‘জুলাই আন্দোলনে ঢামেক ছিল যুদ্ধক্ষেত্র, সব ওটি খুলে চিকিৎসা দিয়েছি’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফিরে আসে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি। ওই সময় আহতদের চিকিৎসাসেবায় সরাসরি যুক্ত থাকা বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকরা ভয়াবহ সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্য, কারফিউ, সংঘাত, গুলিবর্ষণ ও প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে আহতদের সেবা দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় ঢামেকের স্পাইন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান অধ্যাপক ও ওএসডি (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) ডা. শহিদুল ইসলাম আকন বলেন, ১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। শুরুতে ছররা গুলিতে আহত রোগী বেশি এলেও ১৮ জুলাই বিকেল থেকে সরাসরি গুলিবিদ্ধ রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে মৃত্যুর ঘটনাও। তিনি বলেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিয়মিত ও পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার বন্ধ রেখে সব অপারেশন থিয়েটার (ওটি) শুধু আন্দোলনে আহতদের জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যবহার করা হয়। এতে বহু মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছিল। চিকিৎসকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই থা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফিরে আসে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি। ওই সময় আহতদের চিকিৎসাসেবায় সরাসরি যুক্ত থাকা বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকরা ভয়াবহ সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তাদের ভাষ্য, কারফিউ, সংঘাত, গুলিবর্ষণ ও প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে আহতদের সেবা দিয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢামেকের স্পাইন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান অধ্যাপক ও ওএসডি (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) ডা. শহিদুল ইসলাম আকন বলেন, ১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। শুরুতে ছররা গুলিতে আহত রোগী বেশি এলেও ১৮ জুলাই বিকেল থেকে সরাসরি গুলিবিদ্ধ রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে মৃত্যুর ঘটনাও।
তিনি বলেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিয়মিত ও পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার বন্ধ রেখে সব অপারেশন থিয়েটার (ওটি) শুধু আন্দোলনে আহতদের জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যবহার করা হয়। এতে বহু মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছিল। চিকিৎসকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই থাকুক না কেন, সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
ডা. শহিদুল ইসলাম আকনের দাবি, চিকিৎসা দিতে সরাসরি বাধা না এলেও পরোক্ষ চাপ ছিল। ২৩ জুলাই তৎকালীন সরকারের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী, সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হাসপাতালে এসে আহতদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ ও ‘সরকার পতনের আন্দোলনকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বলা হলেও অতিরিক্ত সহানুভূতি বা আগ্রহ না দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সময় আহতদের পাশে দাঁড়ানো এবং চিকিৎসাকর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাবারের ব্যবস্থা করাকেও পরবর্তীতে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহতদের পক্ষে মতপ্রকাশ করা নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
ডা. শহিদুল ইসলাম আকনের ভাষ্য, আহতদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে ২৫ জুলাই তাকে স্পাইন সার্জারি বিভাগ থেকে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে বদলি করা হয়। একইভাবে আরও কয়েকজন চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছিল।
তার দাবি, এসব বদলির উদ্দেশ্য ছিল অন্য চিকিৎসকদের জন্য একটি বার্তা দেওয়া, যেন কেউ আন্দোলনের আহতদের বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ না দেখান।
ঢামেকের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আরিফুজ্জামান মিলন বলেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে আসা রোগীদের অনেকের নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেকেই স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন বা প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছেন। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় এনসিএস ও ইএমজি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চারদিকে সংঘর্ষ, আগুন, মিছিল, অবরোধ ও বন্ধ রাস্তাঘাটের মধ্যেও চিকিৎসকরা হাসপাতালে এসে দায়িত্ব পালন করেছেন। আহতদের চিকিৎসাই ছিল তখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
ঢামেকের সহকারী অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগম বলেন, তিনি ইনডোরে ভর্তি আহত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। কারফিউ ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, রাস্তাঘাট বন্ধ ছিল, যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কঠিন। তারপরও আমরা হাসপাতালে এসে ভর্তি রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা যার যার দায়িত্ব অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছি।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফর উপলক্ষে ক্যাম্পাসজুড়ে নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম।
হাসপাতাল ও কলেজসংলগ্ন ফুটপাত থেকে ভ্রাম্যমাণ হকার, অস্থায়ী খাবারের দোকান, স্টেশনারি ও অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এতে দীর্ঘদিন পর ফুটপাত স্বাভাবিক রূপ ফিরে পায় এবং যানজটও কমে যায় বলে জানান রোগীর স্বজন ও পথচারীরা।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘২০ হোস্টেল প্রকল্প’-এর আওতায় দুটি ছাত্রী হোস্টেলের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি বৃক্ষরোপণ ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানে তার সহধর্মিণী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জুবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা আশা প্রকাশ করেন, এই সফরের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ইএআর/এমআরএম
What's Your Reaction?

