ঠাকুরগাঁওয়ে যৌতুকের বলি অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ, পরিবারের দাবি হত্যা

বসতভিটার শেষ সম্বল সাড়ে সাত শতক জমি বিক্রি করার সময় মহেন্দ্র নাথ রায়ের বুক কেঁপেছিল ঠিকই, কিন্তু মনে সান্ত্বনা ছিল একটাই— মাতৃহীন ছোট মেয়েটা অন্তত সুখে থাকবে। তিন লাখ টাকা যৌতুক নির্ধারণ করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। আড়াই লাখ টাকা বিয়ের আসরেই শোধ করেছিলেন। ভেবেছিলেন, বাকি সামান্য ৫০ হাজার টাকার জন্য স্বজনরা হয়তো কোনো দিন হিংস্র হয়ে উঠবে না। কিন্তু সেই টাকাই শেষ পর্যন্ত কাল হলো গৃহবধূ রাধা রাণীর জীবনে। রাধার গর্ভে থাকা চার মাসের অনাগত সন্তানটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগে পিষ্ট হলো যৌতুকের নির্মম বলিষ্ঠতায়। ঘটনাটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার রাঘবপুর গ্রামে। জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট মাসে পীরগঞ্জের রাঘবপুর গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক মিঠুন চন্দ্র রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় একই উপজেলার জয়কুড় গ্রামের রাধা রাণীর। কাগজে-কলমে বয়স ১৮ দেখানো হলেও রাধা তখন ছিলেন মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের বাকি টাকার জন্য তার ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের খড়গ। সুখের আশায় ঘর বাঁধলেও নির্যাতনই হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। রাধার বড় ভাই সুভাষ চন্দ্র রায় ও ভাবি মানতা রাণী অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের সময় আ

ঠাকুরগাঁওয়ে যৌতুকের বলি অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ, পরিবারের দাবি হত্যা

বসতভিটার শেষ সম্বল সাড়ে সাত শতক জমি বিক্রি করার সময় মহেন্দ্র নাথ রায়ের বুক কেঁপেছিল ঠিকই, কিন্তু মনে সান্ত্বনা ছিল একটাই— মাতৃহীন ছোট মেয়েটা অন্তত সুখে থাকবে। তিন লাখ টাকা যৌতুক নির্ধারণ করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। আড়াই লাখ টাকা বিয়ের আসরেই শোধ করেছিলেন।

ভেবেছিলেন, বাকি সামান্য ৫০ হাজার টাকার জন্য স্বজনরা হয়তো কোনো দিন হিংস্র হয়ে উঠবে না। কিন্তু সেই টাকাই শেষ পর্যন্ত কাল হলো গৃহবধূ রাধা রাণীর জীবনে। রাধার গর্ভে থাকা চার মাসের অনাগত সন্তানটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগে পিষ্ট হলো যৌতুকের নির্মম বলিষ্ঠতায়।

ঘটনাটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার রাঘবপুর গ্রামে।

জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট মাসে পীরগঞ্জের রাঘবপুর গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক মিঠুন চন্দ্র রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় একই উপজেলার জয়কুড় গ্রামের রাধা রাণীর। কাগজে-কলমে বয়স ১৮ দেখানো হলেও রাধা তখন ছিলেন মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের বাকি টাকার জন্য তার ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের খড়গ। সুখের আশায় ঘর বাঁধলেও নির্যাতনই হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী।

রাধার বড় ভাই সুভাষ চন্দ্র রায় ও ভাবি মানতা রাণী অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের সময় আড়াই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকার জন্য রাধাকে প্রায়ই মারধর করা হতো। দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখা হতো তাকে। বাবার কষ্ট হবে ভেবে শান্ত স্বভাবের মেয়েটি কাউকে কিছু বলত না। 

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গত ১৩ এপ্রিল সোমবার সকালে স্বামীর বাড়ি থেকে রাধার ঝুলন্ত নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে দাবি করা হয়।

রাধার বাবা মহেন্দ্র নাথ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে জামাইকে নিয়ে রাধা এসেছিল বাকি ৫০ হাজার টাকার জন্য। আমি বলেছিলাম— বাবা, আমি তো নিঃস্ব। একটু সময় দাও, দুই-তিন মাস পর ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু সে কথা শুনল না। টাকার জন্য আমার মেয়েটাকে মেরেই ফেলল। আজ আমার জমিও নেই, মেয়েটাও নেই। 

রাধার পরিবারের অভিযোগ, ময়নাতদন্তের পর কাউকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে লাশ সৎকার করে ফেলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। তাদের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। শেষবারের মতো মেয়ের মুখটুকুও দেখতে দেওয়া হয়নি তাদের।

এলাকাবাসী ও প্রতিবেশীরা জানান, ছোটবেলায় মা হারানো রাধা ছিল অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সে আত্মহত্যা করতে পারে— এটি গ্রামবাসী বিশ্বাস করতে পারছে না। তাদের দাবি, পিটিয়ে হত্যার পর আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।

এদিকে মেয়ে হারানোর শোক নিয়ে পীরগঞ্জ থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ প্রথমে মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন মহেন্দ্র নাথ। তিনি প্রশ্ন করেন, মেয়ে হত্যার বিচার কার কাছে চাইব? পুলিশ কেন মামলা নিচ্ছে না? 

অভিযোগ অস্বীকার করে রাধার স্বামী মিঠুন বলেন, মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি হতো, কিন্তু বড় কোনো সমস্যা ছিল না। সে কেন এমন পথ বেছে নিল বুঝতে পারছি না। 

পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আব্দুল হাকিম জানান, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। রাধার পরিবার মামলা করতে চাইলে পুলিশ অবশ্যই মামলা নেবে। মামলা গ্রহণে কোনো বাধা নেই।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow