টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল, নিরুপায় অর্ধলক্ষ মানুষ

টানা পাঁচ দিনের বর্ষণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একইসঙ্গে এই উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। জোয়ারের পানির সঙ্গে ভারী বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও বাজার তলিয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। চুলা ডুবে যাওয়ায় রান্না করতে না পেরে অনাহারে অনেক পরিবার। অন্যদিকে ক্ষতির মুখে পড়েছে আমন ধানের বীজতলা ও মাছের ঘের। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও জাহাজমারা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এবং পৌরসভার প্রায় সব ওয়ার্ডেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কোথাও বাড়ির আঙিনা, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও কাঁচা-পাকা সড়ক ও বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় বাসিন্দারা কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নাঞ্চলের মানুষ। রান্নার চুলা ডুবে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাবার রান্না করতে পারছে না। পাশাপাশি নিরাপদ খা

টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল, নিরুপায় অর্ধলক্ষ মানুষ

টানা পাঁচ দিনের বর্ষণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একইসঙ্গে এই উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

জোয়ারের পানির সঙ্গে ভারী বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও বাজার তলিয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। চুলা ডুবে যাওয়ায় রান্না করতে না পেরে অনাহারে অনেক পরিবার। অন্যদিকে ক্ষতির মুখে পড়েছে আমন ধানের বীজতলা ও মাছের ঘের। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও জাহাজমারা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এবং পৌরসভার প্রায় সব ওয়ার্ডেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কোথাও বাড়ির আঙিনা, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও কাঁচা-পাকা সড়ক ও বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় বাসিন্দারা কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নাঞ্চলের মানুষ। রান্নার চুলা ডুবে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাবার রান্না করতে পারছে না। পাশাপাশি নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন না।

টানা বর্ষণে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। বিস্তীর্ণ এলাকার আমনের বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক মাছের ঘের ও পুকুর উপচে মাছ ভেসে গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত পানি না নামলে চলতি আমন মৌসুমের চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

জাহাজমারা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাহাব উদ্দিন বলেন, 'মাত্র কয়েকদিন আগেও যেখানে গরু, ছাগল ও মহিষ চরত, সেখানে এখন নৌকা চলাচল করছে। বাড়ির চারপাশে পানি জমে আছে, অনেকের ঘরেও পানি ঢুকেছে। চুলা ডুবে যাওয়ায় রান্না করা যাচ্ছে না। ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে।'

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের কৃষক আমির হোসেন বলেন, 'আমার পুরো বীজতলা পানির নিচে। পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। এখন নতুন করে কীভাবে চাষাবাদ করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।'

পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, 'বাড়ির উঠান থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত সব জায়গায় পানি। চুলা ডুবে যাওয়ায় রান্না করতে পারছি না। শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।'

পশ্চিম মাইজচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছায়েদুল ইসলাম মিঠু বলেন, টানা বৃষ্টিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক সড়ক হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে গেছে, আবার কোথাও কাদামাটির কারণে চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর। ছোট শিক্ষার্থীরা ভিজে ও কাদামাখা পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসছে। অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। নারী শিক্ষকদেরও বৃষ্টিতে ভিজে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হচ্ছে।

সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি আহসান হাবীব রুবেল বলেন, হাতিয়ার ছোট-বড় প্রায় সব খালে বেহুন্দী জাল বসানো থাকায় বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারছে না। এছাড়া উপজেলার প্রায় ২০টি সুইসগেটের অধিকাংশের ডালা বন্ধ থাকায় পানি নামার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি দ্রুত বেহুন্দী জাল অপসারণ, সুইসগেট সচল করা এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় হাতিয়ার অধিকাংশ এলাকায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। খাল ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকে। এবার টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে হাতিয়ার জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

দ্বীপবাসীর দাবি, প্রতি বছর একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ত্রাণ সহায়তা এবং কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রাসেল ইকবাল বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপজেলার ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। অনেক এলাকায় শুকনো খাবার ও সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, হাতিয়া নদীবেষ্টিত একটি দ্বীপ উপজেলা হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল। এ কারণে সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে অধিকাংশ এলাকার পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow