টরন্টোর রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেনে প্রশান্তির বিকেল
টরন্টো শহরের সঙ্গে আমার পরিচয় যত গভীর হচ্ছে; ততই আবিষ্কার করছি নগরীর আরেকটি শান্ত, স্নিগ্ধ ও সবুজ মুখ। বাইরে থেকে দেখলে টরন্টোকে মনে হয় আধুনিকতার প্রতীক। উঁচু ভবন, ব্যস্ত সড়ক, দ্রুতগতির জীবন আর প্রযুক্তিনির্ভর নগরসভ্যতা যেন এর পরিচয়ের প্রধান অংশ। অথচ এই শহরের আরেকটি পরিচয় আরও বেশি আকর্ষণীয়। প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও যত্ন নিয়ে টরন্টো নিজেকে গড়ে তুলেছে বিশ্বের অন্যতম সবুজ নগরী হিসেবে। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পার্ক, বাগান, জলাশয় ও সংরক্ষিত সবুজ এলাকা, যা মানুষের মনে এনে দেয় এক অন্যরকম প্রশান্তি। ফুল, গাছপালা, পাখির ডাক, নীল আকাশ, নদী কিংবা সমুদ্রের বিশালতা আমাকে বরাবরই টানে। প্রকৃতির কাছে গেলেই মনে হয়, জীবনের ক্লান্তি ও ব্যস্ততার ভেতরেও কোথাও যেন এক টুকরো নির্মল শান্তি অপেক্ষা করে আছে। তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যাই এমন কোনো স্থানে, যেখানে কিছু সময়ের জন্য শহুরে কোলাহল ভুলে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়া যায়। সেরকমই এক সুযোগে ৭ জুলাই বিকেলে গিয়েছিলাম টরন্টোর স্কারবরো এলাকায় লেক অন্টারিওর তীরে অবস্থিত রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেনে। সঙ্গে ছিলেন আমার প্রি
টরন্টো শহরের সঙ্গে আমার পরিচয় যত গভীর হচ্ছে; ততই আবিষ্কার করছি নগরীর আরেকটি শান্ত, স্নিগ্ধ ও সবুজ মুখ। বাইরে থেকে দেখলে টরন্টোকে মনে হয় আধুনিকতার প্রতীক। উঁচু ভবন, ব্যস্ত সড়ক, দ্রুতগতির জীবন আর প্রযুক্তিনির্ভর নগরসভ্যতা যেন এর পরিচয়ের প্রধান অংশ। অথচ এই শহরের আরেকটি পরিচয় আরও বেশি আকর্ষণীয়। প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও যত্ন নিয়ে টরন্টো নিজেকে গড়ে তুলেছে বিশ্বের অন্যতম সবুজ নগরী হিসেবে। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পার্ক, বাগান, জলাশয় ও সংরক্ষিত সবুজ এলাকা, যা মানুষের মনে এনে দেয় এক অন্যরকম প্রশান্তি। ফুল, গাছপালা, পাখির ডাক, নীল আকাশ, নদী কিংবা সমুদ্রের বিশালতা আমাকে বরাবরই টানে। প্রকৃতির কাছে গেলেই মনে হয়, জীবনের ক্লান্তি ও ব্যস্ততার ভেতরেও কোথাও যেন এক টুকরো নির্মল শান্তি অপেক্ষা করে আছে।
তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যাই এমন কোনো স্থানে, যেখানে কিছু সময়ের জন্য শহুরে কোলাহল ভুলে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়া যায়। সেরকমই এক সুযোগে ৭ জুলাই বিকেলে গিয়েছিলাম টরন্টোর স্কারবরো এলাকায় লেক অন্টারিওর তীরে অবস্থিত রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেনে। সঙ্গে ছিলেন আমার প্রিয় ভ্রমণসঙ্গী অরুন দত্ত, জয়ন্তী দাস এবং আমার সহধর্মিনী প্রণতি। চারজনের ছোট্ট এই দল নিয়ে যখন লেক অন্টারিওর পথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন থেকেই মনে হচ্ছিল আজকের বিকেলটি হয়তো প্রকৃতির সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপের দিন হয়ে থাকবে।
শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে গার্ডেনের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করল। কংক্রিটের আধিপত্যের পরিবর্তে চোখে পড়ল সবুজের বিস্তার, খোলা আকাশ আর দূরে নীল জলরাশির আভাস। মনে হচ্ছিল টরন্টোর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও প্রকৃতি নিজের জন্য শান্ত আশ্রয় গড়ে রেখেছে। রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেন শুধু একটি সাধারণ পার্ক নয়, এটি টরন্টোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অনন্য নিদর্শন। স্কারবরোর বিখ্যাত ব্লাফ এলাকার কাছে অবস্থিত বাগানটি লেক অন্টারিওর বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে মুখ করে আছে। একদিকে সবুজ ঘাসের মখমলি প্রান্তর, অন্যদিকে রঙিন ফুলের সমারোহ এবং নিচের দিকে নেমে যাওয়া প্রাকৃতিক ঢাল মিলিয়ে পুরো পরিবেশ যেন জীবন্ত চিত্রকর্ম। বাগানের সৌন্দর্যের বিশেষত্ব হলো এর স্বাভাবিক বিন্যাস। প্রকৃতিকে কৃত্রিমভাবে রূপ দেওয়ার পরিবর্তে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ন রেখেই এখানে বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছে। আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখনো ফুলের বাগান, কখনো সবুজ প্রান্তর, আবার কখনো লেকের দৃষ্টিনন্দন ভিউপয়েন্ট সামনে এসে হাজির হচ্ছিল। প্রতিটি বাঁক যেন নতুন বিস্ময়ের দুয়ার খুলে দিচ্ছিল।

কানাডার টরন্টো শহরের বুকে আরেক বাংলাদেশ
রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেনের ইতিহাসও সমানভাবে আকর্ষণীয়। এটি শুধু একটি নান্দনিক উদ্যান নয়, বরং টরন্টোর নগরায়ণ, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শিল্পোদ্যোক্তা থমাস ম্যাকডোনাল্ড ওয়েস্ট স্কারবরো ব্লাফসের ওপর অবস্থিত প্রায় চল্লিশ একর আয়তনের রাম্ফ ফার্মটি ক্রয় করেন। পরে তিনি সম্পত্তিটি তাঁর চার সন্তানের মধ্যে ভাগ করে দেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন রোজেটা ওয়েস্ট, যিনি পরবর্তীকালে রবার্ট ওয়াটসন ম্যাকক্লেইনকে বিয়ে করেন।
রোজেটা, তাঁর স্বামী এবং ভাই জোসেফ ম্যাকডোনাল্ড ওয়েস্ট মিলে পাহাড় চূড়ার খামারবাড়িটিকে ধীরে ধীরে মনোরম উদ্যানভূমিতে রূপ দেন। আজও বাগানের পুরোনো পাথরের দেওয়াল, ঐতিহাসিক পথ এবং কিছু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে চলেছে। রোজেটা ম্যাকক্লেইনের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী ১৯৫৯ সালে সম্পত্তিটি টরন্টো সিটির কাছে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য দান করেন। পরবর্তীকালে পাশের আরও কিছু জমি যুক্ত হওয়ায় বাগানটির পরিসর বৃদ্ধি পায় এবং এটি বৃহত্তর স্কারবরো ব্লাফস এলাকার সংরক্ষিত সবুজ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। বর্তমানে সুপরিকল্পিত গোলাপ বাগান, শৈল্পিক ফোয়ারা, সুগন্ধি উদ্ভিদ, প্রতিবন্ধীবান্ধব পথ, ব্রেইল তথ্যফলক এবং শতাধিক প্রজাতির পাখির আবাস উদ্যানকে শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয় বরং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার অনুকরণীয় উদাহরণে পরিণত করেছে।
গার্ডেনে প্রবেশ করতেই প্রথম যে বিষয়টি মন কেড়ে নিলো, তা হলো ফুলের অপূর্ব বৈচিত্র্য। বিশেষ করে গোলাপ বাগানটি যেন রঙের উৎসব। লাল, গোলাপি, সাদা, হলুদ এবং নানা বর্ণের গোলাপ একে অন্যের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছে। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে ঋতুভিত্তিক ফুল এবং বহুবর্ষজীবী নানা প্রজাতির উদ্ভিদ। মনে হচ্ছিল প্রতিটি ফুল যেন নিজস্ব ভাষায় প্রকৃতির সৌন্দর্যের কবিতা আবৃত্তি করছে। আমরা ধীরে ধীরে বাগানের পথ ধরে এগিয়ে চললাম। কখনো থেমে ছবি তুলছি, কখনো ফুলের কাছে দাঁড়িয়ে তাদের রং ও সুবাস উপভোগ করছি। বাতাসে ভেসে আসা মৃদু সুগন্ধ আর পাখিদের কিচিরমিচির পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ভ্রমণের প্রকৃত আনন্দ। ক্যামেরায় যত ছবি ধরা পড়েছে, তার চেয়েও বেশি ছবি অঙ্কিত হয়েছে মনের ক্যানভাসে।
তবে রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে লেক অন্টারিওর অপরূপ দৃশ্য। গার্ডেনের উঁচু অংশে দাঁড়িয়ে যখন নিচের দিকে তাকালাম, তখন মনে হলো যেন পৃথিবীর বিশাল নীল ক্যানভাস চোখের সামনে খুলে গেছে। দিগন্তজোড়া জলরাশি, তার ওপর সূর্যের প্রতিফলন, দূরে আকাশ আর পানির মিলনরেখা এবং চারপাশের সবুজ পরিবেশ মিলে সৃষ্টি করেছে অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের অস্তিত্বকেই নতুনভাবে অনুভব করে। উপলব্ধি হয়, সভ্যতা যতই এগিয়ে যাক, প্রকৃতির সামনে মানুষ সব সময়ই বিনম্র। হয়তো এ কারণেই মানুষ অবসর পেলেই পাহাড়, সমুদ্র, বন কিংবা এমন কোনো বাগানে ছুটে যায়, যেখানে কিছু সময়ের জন্য নিজের সঙ্গে নিজের দেখা হয়। এখানে এসে দেখলাম কেউ পরিবার নিয়ে পিকনিক করছে, কেউ বেঞ্চে বসে বই পড়ছে, কেউ নীরবে লেকের দিকে তাকিয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও সবার মুখে একই প্রশান্তির ছাপ।
টরন্টো শহরের অন্যতম শক্তি তার সুদূরপ্রসারী সবুজ পরিকল্পনা। আধুনিক নগর উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকেও এখানে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য পার্ক, উদ্যান, বনাঞ্চল ও জলাভূমি শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নয়, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ব্যস্ত কর্মজীবনের মানুষ এখানে এসে কিছুটা বিশ্রাম নেয়, পরিবার নিয়ে সময় কাটায়, শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হয় এবং বয়স্করা ফিরে পান মানসিক প্রশান্তি। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার বাংলাদেশের কথাও মনে পড়ছিল। ঢাকার রমনা পার্ক, টিকাটুলির বলদা গার্ডেন কিংবা গ্রামের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের স্মৃতি বারবার ফিরে আসছিল। দেশ ভিন্ন হতে পারে, জলবায়ু ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা সর্বত্র একই। ফুলের সৌন্দর্য, গাছের ছায়া, পাখির গান কিংবা জলরাশির বিশালতা পৃথিবীর সব মানুষের হৃদয়কেই সমানভাবে স্পর্শ করে।
এরই মধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসতে শুরু করেছে। সূর্যের কোমল সোনালি আলো লেক অন্টারিওর জলে অপূর্ব আলোর কারুকাজ তৈরি করেছে। আমরা চারজন কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। কথা বলার প্রয়োজন ছিল না। প্রকৃতিই যেন আমাদের হয়ে কথা বলছিল। কিছু মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দি হলো, আর অনেকগুলো মুহূর্ত নীরবে জায়গা করে নিলো হৃদয়ের গভীরে। ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, বিকেলটি শুধু একটি বাগান ভ্রমণের স্মৃতি নয় বরং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর আত্মিক সংযোগের অভিজ্ঞতা। লেক অন্টারিওর বিশালতা, ফুলের সৌন্দর্য, সবুজের শান্তি এবং প্রিয় মানুষদের সান্নিধ্য মিলিয়ে দিনটি জীবনের ভ্রমণপঞ্জিতে উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রইল।

নায়াগ্রার গর্জন পেরিয়ে টরন্টোর পথে
ভ্রমণ মানুষকে শুধু নতুন স্থান দেখায় না, নতুন অনুভূতির সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়। রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেনের সেই বিকেল আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিলো, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের অনেক অস্থিরতার উত্তর লুকিয়ে থাকে। সতেজ মন, প্রশান্ত হৃদয় আর একগুচ্ছ অবিস্মরণীয় স্মৃতি নিয়ে আমরা যখন বাসার পথে ফিরছিলাম; তখন মনে হচ্ছিল টরন্টোর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও প্রকৃতি এখনো মানুষের জন্য নীরবে ভালোবাসার দরজা খুলে রেখেছে।
এসইউ
What's Your Reaction?
