টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধসে প্রাণহানি ৩০
চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসে গত পাঁচ দিনে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলায় পাঁচজন করে এবং রাঙামাটি জেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে টানা কয়েক দিনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে বহু সড়ক ও রেললাইন। জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশন পাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় একই এলাকার দুই পরিবারের পাঁচজনের ম
চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসে গত পাঁচ দিনে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলায় পাঁচজন করে এবং রাঙামাটি জেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে টানা কয়েক দিনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে বহু সড়ক ও রেললাইন।
জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশন পাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় একই এলাকার দুই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রশাসন সূত্র জানায়, ভোর প্রায় চারটার দিকে প্রথম পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে মো. ইউনুস (৪০), তার স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মো. সোলায়মান নিহত হন। এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর একই এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসে মো. জুয়েল (৩৪) ও তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৫) প্রাণ হারান।
এর আগে বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়ায় ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ের পাশে নির্মিত একটি রিটেইনিং দেয়াল ধসে নারী হিফজ মাদ্রাসার পাঁচ ছাত্রীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন। উদ্ধারকারী দল মাদ্রাসা থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে। আহত তিন ছাত্রীকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) ও উমাইসা বিবি (১৩)।
চট্টগ্রামেও টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার পৃথক ঘটনায় ১০ মাস বয়সী শিশু আশরাফুল ইসলাম এবং ১৩ বছর বয়সী সামিয়া ইসলামের মৃত্যু হয়। এর আগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ও দেয়াল ধসে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গত মানুষের আশ্রয়ের জন্য চট্টগ্রাম জেলায় ৪১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৮ হাজার ৩৪০ জন মানুষ। রাঙামাটিতে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ২০৬ জন, খাগড়াছড়িতে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং বান্দরবানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ১৭৩ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। কক্সবাজারে ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলেও বর্তমানে সেখানে আশ্রিত মানুষের তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দুর্গত পাঁচ জেলায় জরুরি সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ, চাল ও শিশু খাদ্য বরাদ্দ দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ জুলাই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান প্রতিটি জেলায় ১০ লাখ টাকা করে মোট ৫০ লাখ টাকা নগদ অর্থ এবং প্রতিটি জেলায় ২০০ মেট্রিক টন করে মোট ১ হাজার মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পরে ৯ জুলাই শিশুখাদ্য সহায়তার জন্য চট্টগ্রামে ২৫ লাখ টাকা, কক্সবাজারে ২০ লাখ টাকা এবং রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রামে ৩০০ মেট্রিক টন, কক্সবাজারে ২৫০ মেট্রিক টন এবং রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ২০০ মেট্রিক টন করে মোট ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় থাকা এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, রামপুরা, বাকলিয়া, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, বসতঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
ভারী বর্ষণের প্রভাব পড়েছে রেল যোগাযোগেও। চট্টগ্রামের সুন্নিয়া মাদ্রাসা ও শমসেরপাড়া এলাকায় প্রায় চার কিলোমিটার রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও রেললাইনের ওপর প্রায় দুই ফুট পানি জমেছে।
এদিকে পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকে প্রায় ৪৫০ পর্যটক আটকা পড়েছেন। আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতির কারণে স্থানীয় প্রশাসন সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনা এড়াতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় পর্যটকদের প্রবেশ সাময়িক বন্ধ করেছে বন বিভাগ। শুক্রবার পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পাহাড়ের পাদদেশ, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল ও নিচু এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, শিশুখাদ্য ও তিন বেলার খাবার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতেও চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পাহাড়ধস, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকায় সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
What's Your Reaction?