপুরি সমাধান মিলছে না। যশোর পৌর এলাকায় ২৫-৩০টি পয়েন্টে নিয়মিত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। শহরের এই জলাবদ্ধতার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট, খাল, ড্রেন দখল; শহরের পানি নিষ্কাশনের কয়েকটি মূল পয়েন্ট বন্ধ ও নির্গমনের ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়া; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অসচেতনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে সুনির্দিষ্ট ও স্পটভিত্তিক সমস্যা নির্ধারণ করে সমাধানের চেষ্টা চলছে। ‘গোটা পৌর এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নিচু জমি, জলাশয় ভরাট করে বাড়ির সঙ্গে বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। ফলে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই ড্রেন উপচে সড়ক পেরিয়ে পানি প্রবেশ করছে বাড়িঘরে। আগে এলাকাভিত্তিক পুকুর জলাশয়ে যে পানি নেমে যেত, ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই অবস্থাও আর নেই’ বর্ষা মৌসুমে যশোর শহর ঘুরে দ

জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলে না যশোরবাসীর, নেপথ্যে যত কারণ

কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি হলেই যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার চিত্র এখন সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পৌর কর্তৃপক্ষ জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা পদক্ষেপ নিলেও সঙ্কটের পুরোপুরি সমাধান মিলছে না। যশোর পৌর এলাকায় ২৫-৩০টি পয়েন্টে নিয়মিত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

শহরের এই জলাবদ্ধতার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট, খাল, ড্রেন দখল; শহরের পানি নিষ্কাশনের কয়েকটি মূল পয়েন্ট বন্ধ ও নির্গমনের ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়া; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অসচেতনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে সুনির্দিষ্ট ও স্পটভিত্তিক সমস্যা নির্ধারণ করে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

‘গোটা পৌর এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নিচু জমি, জলাশয় ভরাট করে বাড়ির সঙ্গে বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। ফলে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই ড্রেন উপচে সড়ক পেরিয়ে পানি প্রবেশ করছে বাড়িঘরে। আগে এলাকাভিত্তিক পুকুর জলাশয়ে যে পানি নেমে যেত, ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই অবস্থাও আর নেই’

বর্ষা মৌসুমে যশোর শহর ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি হলে যশোর শহর ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। শহরের টিবি ক্লিনিক এলাকা, খড়কি এলাকার শাহ আবদুল করিম সড়ক, আপন মোড়, খড়কি রূপকথা মোড়, ধর্মতলা রোড, চারখাম্বার মোড়, মুজিব সড়কের রেলগেট এলাকা, নাজির শংকরপুর, বেজপাড়া চিরুনিকল মোড়, মিশনপাড়া, আরবপুর, বিমানবন্দর সড়ক, শংকরপুর চোপদারপাড়া, স্টেডিয়ামপাড়া, বকচরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে কোনো কোনো এলাকায় বাড়িঘরেও পানি প্রবেশ করছে। বিশেষ করে ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোটা পৌর এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নিচু জমি, জলাশয় ভরাট করে বাড়ির সঙ্গে বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। ফলে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই ড্রেন উপচে সড়ক পেরিয়ে পানি প্রবেশ করছে বাড়িঘরে। এছাড়া আগে এলাকাভিত্তিক পুকুর জলাশয়ে যে পানি নেমে যেত, ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই অবস্থাও আর নেই। আগে যশোর শহরের উত্তর অংশের পানি ভৈরব নদ এবং দক্ষিণ অংশের পানি মুক্তেশ্বরী নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হতো। ভৈরবের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়া এবং মুক্তেশ্বরী ভরাট, দখল, সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলে না যশোরবাসীর, নেপথ্যে যত কারণ

‘এখন যে ২৫-৩০টি স্পটে পানি আটকা পড়ছে, সেগুলো নিয়েও স্পটভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। খড়কি, চোরমারা দীঘিরপাড়সহ বেশকিছু এলাকায় সড়ক ও ড্রেন সংস্কার-নির্মাণের কাজ চলছে। এই কাজ শেষ হওয়ার পর ওইসব এলাকার জলাবদ্ধতাও কমে আসবে’

জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, শহরের অনেক এলাকার ড্রেন বা নালাগুলো অত্যন্ত সরু। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এদের ঢাল বা উচ্চতার ভারসাম্য (লেভেলিং) সঠিক নয়। ফলে ড্রেন দিয়ে পানি সামনের দিকে না গিয়ে উল্টো আটকে থাকে। খড়কি, চাঁচড়া বা রেললাইন সংলগ্ন ব্রিটিশ আমলের পুরোনো কালভার্টগুলোর অনেকগুলোর মুখ ভরাট হয়ে গেছে বা লিজ নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে খড়কি এলাকার গাজির বাজার, শংকরপুর টার্মিনাল এলাকার ড্রেনের মুখ সরু হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের ধারণক্ষমতা অনেক কমে গেছে।

শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভারী ভারী ট্রাক প্রবেশের কারণে রাস্তা ঢেবে গিয়ে ড্রেন সংকুচিত হয়ে গেছে। মেডিকেল কলেজসহ নানা স্থাপনায় বিল হরিণা, মুক্তেশ্বরীর সঙ্গে শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এটি শহরের দক্ষিণ অংশের জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় একটি কারণ।

শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অসচেতনতাও জলাবদ্ধতার একটি বড় কারণ। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ বাসাবাড়ির বর্জ্য ও পলিথিন সরাসরি ড্রেনে ফেলার কারণে ড্রেনের তলদেশে পলি জমে এবং পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করেও পৌর কর্তৃপক্ষের ড্রেন সচল রাখতে নাভিশ্বাস উঠছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবর্ষণের কারণেও বাড়ছে দুর্ভোগের পরিধি। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইদানীং খুব কম সময়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হতে দেখা যায়। আকস্মিক এই বিপুল পরিমাণ পানির চাপ শহরের বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা কোনোভাবেই সামলাতে পারছে না

‘যশোর পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌরসভা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পৌর এলাকার সব ড্রেন পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন বৃষ্টি থেমে গেলে আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে পানি নেমে যাচ্ছে’

জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলে না যশোরবাসীর, নেপথ্যে যত কারণ

যশোর শহরের জলাবদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত শংকরপুর এলাকার শংকরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বুলবুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা সমস্যা দীর্ঘদিনের। ভারী বর্ষণের পর দ্রুত পানি নামানো না গেলে এ সঙ্কট কাটবে না। এজন্য যশোর শহরের পানি ভৈরব নদ ও মুক্তেশ্বরী নদীতে স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।’

যশোর সরকারি এমএম কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সোলজার রহমান বলেন, “আমরা উন্নয়ন মানে অবকাঠামো-স্থাপনাকেই বুঝি। এজন্য অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অতিমাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনার কারণে যেভাবে জলাশয় ভরাট, নদী-খাল-ড্রেন দখল করে বাড়ির পরে বাড়ি তৈরি হচ্ছে। তাতে পানি নিষ্কাশনের কোনো সুযোগ থাকছে না। আবার মাটির উপরিতলকে আবৃত্ত করে ফেলা হচ্ছে। ফলে পানি ভূগর্ভেও প্রবেশ করতে পারছে না। আইন ‘নিধিরাম সর্দারে’ পরিণত হয়েছে। এজন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই।”

কথা হয় যশোর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জায়েদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, যশোর পৌরসভা গত দুই অর্থবছরে ২৪০ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কার করেছে। এই ড্রেন থেকে শত শত ট্রাক ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। এর সুফলও মিলেছে। আগে যে বৃষ্টির পানি দুদিনেও নামতো না, এখন ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাচ্ছে।

জায়েদ হোসেন বলেন, ‘এখন যে ২৫-৩০টি স্পটে পানি আটকা পড়ছে, সেগুলো নিয়েও স্পটভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। খড়কি, চোরমারা দীঘিরপাড়সহ বেশকিছু এলাকায় সড়ক ও ড্রেন সংস্কার-নির্মাণের কাজ চলছে। এই কাজ শেষ হওয়ার পর ওইসব এলাকার জলাবদ্ধতাও কমে আসবে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, পলিথিন, প্লাস্টিক বোতলসহ এ জাতীয় উপকরণ পানি নিষ্কাশনের প্রধান বাঁধা। এজন্য তিনি নাগরিকদের ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

যশোর পৌরসভার প্রশাসক, স্থানীয় সরকার যশোরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল হাসান বলেন, যশোর পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌরসভা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পৌর এলাকার সব ড্রেন পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন বৃষ্টি থেমে গেলে আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে পানি নেমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, পানি বহিঃনির্গমনের অনেক ড্রেন-খাল সংকুচিত ও নির্গমনক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিশেষ করে বিল হরিণা ও মুক্তেশ্বরী নদীতে পানি নিষ্কাশনের পথ কোথাও কোথাও বন্ধ ও সংকুচিত হয়ে গেছে। ড্রেন-খালের শেষপ্রান্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গিয়ে মিশে গেছে। এজন্য স্পট-ড্রেন ধরে ধরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে শহরের দক্ষিণাংশে বেশ কয়েকটি খাল ও বড় ড্রেন তৈরি করে পানি সরাসরি মুক্তেশ্বরী নদীতে নিয়ে নির্গমনের ভাবনাও রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হলে এই সঙ্কট অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশাবাদী পৌর প্রশাসক।

এইচআরএম/এসআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow