জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ ও আন্দোলনের চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে বহুমুখী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ, ‘জুলাই কর্নার’ প্রতিষ্ঠা, ঐতিহাসিক স্মারক সংকলন প্রকাশ, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, গ্রাফিতি সংরক্ষণ, আহত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি মওকুফ এবং ১৪ জুলাইকে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ হিসেবে পালন।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল মতিন ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। এ সময় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আল মোজাদ্দেদী আল ফেছানী এবং ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে উপাচার্য ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং আহত, পঙ্গুত্ববরণকারী ও দৃষ্টিশক্তি হারানো আন্দোলনকারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।
লিখিত বক্তব্যে উপাচার্য বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তী সময় দীর্ঘদিনের বৈষম্য, জবাবদিহিতার সংকট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এটি গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।
তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই এই ইতিহাস, চেতনা ও আত্মত্যাগকে সংরক্ষণ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্ব।
উপাচার্য জানান, নারী শিক্ষার্থীদের অসামান্য সাহস, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৪ জুলাইকে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ হিসেবে পালন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শহীদদের স্মৃতিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে ‘জুলাই স্মৃতি স্তম্ভ’ নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ভিত্তিপ্রস্তর আগামী ৫ আগস্ট স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ‘জুলাই কর্নার’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, যেখানে আন্দোলনের আলোকচিত্র, ভিডিও, শহীদ ও সংগঠকদের ব্যবহৃত স্মারক, গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র এবং গবেষণাসামগ্রী সংরক্ষণ করা হবে।
এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে স্মৃতিকথা, গবেষণাপত্র, সাক্ষাৎকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ এবং ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম নিয়ে একটি ঐতিহাসিক স্মারক সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপাচার্য বলেন, আগামী ৫ আগস্ট সকাল ১১টায় টিএসসি মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ‘মসজিদুল জামিয়া’-য় শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হবে। আলোচনা সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারী পাঁচজন শহীদের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা প্রদান করা হবে।
তিনি আরও জানান, আন্দোলনের সময় আঁকা ঐতিহাসিক গ্রাফিতিগুলো পুনরায় রং করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি মওকুফ এবং সংশ্লিষ্টদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও আবাসিক হলে রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং আগস্টজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় পর্দায় জুলাই আন্দোলনের ডকুমেন্টারি প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে উপাচার্য বলেন, ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই বিগত স্বৈরশাসনের দোসর এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় তার সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চিরন্তন প্রেরণা। শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় সামনের সারিতে থাকবে।