‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস’

শেষ বাঁশি বেজে গেছে, চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। তবে সবার আগে ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিলো লিওনেল মেসিকে। হতাশ, বিধ্বস্ত কিন্তু কাঁদছেন না। এ যেন নিজের সঙ্গেই নিজের যুদ্ধ, নিজেকে সামলাচ্ছেন। যেন শেষ যুদ্ধের পর এক যোদ্ধা নিজের ভেতরের ঝড়কে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানেন, সব রাজাধিরাজ শেষবার মুকুট মাথায় রেখেই সিংহাসন ছাড়েন না। রানার্সআপ মেডেল নিলেন, গ্যালারি কম্পিত হলো ‘মেসি মেসি’ স্লোগানে। এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না, চোখ দিয়ে অশ্রু নদী বইয়ে যেতে লাগলো। ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি বলে উঠলেন, ‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস।’ চ্যাম্পিয়নস লীগ, ক্লাব বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ- ক্যারিয়ারে কি জেতেননি মেসি? ক্যারিয়ারে জেতা সম্ভব এমন কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জিততে বাকি নেই তার। এমনকি ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি শিরোপা জয়ের রেকর্ডও আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপজয়ীর দখলে। যে আক্ষেপ ছিল বিশ্বকাপ, ২০২২ সালে সেটাও জিতেছেন। তবু কেন এই বিশ্বকাপে মেসি, আগের মতো খেলতে পারবেন! এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে এই দুটো প্রশ্নই ঘুরেফিরে আলোচিত ছিল। শুরুটা করলেন হ্যাটট্রিক দিয়ে,

‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস’

শেষ বাঁশি বেজে গেছে, চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। তবে সবার আগে ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিলো লিওনেল মেসিকে। হতাশ, বিধ্বস্ত কিন্তু কাঁদছেন না। এ যেন নিজের সঙ্গেই নিজের যুদ্ধ, নিজেকে সামলাচ্ছেন। যেন শেষ যুদ্ধের পর এক যোদ্ধা নিজের ভেতরের ঝড়কে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানেন, সব রাজাধিরাজ শেষবার মুকুট মাথায় রেখেই সিংহাসন ছাড়েন না। রানার্সআপ মেডেল নিলেন, গ্যালারি কম্পিত হলো ‘মেসি মেসি’ স্লোগানে। এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না, চোখ দিয়ে অশ্রু নদী বইয়ে যেতে লাগলো। ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি বলে উঠলেন, ‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস।’

চ্যাম্পিয়নস লীগ, ক্লাব বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ- ক্যারিয়ারে কি জেতেননি মেসি? ক্যারিয়ারে জেতা সম্ভব এমন কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জিততে বাকি নেই তার। এমনকি ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি শিরোপা জয়ের রেকর্ডও আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপজয়ীর দখলে। যে আক্ষেপ ছিল বিশ্বকাপ, ২০২২ সালে সেটাও জিতেছেন। তবু কেন এই বিশ্বকাপে মেসি, আগের মতো খেলতে পারবেন! এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে এই দুটো প্রশ্নই ঘুরেফিরে আলোচিত ছিল।

শুরুটা করলেন হ্যাটট্রিক দিয়ে, গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই ৫ গোল। নকআউটে প্রত্যেক ম্যাচে আর্জেন্টিনা খাদে পড়েছে আর মেসি উদ্ধার করেছেন। ৮ গোল ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে শেষ করলেন বিশ্বকাপ, অথচ বয়সটা হয়ে গেছে ৩৯। ফাইনালে আসলে আর্জেন্টিনা পাত্তাই পায়নি। স্পেন ১২০ মিনিট একচেটিয়া আধিপত্য দেখিয়েছে। ১১৭ মিনিট লেগেছে আর্জেন্টিনার গোলমুখে একটা শট নিতে। অথচ এই টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল তাদেরই। ফুটবল আসলে এমনই। কখনো কখনো নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়।

‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস’

না হলে শুরু থেকে ফিনিক্স পাখির মতো এগিয়ে চলা আর্জেন্টিনা ফাইনালে এমন বোতলবন্দি হয়ে থাকেই বা কীভাবে! লিওনেল মেসিও কিছু করতে পারেননি। ফাইনালের আগে স্পেনের কোচ গল্প করছিলেন, একবার যুবক মেসিকে তিনি ৭০ মিনিট আটকে রেখেছিলেন। তবে এরপর ১৪ মিনিটেই ৪ গোল করে তাকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মেসি! ফাইনালে অবশ্য মেসি সেই সুযোগ পাননি। স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা তার পায়ে বল গেলেই ট্যাকল করেছে। ৩৯ বছরের একজন ফুটবলারকে এখনো বল পায়ে থামাতে গেলে ট্যাকল ছাড়া উপায় নেই।

এক অদ্ভুত সময়ের বৃত্ত যেন পূর্ণ হলো। ১৯ বছর আগে ছোট্ট লামিনে ইয়ামালকে কোলে তুলে গোসল করিয়েছিলেন মেসি, আর দুই দশক পর সেই ইয়ামালের দলের বিপক্ষেই বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে হারতে হলো তাকে। কিন্তু এখানেই মেসির মহত্ত্ব—পরাজয়ের ভারে নুয়ে পড়েও তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব হারাননি। হতাশ হয়ে বসে থাকা মেসির দিকে যখন ইয়ামাল এগিয়ে এলেন, তিনি সব কষ্ট এক পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালেন, জড়িয়ে ধরলেন প্রতিপক্ষ তরুণকে।

এই একটি মুহূর্তেই বোঝা যায়, কেন মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একজন আদর্শ। জয় মানুষকে বড় করে না, কখনো কখনো পরাজয়ের মুহূর্তে নিজের আচরণই একজন মানুষকে কিংবদন্তি করে তোলে। লিওনেল মেসির বিনয়, ভদ্রতা আর প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান নতুন কোনো গল্প নয়; তার পায়ের জাদুর মতোই তার ব্যক্তিত্বও ফুটবল বিশ্বের কাছে এক অনন্য উদাহরণ।

‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস’

বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়ার ছোট্ট মাঠ থেকে শুরু হয়েছিল এক রূপকথার যাত্রা। সেই কিশোরই একদিন হয়ে উঠলেন বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার। আজও লা মাসিয়ার প্রতিটি তরুণ স্বপ্ন দেখে মেসিকে সামনে রেখে, কারণ সেখানে মেসি শুধু একজন সাবেক খেলোয়াড় নন, সবার জন্যই আদর্শ।

ফাইনালের মঞ্চে তাই প্রতিপক্ষের জার্সি গায়ে থাকা অনেকের কাছেই মেসি ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী নন, ছিলেন শৈশবের নায়ক। তার পায়ে ট্যাকল করেও সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে উঠিয়ে দেওয়া, ক্ষমা চাওয়া—এসব দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, একজন কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা কতটা গভীর হতে পারে।

সেজন্যই ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপের সেরা যুব খেলোয়ার স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পাউলো কুবারসিরও মেসির জন্য মন খারাপ হয়। তিনি বলেন, ‘মেসির সঙ্গে একই মাঠে খেলতে পারা ছিল আমার জন্য বিশাল এক সৌভাগ্য।। আমার খারাপও লেগেছে, কারণ তিনি আমার আদর্শ। আর আমি তাকে হারতে দেখতে পছন্দ করি না।’

‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস’

মেসির চোখের জলও যেন তার ক্যারিয়ারের একেকটি অধ্যায়ের সাক্ষী। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর সেই নিঃশব্দ কান্না, ২০১৬ কোপা আমেরিকার পর ভেঙে পড়া—বারবার স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা তাকে স্পর্শ করেছে। এমনকি একসময় বিদায়ও বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভালোবাসার টানে, কোটি মানুষের প্রত্যাশায় আবার ফিরে এসেছিলেন। ২০১৮ বাছাই পর্বে হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে পৌছে দেন, যদিও সেই যাত্রার শেষ হয়েছিল শেষ ষোলোতেই।

তারপর শুরু হলো লিওনেল স্ক্যালোনির সঙ্গে এক নতুন অধ্যায়। যে মানুষটি বছরের পর বছর অপূর্ণতার ভার বয়ে বেড়িয়েছেন, তিনিই ২০২২ বিশ্বকাপে ছুয়ে ফেললেন ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন—বিশ্বকাপ। মন্টিয়েলের শেষ পেনাল্টি জালে জড়াতেই মেসি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে পড়েছিলেন, চোখ বেয়ে নেমে এসেছিল আনন্দের অশ্রু। এক জীবনে একই মানুষকে এত ভিন্ন ধরনের কান্নার সাক্ষী হতে হয়েছে—কখনো হারার, কখনো পাওয়ার। আর বারবার ভেঙেছেন, আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, আর শেষ পর্যন্ত নিজের গল্পকে মহাকাব্যে পরিণত করেছেন। কিন্তু মহাকাব্যের শেষ পৃষ্টায়া ফাঁকাই রইলো।

অথচ শুরুটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো। প্রথম ম্যাচ থেকেই ছিলেন গোল্ডেন বুটের দৌড়ে, কারণ ক্যারিয়ারের এত অর্জনের মাঝেও এই এক পুরস্কারই ছিল তাঁর অধরা। কিন্তু এবারও ভাগ্য তার পাশে দাঁড়াল না। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপে শুধু গোল্ডেন বুটই নিজের করে নিলেন না, বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ডও গড়লেন। তবু মনে হচ্ছিল, গোল্ডেন বলের পাল্লা মেসির দিকেই ভারী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল, অসংখ্য অ্যাসিস্ট, প্রতিটি ম্যাচে দলের জয়ে সরাসরি প্রভাব—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আরেকটি ব্যক্তিগত মুকুট তার অপেক্ষায়। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো নিজের মতো করে গল্প লেখে। সবাইকে চমকে দিয়ে সেই পুরস্কার উঠল স্পেনের রদ্রির হাতে।
২০২১ থেকে ২০২৬—আর্জেন্টিনার এই দলটা যেন মাঠে নামলেই সোনা ফলিয়েছে। এই ফাইনালের আগে যে কয়টি বড় টুর্নামেন্ট খেলেছে, প্রতিটিতেই উঠেছে চ্যাম্পিয়নের মঞ্চে। দুটি কোপা আমেরিকার মাঝে বিশ্বকাপ আর ফিনালিসিমার ট্রফি—একটি প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণের গল্প লিখেছে তারা।

‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস’

২১ বছরেরও বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মেসি জয় করেছেন প্রায় সবকিছু। ব্যক্তিগত অর্জন, ক্লাব ফুটবলের অসংখ্য সাফল্য, আরাধ্য বিশ্বকাপ—একজন ফুটবলারের জীবনে যা কিছু চাওয়া যায়, তার প্রায় সবই পূর্ণ হয়েছে। তবু শেষ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে তার চোখে জল এসেছে।
কারণ এই কান্না কোনো অপূর্ণতার কান্না ছিল না, ছিল ভালোবাসার কান্না। ফুটবলের প্রতি, আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি, কোটি মানুষের স্বপ্নের প্রতি এক গভীর টানের বহিঃপ্রকাশ ছিল সেই অশ্রু। শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে খালি হাতে ফেরার যন্ত্রণা হয়তো তার চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝতে পারবে না।

আর্জেন্টিনার অন্য কেউ সেদিন কাঁদেননি। কেঁদেছিলেন সেই মানুষটি, যার আর কিছু জেতার বাকি নেই। আর ঠিক এখানেই আলাদা হয়ে যান লিওনেল মেসি। কারণ তাঁর জন্য ফুটবল কখনো শুধু ট্রফি জয়ের গল্প ছিল না; ফুটবল ছিল অনুভূতি, ভালোবাসা আর নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার এক আজীবন প্রতিশ্রুতি। ও হ্যাঁ আরেকজনও কেঁদেছেন, লিওনেল স্ক্যালোনি! সংবাদ সম্মেলনে রীতিমতো বাচ্চাদের মতো করে কেঁদেছেন। অথচ ডাগআউটে এই মানুষটাই যেন রোবটের মতো আবেগ সংবরন করতেন!

মেসি আবার কবে খেলবেন নাকি আর খেলবেন না? পরের বিশ্বকাপ তার খেলার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। যদিও এখনো নিশ্চিত নয় মেসি আর কয়দিন খেলবেন! স্ক্যালোনি অবশ্য সব মেসির উপরই ছেড়ে দিয়েছেন, ‘সে যত দিন চাইবে তত দিন খেলবে, এ বিষয়ে আমি পরিষ্কার। বাকি খেলোয়াড় ও পাশে থাকা সবাই তাকে সমর্থন দিয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত, সবাই তাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। কারণ, সে–ই ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।’

‘টিয়ার্স ইন আইচ, গ্রেটেস্ট টিয়ারস’

গুঞ্জন আছে, আগামী বিশ্বকাপে দল বাড়াবে ফিফা। উদ্বোধনী ম্যাচটাও হবে আর্জেন্টিনায়। তবে ওই আসরে মেসিকে দেখা যাবে না, মেসিকে ছাড়াও বিশ্বকাপ মাঠে গড়াবে আর আর্জেন্টিনাও ঠিকই মাঠে নামবে! ব্যাপারগুলো হজম করতে একটু সময়ই লাগবে।

ধন্যবাদ, লিও। শুধু ট্রফি জেতার জন্য নয়, শুধু রেকর্ড গড়ার জন্যও নয়—একটি পুরো প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখানোর জন্য। তিনি দেখিয়েছেন, স্বপ্ন পূরণের জন্য অপেক্ষা করাও সার্থক, আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও হৃদয়ভাঙার কষ্টই একদিন সাফল্যের মুহূর্তকে আরও বিশেষ করে তোলে।

এসকেডি/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow