টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে বাঁশশিল্প

পাড়ার প্রবেশ পথে ঢুকতেই কানে আসে বাঁশ চিরে ফালি তৈরির খসখস শব্দ। দেখা গেল উঠানে বসে এক বৃদ্ধ বাঁশ কাটছেন। পাশেই নারীরা নিপুণ হাতে বুনছেন কুলা। কোথাও তৈরি হচ্ছে ঝুড়ি ও হাঁস-মুরগির খাঁচা। ঘরের বারান্দা, উঠান কিংবা গাছের ছায়ায় চলছে এমন কর্মব্যস্ততা। পুরো পাড়াটিই যেন একটি জীবন্ত কর্মশালা। অথচ এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। বলছি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার বাঁশ-বেত শিল্পের কারিগরদের কথা। এই পাড়ার বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা গড়ে উঠেছে বাঁশের কুটির শিল্পকে ঘিরে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা তৈরি করে আসছেন কুলা, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগির খাঁচাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানান সামগ্রী। একসময় গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে এসব পণ্যের ব্যবহার ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সস্তা প্লাস্টিকের পণ্যের আগ্রাসনে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার প্রায় ৩৫টি পরিবার এখনো এই কুটির শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে উৎপাদনকাজে যুক্ত। আরও পড়ুন

টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে বাঁশশিল্প

পাড়ার প্রবেশ পথে ঢুকতেই কানে আসে বাঁশ চিরে ফালি তৈরির খসখস শব্দ। দেখা গেল উঠানে বসে এক বৃদ্ধ বাঁশ কাটছেন। পাশেই নারীরা নিপুণ হাতে বুনছেন কুলা। কোথাও তৈরি হচ্ছে ঝুড়ি ও হাঁস-মুরগির খাঁচা। ঘরের বারান্দা, উঠান কিংবা গাছের ছায়ায় চলছে এমন কর্মব্যস্ততা। পুরো পাড়াটিই যেন একটি জীবন্ত কর্মশালা।

অথচ এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। বলছি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার বাঁশ-বেত শিল্পের কারিগরদের কথা।

এই পাড়ার বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা গড়ে উঠেছে বাঁশের কুটির শিল্পকে ঘিরে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা তৈরি করে আসছেন কুলা, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগির খাঁচাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানান সামগ্রী।

টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে বাঁশশিল্প

একসময় গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে এসব পণ্যের ব্যবহার ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সস্তা প্লাস্টিকের পণ্যের আগ্রাসনে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার প্রায় ৩৫টি পরিবার এখনো এই কুটির শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে উৎপাদনকাজে যুক্ত।

সম্প্রতি এই পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ ফালি তৈরি করছেন, কেউ কুলা বা ঝুড়ি বুনছেন। আবার কেউ হাঁস-মুরগির খাঁচা তৈরি করছেন। বছরের পর বছর ধরে অর্জিত দক্ষতা ও শ্রমে তৈরি হচ্ছে প্রতিটি পণ্য। কিন্তু সেই শ্রমের ন্যায্য মূল্য মিলছে না বলে জানান কারিগররা।

কথা হয় কারিগর নিখিল নমো সূত্রধরের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কাজ করছি। আমার বাবা-দাদারাও এই কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার বদলে এই কাজ শিখেছি। এখন এই কাজ ছাড়া আর কিছু পারি না।’

তিনি বলেন, ‘মাছিমপুর বাজার কিংবা গাজীপুর বাজার থেকে বাঁশ কিনতে হয়। একটি ভালো বাঁশ কিনতে ৪০০-৫০০ টাকা খরচ হয়। একটি ভালো বাঁশ দিয়ে পাঁচ দিনে ১৫-২০টি কুলা তৈরি করা যায়। এই আয় দিয়েই পুরো সংসার চালাতে হয়। কিন্তু পরিশ্রমের তুলনায় আয় খুবই কম।’

‘আমাদের ছেলেমেয়েরা আর এই কাজ করতে চায় না। তারা বিদেশে যেতে চায়, অন্য পেশায় যেতে চায়। সারাদিন পরিশ্রম করেও এই পেশায় ভালোভাবে সংসার চালানো যায় না। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এই শিল্পই হারিয়ে যাবে’, বলেন কারিগর নিখিল নমো সূত্রধর।

নারী কারিগর লঞ্চরানি নম, নমিতা, অমিল্য ও নারায়ণ বলেন, ‘ভালো বাঁশ আনতে মুরাদনগর কিংবা ঘাড়মুড়া যেতে হয়। আগের তুলনায় বাঁশের দাম অনেক বেড়েছে। আমরা মূলত হাঁস-মুরগির খাঁচা তৈরি করি। স্বামী-স্ত্রী মিলে সপ্তাহে ১৫টির মতো খাঁচা বানাতে পারি। এই কাজের বড় অংশই নারীরা করে থাকেন। কিন্তু সেই শ্রমের মূল্য পাই না।’

টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে বাঁশশিল্প

কারিগর মিলন, কনিকা, মিনা ও নিখিল নম সূত্রধর বলেন, ‘অভাবের কারণেই এই পেশায় আছি। অন্য সুযোগ থাকলে হয়তো এই কাজ করতাম না। সরকারিভাবে কোনো প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ কিংবা প্রশিক্ষণ পাই না। অনেকেই ঋণ করে ব্যবসা চালাচ্ছেন। সরকার যদি আমাদের পাশে দাঁড়াত, তাহলে নতুন প্রজন্মও হয়তো এই শিল্পে আগ্রহী হতো।’

কারিগরদের মতে, বাঁশের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে কিন্তু পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। অন্যদিকে কম দামের প্লাস্টিকের পণ্যের দাপটে বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদাও কমছে।

বাঁশ-বেত শিল্পের খুচরা ব্যবসায়ী রিপন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই পাড়ার প্রায় ৩৫টি পরিবার এই কাজের ওপর নির্ভরশীল। আমি এখান থেকে একটি হাঁস-মুরগির খাঁচা ১৮০ টাকায় কিনে বিভিন্ন বাজারে ২০০ টাকায় বিক্রি করি। পণ্যের মান ভালো। বাজার আরও বড় হলে কারিগররাও ভালো দাম পেতেন।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কুমিল্লার উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘তিতাসে এ ধরনের শিল্প রয়েছে, সেটা আমাদের জানা আছে। কিন্তু অনেক কারিগর নিবন্ধন না করায় তারা বিসিকের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উপজেলা পর্যায়ে আমাদের আলাদা কর্মকর্তা না থাকায় নিয়মিত তদারকি করা কঠিন। তবে তারা নিবন্ধন করলে আর্থিক সহায়তা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আধুনিক নকশা উন্নয়ন, বিপণন সুবিধা এবং মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।’

তিনি আরও বলেন, কেউ বিদেশে পণ্য রপ্তানি করতে চাইলে বিসিক সেই ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করবে।

এসআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow