কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরে অকাল বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া বোরো ধান কাটতে গিয়ে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন এক দম্পতি।
রিতা রানী দাস (৩০) উপজেলার কলমা ইউনিয়নের হালালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী ভূষণ চন্দ্র দাস শ্রমিক সংকট ও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে একাই পানিতে নেমে ধান কাটছিলেন। স্বামীর কষ্ট দেখে তিনিও বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটায় সহযোগিতা করছেন।
বুকসমান পানিতে নেমে স্বামীর সঙ্গে ধান কাটতে কাটতেই তিনি বলেন, গঙ্গা মা সব বাসাইয়্যা নিছে। আমাগো আর কিছুই নাই। এইবার পোলা-মাইয়াডারে লইয়া কেমনে বাঁচুম, ভগবানই জানে। ধানডা যদি ঘরে তুলতে না পারি, এই সংসারডা কেমনে চলব, সেই চিন্তায় বুকডা ফাইট্টা যায়।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) উপজেলার বাইলাকান্দি হাওরে গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য, পানির নিচে ডুবে থাকা ধান কেটে কোনোমতে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন কৃষক ভূষণ চন্দ্র দাস ও তার স্ত্রী রিতা রানী দাস।
ভূষণ চন্দ্র দাস জানান, দুই একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন এই দম্পতি। পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। এই ফসল ঘিরেই ছিল তাদের পুরো বছরের স্বপ্ন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এক রাতের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন ভেসে গেছে।
ভূষণ চন্দ্র দাস জানান, নিজের এলাকা হবিগঞ্জের বুল্লা ইউনিয়নের হেলারকান্দি গ্রাম থেকে সুদে টাকা এনে শ্বশুরবাড়ির জমিতে ধান চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু এখন শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার সামর্থ্যও নেই।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক পাই না, আর পেলেও যে মজুরি চায় তা দেওয়ার অবস্থা নাই। তাই নিজেরাই পানিতে নেমে ধান কাটতেছি। আমার কষ্ট দেইখা আমার বউও বুক পানিতে আইয়া ধান কাটতাছে।
জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন একই চিত্র। বৈশাখে ঘরে ধান তোলার আনন্দ নেই কৃষকের ঘরে। ভেজা ধানে গজিয়েছে অঙ্কুর, বাতাসে ছড়াচ্ছে পচা ধানের গন্ধ। এখনও বুকসমান পানিতে নেমে ভেজা ধান কাটার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অষ্টগ্রামের কলমা ইউনিয়নের গাঙ্গিনা, করানি, উগলি, মইচচুরা, জলঢোপ ও টোকেরখলা হাওরের ধান পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কৃষকদের দাবি, দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে অনেক পরিবারই চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, আজ সোমবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত মোট ৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।আগামী কয়েক দিন আবহাওয়া বৈরী থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে আশার কথা বৃষ্টিপাত হলেও খুব কম হবে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ইটনা উপজেলার ধনু বৌলাই নদীতে ১ সে.মি, চামড়াঘাটের মগড়া নদীতে ২ সে.মি, অষ্টগ্রামের কালনী নদীতে ৮ সে. মি, ভৈরবের মেঘনা নদীতে ২ সে. মি. হ্রাস পেয়েছে। (পাউবো)
কৃষি বিভাগের বরাতে জানা যায়, এ পর্যন্ত প্রায় ৭১ শতাংশ ও নন হাওরে ৪০ শতাংশ জমি কর্তন করা হয়েছে।এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বোরো মৌসুমে ৫৮০ টি হারভেস্টার মেশিন ধান কর্তন করছে। এছাড়াও ৭৫০৯ জন শ্রমিক ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও হবিগঞ্জ থেকে এসে ধান কর্তন করছে।
উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হাওড় এলাকার তিন উপজেলা—ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামেই আবাদ হয়েছে এক লাখ চার হাজার ৮০০হেক্টর জমি। এ বছর জেলায় প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।