জিয়াউর রহমানের খনন করা সেই স্বনির্ভর খাল পুন:খননে ‘অনিয়ম’

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে উদ্বোধন করেছিলেন বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের স্বনির্ভর খাল খনন কার্যক্রম। পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মরা খালে পরিণত হয়েছিল খালটি। যে কারণে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ব্যাহত হচ্ছিল ওই এলাকার কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে স্থানীয় কৃষকদের দাবির প্রেক্ষিতে বরিশালে সর্বপ্রথম স্বনির্ভর খাল খনন কার্যক্রম শুরু করে বিএডিসি। চলতি বছরের গত জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ৪ কিলোমিটার খাল পুন:খনন শেষ হয়েছে গত এপ্রিলে। তবে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজ কাগজে কলমে সমাপ্ত হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ না করা, বাঁধ অপসারণ না করা, বেশিরভাগ এলাকায় খনন না করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য মাটি অপসারণ না করে অন্যের জমিতে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত অভিযোগ যাওয়া সত্ত্বেও সুফল মেলেনি। বরং শতভাগ কাজ সম্পন্ন না করেই অধিকাংশ বিল তুলে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমাইন এন্টারপ্রাইজ। যদিও প্র

জিয়াউর রহমানের খনন করা সেই স্বনির্ভর খাল পুন:খননে ‘অনিয়ম’

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে উদ্বোধন করেছিলেন বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের স্বনির্ভর খাল খনন কার্যক্রম। পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মরা খালে পরিণত হয়েছিল খালটি। যে কারণে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ব্যাহত হচ্ছিল ওই এলাকার কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম।

দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে স্থানীয় কৃষকদের দাবির প্রেক্ষিতে বরিশালে সর্বপ্রথম স্বনির্ভর খাল খনন কার্যক্রম শুরু করে বিএডিসি। চলতি বছরের গত জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ৪ কিলোমিটার খাল পুন:খনন শেষ হয়েছে গত এপ্রিলে।

তবে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজ কাগজে কলমে সমাপ্ত হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ না করা, বাঁধ অপসারণ না করা, বেশিরভাগ এলাকায় খনন না করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য মাটি অপসারণ না করে অন্যের জমিতে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত অভিযোগ যাওয়া সত্ত্বেও সুফল মেলেনি। বরং শতভাগ কাজ সম্পন্ন না করেই অধিকাংশ বিল তুলে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমাইন এন্টারপ্রাইজ।

যদিও প্রকল্প বাস্তবায়ন সংস্থা বিএডিসি কর্তৃপক্ষের দাবি, খনন কাজ নিয়ে নানা অনিয়ম এবং অভিযোগের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল আটকে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার খনন কাজ কার্যাদেশ থেকে বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তীতে স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতে বর্তমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে খালের বাকি অংশ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের পূর্ব অংশে প্রায় ৩শ একর জমিতে ড্রেন না করায় পানি নেওয়া যাচ্ছে না। উল্টো সেখানের পানি আটকে যাওয়ায় বর্তমান মৌসুমে জমিগুলো অনাবাদি থাকছে। তাছাড়া খাল কাটার প্রথম পর্যায়ে অপরিকল্পিতভাবে গ্রামবাসীর গাছপালা নির্বিচারে কাটা হয়েছে। কারিগরি নজরদারি না থাকায় ভেকু দিয়ে খাল কাটায় দুপাশে ইটের রাস্তা ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ৪শ একর জমিতে পানি আটকে আছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মেসার্স আজমাইন এন্টারপ্রাইজ প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। এ ছাড়া বিএডিসি প্রকল্প প্রণয়নে স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য যাচাই কীভাবে চূড়ান্ত করেছিলেন, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির শর্তে কী আছে এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার ছিল। সংগঠিত ভুল ত্রুটির জন্য ঠিকাদার এবং বিএডিসি উভয় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা আছে।

জানা গেছে, খাল খনন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমাইন এন্টারপ্রাইজের মালিকের পক্ষে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন ঠিকাদারের ভাগ্নে আতিক রহমান।

তিনি বলেন, গত এপ্রিলে খাল খননের মূল কাজ শেষ হয়েছে। তবে দুটি প্যাকেজে ৪ কিলোমিটার খাল খননের কথা ছিল। সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ঝামেলার কারণে প্রথম প্যাকেজের ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার খনন কাজ বন্ধ রয়েছে। কাজের বিলও আমাদের দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার খালের মধ্যে তিনটি বাঁধ রয়েছে। এ ছাড়া ফিনিশিং কাজও বাকি আছে। সেগুলো আগামী ৩-৭ দিনের মধ্যে শেষ হবে। তাছাড়া খাল পাড়ের মাটি অপসারণ না করা, ব্যক্তিগত সুবিধা দিতে অন্যের জমিতে ১২ ফুট রাস্তা নির্মাণ করা, অপ্রয়োজনে গাছপালা কেটে ফেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খালটি খননের জন্য স্থানীয় এক ব্যক্তিকে ২০ লাখ টাকায় সাব-কন্ট্রাক দিয়ে তারা কাজটি করিয়েছেন। এই কাজগুলো তিনিই তার নিজ ইচ্ছামতো করেছে। বিষয়টি তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

স্থানীয় ভূমি মালিক শহিদুল ইসলাম বলেন, কোটি টাকার খাল কাটা হয়েছে কিন্তু কোনো উপকার হয়নি আমাদের। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আগের চেয়ে এখন আরও ভয়াবহ অবস্থা। আমাদের মতামত নেওয়া হয়নি খাল খননের জন্য। আমাদের রেকর্ডিয় জমি কেটে খাল কাটা হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও অবগত করেছি। আমরা ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা করব।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বরিশাল জেলা কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী এসএম আতাই রাব্বি বলেন, চরকাউয়া এলাকার স্বনির্ভর খাল খনন প্রথমাংশের কাজ শেষ হয়েছে। এখন মাঠের পানি অপসারণের জন্য খালের প্রতি কিলোমিটারে চারটি করে পাইপ বসানো হবে। এজন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। শিগগিরই তারা কাজ শুরু করবে।

খালের মাটি, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ না করা এবং বিশেষ বিশেষ সুবিধা দিতে অন্যের জমিতে রাস্তা নির্মাণ এবং বাঁধ অপসারণ না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত এপ্রিলে খনন কাজের প্রথমাংশের খনন শেষ হয়েছে। তবে আমরা এখনো কাজ বুঝে নেইনি। আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ টাকাও পরিশোধ করা হয়নি। কাজ শুরুর পর মাত্র ৭ লাখ টাকার মতো বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ না পেলে আমরা সেই কাজ বুঝে নেব না।

তাছাড়া রাস্তার মাটি অপসারণের জন্য আমাদের বরাদ্দ নেই। তারপরও কোনো কৃষক বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যদি অভিযোগ করে তবে সেই জায়গা থেকে মাটি অপসারণের ব্যবস্থা করব। ব্যক্তিগত সুবিধা দিতে ১২ ফুট দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বিএডিসি’র এই কর্মকর্তা বলেন, খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছেও অভিযোগ গেছে। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

তাছাড়া খাল খনন নিয়ে অনিয়ম এবং অভিযোগের কারণে দ্বিতীয় প্যাকেজের ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার খাল খনন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এখন জনগণের চাহিদা অনুযায়ী নতুন করে নতুন ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানো হবে। কাজ বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত বাকি বিল দেওয়া হবে না। তবে খালের বিশাল অংশে এক পাশের মাটি কাটা হলেও অন্য পাশ না কেটেই কাগজে কলমে খাল খনন কাজ সম্পন্ন দেখানোর কারণ জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর মেলেনি এই প্রকৌশলীর কাছ থেকে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow