জেলের মৃত্যু ঘিরে অস্থির সাতক্ষীরার বনজীবী পল্লী

সুন্দরবনের দুয়ার বন্ধ হওয়ার আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। অথচ সাতক্ষীরার উপকূলীয় বনজীবী পল্লীগুলোতে এখন নেই নিষেধাজ্ঞা ঘিরে স্বাভাবিক উদ্বেগ; আছে স্বজন হারানোর বেদনা, গ্রেফতার আতঙ্ক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা। বনরক্ষীদের গুলিতে এক জেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বন বিভাগ ও বনজীবীদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং শত শত অজ্ঞাত আসামির তালিকা ইতোমধ্যে পুরো জনপদকে অস্থির করে তুলেছে। জানা গেছে, গত ১৮ মে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন পাটকোষ্টা এলাকার একটি খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরার সময় বন বিভাগের স্মার্ট পেট্রোল টিমের গুলিতে নিহত হন জেলে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫)। এ ঘটনার পর স্থানীয় বনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় ও বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন বনকর্মী আহত হন। থানায় পাল্টা-পাল্টি মামলা, আতঙ্কে গ্রাম: এ ঘটনায় ইতোমধ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে পৃথক মামলা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল খুলনা রেঞ্জের কয়রা থানা এলাকায় হওয়ায় নিহত জেলের ভাতিজা অলিউল্যাহ বাদী হয়ে খুলনার কয়রা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় বন ব

জেলের মৃত্যু ঘিরে অস্থির সাতক্ষীরার বনজীবী পল্লী

সুন্দরবনের দুয়ার বন্ধ হওয়ার আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। অথচ সাতক্ষীরার উপকূলীয় বনজীবী পল্লীগুলোতে এখন নেই নিষেধাজ্ঞা ঘিরে স্বাভাবিক উদ্বেগ; আছে স্বজন হারানোর বেদনা, গ্রেফতার আতঙ্ক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা। বনরক্ষীদের গুলিতে এক জেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বন বিভাগ ও বনজীবীদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং শত শত অজ্ঞাত আসামির তালিকা ইতোমধ্যে পুরো জনপদকে অস্থির করে তুলেছে।

জানা গেছে, গত ১৮ মে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন পাটকোষ্টা এলাকার একটি খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরার সময় বন বিভাগের স্মার্ট পেট্রোল টিমের গুলিতে নিহত হন জেলে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫)। এ ঘটনার পর স্থানীয় বনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় ও বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন বনকর্মী আহত হন।

থানায় পাল্টা-পাল্টি মামলা, আতঙ্কে গ্রাম:

এ ঘটনায় ইতোমধ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে পৃথক মামলা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল খুলনা রেঞ্জের কয়রা থানা এলাকায় হওয়ায় নিহত জেলের ভাতিজা অলিউল্যাহ বাদী হয়ে খুলনার কয়রা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় বন বিভাগের নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন, পশ্চিম বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শামীম রেজাসহ অজ্ঞাতনামা ৯ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সরকারি কাজে বাধা এবং বনরক্ষীদের ওপর হামলার অভিযোগে বন বিভাগের শরবতখালী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোক্তাদির রহমান বাদী হয়ে আক্রান্ত বনজীবীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেছেন। এছাড়া সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় ২৩ জন নামীয় এবং ৩০০ থেকে ৩৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকার কারণে গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে অনেক জেলেপাড়া।

বনজীবীদের ক্ষোভ ও নিষেধাজ্ঞার হাহাকার:

১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের সব নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরা এবং পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান সংঘাত নিয়ে গাবুরার সোরা গ্রামের বনজীবী আবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি বছর এই তিন মাস আমাদের ধারদেনা করে চলতে হয়। সরকার যে সামান্য চাল দেয়, তা দিয়ে ১০ দিনও সংসার চলে না। এবার তো নিষেধাজ্ঞার আগেই বন বিভাগ আমার প্রতিবেশী আমিনুরকে গুলি করে মারলো। তার ওপর ৩০০-৪০০ অজ্ঞাত আসামির মামলা দিয়েছে। এখন ভয়ে আমরা রাতে ঘরে ঘুমাতেও পারছি না, আর ১ তারিখ থেকে তো বনে যাওয়াও বন্ধ। আমরা পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরবো।

একই এলাকার আরেক বনজীবী ফারুক হোসেন বলেন, আমরা চোর-ডাকাত না, পেটের দায়ে বনে যাই। সুন্দরবনের ওপর আমাদের বাপ-দাদার অধিকার। সামান্য মাছ ধরার জন্য যদি এভাবে গুলি করে মানুষ মারা হয়, আর হাজার হাজার জেলের নামে মামলা দিয়ে গ্রাম ছাড়া করা হয়, তবে আমরা যাবো কোথায়? একদিকে মামলার উকিল খরচ, অন্যদিকে সামনে তিন মাস রোজগার বন্ধ, উপকূলের কোনো জেলের ঘরে এখন চাল কেনার পয়সা নেই।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জুন থেকে আগস্ট, এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী ও খালে প্রায় ৮৩ শতাংশ মাছ ডিম ছাড়ে। ফলে মৎস্য ও বন্যপ্রাণীর অবাধ প্রজনন নিশ্চিত করতেই প্রতি বছর এই ৯০ দিন সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশাধিকার ও মাছ-কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ থাকে। আগে কেবল তিনটি অভয়ারণ্যে এই নিয়ম থাকলেও, ২০১৯ সাল থেকে পুরো সুন্দরবনেই এই নিয়ম সম্প্রসারিত করা হয়।

তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই সময়টি জরুরি হলেও, কোনো ধরনের বিকল্প কর্মসংস্থান বা পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ছাড়া দীর্ঘ তিন মাস বনের দুয়ার বন্ধ থাকাটাই মূলত উপকূলীয় বনজীবী পরিবারগুলোর জন্য প্রতি বছর বড় অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আইনশৃঙ্খলা ও বন বিভাগের অবস্থান:

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, ঘটনাস্থল কয়রা থানা এলাকায় হওয়ায় নিহত জেলের স্বজনরা সেখানে হত্যা মামলা করেছেন। পাশাপাশি বন বিভাগের পক্ষ থেকেও সরকারি কাজে বাধা ও হামলার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি তদন্ত করছে।

এদিকে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউরর রহমান দাবি করেন, জেলের মৃত্যুর ঘটনাটি খুলনা রেঞ্জ এলাকায় ঘটলেও হামলা চালানো হয়েছে সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে। হামলাকারীরা এতটাই উগ্র ছিল যে, যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই মারধর করেছে। এতে আমাদের পাঁচজন বনকর্মী মারাত্মক আহত হয়েছেন। আমাদের ধারণা, এই পুরো ঘটনা এবং বন বিভাগের ওপর হামলার পেছনে বড় ধরনের কোনো গভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, বনরক্ষীদের সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে জেলে নিহতের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য ইতোমধ্যে দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি কমিটিতে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং অন্যটিতে খুলনা জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই প্রকৃত সত্য জানা যাবে।

বন বিভাগের দাবি, হামলাকারীরা অফিসের মূল ফটক, সিসি ক্যামেরা, গেট, গ্রিল, থাই গ্লাস, এসি ও সরকারি আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট ও সরকারি মালামাল লুট করা হয়। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রায় ৪ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় কয়েকজন বনকর্মকর্তা ও কর্মচারী আহত হয়েছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

শ্যামনগর থানার ওসি খালেদুর রহমান জানান, মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে এবং আদালতে কাগজপত্র পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

সংকটের আবর্তে উপকূল:

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১ জুনের নিষেধাজ্ঞা পরিবেশগতভাবে জরুরি হলেও, বর্তমান সংঘাত ও পাল্টা-পাল্টি মামলার জেরে উপকূলীয় অঞ্চলের মানবিক সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, সংঘাত ও আতঙ্ক এড়িয়ে যদি দ্রুত কোনো মানবিক ও টেকসই সমাধান না করা হয়, তবে একদিকে যেমন নিরীহ জেলেদের জীবন বিপন্ন হবে, অন্যদিকে বন ও বনজীবীদের মধ্যকার এই বৈরী সম্পর্ক সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাকেই হুমকির মুখে ফেলবে।

আহসানুর রহমান রাজীব/এনএইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow