ঢাকার সড়কের নতুন ‘যমদূত’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। জরুরি বিভাগের অদূরে মর্গের সামনে থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল। একটু এগিয়ে দেখা যায় ভেতরে পাশাপাশি দুটি শিশুর মরদেহ। একজনের পরনে গোলাপি ফ্রক। গায়ের রংও টুকটুকে। শুইয়ে রাখা হয়েছে স্ট্রেচারে। নাকে সাদা ব্যান্ডেজ। আধখোলা চোখ, যেন আধোঘুমে! মায়ের গোলাপি পরী! জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছেন মা। এমন ফুটফুটে সন্তানের শরীরে প্রাণ নেই এটা কি একজন মা মানতে পারেন! মেয়েকে হারিয়ে মা বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন আর আহাজারি করে বলছিলেন, ‘হায়রে ব্যাটারি রিকশাওয়ালা যমদূত, আমার আদরের মাইয়াডারে কাইড়া নিলি।’ আরও পড়ুন চাকার নিচে পিষ্ট ঢাকা মায়ের এ কান্নার প্রতিধ্বনি যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল গোটা হাসপাতাল। অদূরে জানালার গ্রিল ধরে নিষ্পলক চোখে মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়ের মরদেহের দিকে তাকিয়ে ছিলেন আরেক শিশুর বাবা। ফুটফুটে চেহারার জান্নাতি ঘাড় কাত করে যেন ঘুমাচ্ছিল। শিশুদের যে জান্নাতি ফুলের মতো বলা হয় ঠিক তেমন। কীভাবে সহ্য করবেন তার বাবা-মা! ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহত শিশু জান্নাতি ও সুমাইয়াগত ৬ মে (বুধবার) মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর দুই প্রান্তে ব্যাটারিচ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। জরুরি বিভাগের অদূরে মর্গের সামনে থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল। একটু এগিয়ে দেখা যায় ভেতরে পাশাপাশি দুটি শিশুর মরদেহ।
একজনের পরনে গোলাপি ফ্রক। গায়ের রংও টুকটুকে। শুইয়ে রাখা হয়েছে স্ট্রেচারে। নাকে সাদা ব্যান্ডেজ। আধখোলা চোখ, যেন আধোঘুমে! মায়ের গোলাপি পরী! জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছেন মা। এমন ফুটফুটে সন্তানের শরীরে প্রাণ নেই এটা কি একজন মা মানতে পারেন!
মেয়েকে হারিয়ে মা বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন আর আহাজারি করে বলছিলেন, ‘হায়রে ব্যাটারি রিকশাওয়ালা যমদূত, আমার আদরের মাইয়াডারে কাইড়া নিলি।’

চাকার নিচে পিষ্ট ঢাকা
মায়ের এ কান্নার প্রতিধ্বনি যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল গোটা হাসপাতাল। অদূরে জানালার গ্রিল ধরে নিষ্পলক চোখে মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়ের মরদেহের দিকে তাকিয়ে ছিলেন আরেক শিশুর বাবা। ফুটফুটে চেহারার জান্নাতি ঘাড় কাত করে যেন ঘুমাচ্ছিল। শিশুদের যে জান্নাতি ফুলের মতো বলা হয় ঠিক তেমন। কীভাবে সহ্য করবেন তার বাবা-মা!
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহত শিশু জান্নাতি ও সুমাইয়া
গত ৬ মে (বুধবার) মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর দুই প্রান্তে ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় দুই শিশু।
কদমতলীতে আট বছরের সুমাইয়া নুর তাকওয়া নানির সঙ্গে হাঁটার সময় একই ধরনের দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। কয়েক ঘণ্টা চিকিৎসার পর তাকেও মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
মামলা করতে হলে মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে হতো। আমরা চাইনি শিশুটির শরীর কাটাছেঁড়া হোক। আর চালকও ছিল গরিব ও বয়স্ক। তাই নিয়তিকে মেনে নিয়েছি।-ভুক্তভোগীর স্বজন
একই দিন কামরাঙ্গীরচরের পাঁচ বছর বয়সী জান্নাতি বাড়ির পাশে খেলছিল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা তাকে ধাক্কা দেয়। স্থানীয়রা দ্রুত হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গত ২৩ মে জান্নাতির ফুফাতো ভাই আব্দুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, রিকশার কোনো নম্বর প্লেট না থাকায় ঘাতক চালককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে মামলাও করা যায়নি।
একই দিন নিহত সুমাইয়ার মামি তানজিলা জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর চালককে আটক করা হয়েছিল। তবে পরিবার মামলা করেনি।’
কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা করতে হলে মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে হতো। আমরা চাইনি শিশুটির শরীর কাটাছেঁড়া হোক। আর চালকও ছিল গরিব ও বয়স্ক। তাই নিয়তিকে মেনে নিয়েছি।’
শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা ও অভ্যন্তরীণ আঘাত প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়। সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত শিশু ও পথচারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।-ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোস্তাক আহমেদ
শুধু শিশু নয়, এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় মারা যান মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আফসানা করিম রাচি। দেশের বিভিন্ন জেলায়ও ঘটছে দুর্ঘটনা। গত বছরের নভেম্বরের শুরুতে নোয়াখালীতে ট্রাকের সঙ্গে একটি অটোরিকশার সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হন। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে গত বছরের ২২ জুলাই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চাপায় অসিম (১২) ও ইয়াসিন (৬) নামে দুই শিশু নিহত হয়। তারা দুজনই রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছিল।
জান্নাতি, সুমাইয়া কিংবা রাচির এ মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ঢাকার সড়কে তৈরি হওয়া এক নীরব ট্রমা। ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার এত বেড়েছে যে চাইলেও এখন প্যাডেলচালিত রিকশা পাওয়া যায় না। অনেকে বাধ্য হয়ে ওঠেন রিকশায়। সেই রিকশা প্রতিনিয়ত অন্যকে ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনায় ফেলছে নতুবা নিজে হচ্ছে দুর্ঘটনার শিকার। যাতে প্রাণ যাচ্ছে সব বয়সী মানুষের।
নগরজীবনে নতুন আতঙ্ক
চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ঢাকা শহরের সব মানুষের আতঙ্ক। কিন্তু এসবের পাশাপাশি নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। নগরজীবনে চলাচলের রিকশা প্রয়োজনীয় একটি বাহন। প্যাডেলচালিত রিকশা নিয়ে মানুষ আতঙ্কে থাকতো না। মূল সড়কে উঠলেও তারা এক পাশ দিয়ে ধীরে চলাচল করতো। ফলে দুর্ঘটনার খবর খুব বেশি শোনা যেত না।
কিন্তু যখন থেকে বিভিন্ন ডিজাইনে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার শুরু হয়েছে তখন থেকেই বেড়েছে দুর্ঘটনা। প্রতিনিয়ত মিলছে আহত-নিহত হওয়ার খবর। মূল সড়কে গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা এসব যান এখন আতঙ্ক। যদিও বাধ্য হয়ে মানুষ চড়ছে ঢাকার গণপরিবহনের দৈন্যদশার জন্য।
ব্যাটারি রিকশা দেখলেই ভয় লাগে। তুফানের বেগে চালায়। রাস্তার গর্ত দেখে চলে না, স্পিড ব্রেকারেও গতি কমায় না। তিন মাস আগে এই রিকশায় চড়ে পড়ে গিয়ে এখনো কোমর ব্যথায় ভুগছি।-৭০ বছর বয়সী হেলালুজ্জামান কবির
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বীর উত্তম হাবিবুর রহমান ৩ নম্বর গেটের অদূরে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৭০ বছর বয়সী হেলালুজ্জামান কবির। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে তিনি প্যাডেলচালিত রিকশার অপেক্ষা করছিলেন। একের পর এক ব্যাটারিচালিত রিকশা সামনে এলেও তিনি হাত তুলে না-সূচক ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন।
আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ব্যাটারি রিকশা দেখলেই ভয় লাগে। তুফানের বেগে চালায়। রাস্তার গর্ত দেখে চলে না, স্পিড ব্রেকারেও গতি কমায় না। তিন মাস আগে এই রিকশায় চড়ে পড়ে গিয়ে এখনো কোমর ব্যথায় ভুগছি।’
ছোট বাচ্চা নিয়ে এভাবে প্রতিনিয়ত চলছে মানুষ, ঘটছে দুর্ঘটনা/জাগো নিউজ
মিরপুর-১০ এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিক ফারহানা আক্তারের অভিজ্ঞতাও ভালো নয়। তিনি বলেন, ‘মার্চ মাসে কারখানা থেকে ফেরার পথে মোড়ে হঠাৎ রিকশা ঘুরে নিয়ন্ত্রণ হারায়। আমি ছিটকে পড়েছিলাম। হাত ও পায়ের কয়েক জায়গায় চামড়া ছিলে যায়। একটুর জন্য বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছি।’
আজিমপুরের বাসিন্দা মুন্নি আক্তার বলেন, ‘ভিকারুননিসা নূন স্কুলে মেয়েকে নিয়ে হাঁটা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা ডানে-বামে না তাকিয়ে জোরে রিকশা চালায়। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।’
গলির ভেতর দিয়ে খুব দ্রুত চালায়, প্রতিদিনই আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করেন বলে জানান পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন।
গত ১২ মে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে প্রাণ হারান পোশাকশ্রমিক কামিনী আক্তার (২৪)। কারখানা শেষে বাসায় ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারানো যানটি তাকে ছিটকে ফেলে দেয়।
শিশুর মৃত্যু, বয়সীদের আতঙ্ক এবং অভিভাবকের উদ্বেগ- সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন নগরবাসীর একটি বড় অংশের কাছে মূর্তমান আতঙ্ক।
বাড়ছে দুর্ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, অটোভ্যান, লেগুনা, মিশুকসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৬ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি নছিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু, মাহিন্দ্রা ও টমটমের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ৪৮৯ জন।
এছাড়া ২০২৫ সালে শুধু ঢাকা শহরেই ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ২১৯ জন নিহত এবং ৫১১ জন আহত হন।
ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঝুঁকি বেশি
‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকায় চলাচল করা বেশিরভাগ রিকশার নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ আর প্যাডেল রিকশার ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশের কোনো নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের ৭৫ শতাংশেরই আগে রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। এই পেশায় যারা আসছেন, তারা তুলনামূলক তরুণ।
রাস্তার মাঝ বরাবর দাপটের সঙ্গে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা/জাগো নিউজ
গবেষণায় দেখা যায়, ৮২ শতাংশ যাত্রী যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যাত্রীদের কাছে প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুততর, কম ভাড়া ও সহজলভ্য মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন ৩০ শতাংশ যাত্রী। প্যাডেল রিকশায় এ ঝুঁকির কথা বলেন ১৮ শতাংশ যাত্রী।
বিআরটিএ ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ব্যাটারিচালিত রিকশাসংশ্লিষ্ট ৪১৫টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ইজিবাইক সংশ্লিষ্টতা ছিল ২১৭টি, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ। কোনো কোনো মাসে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত এই থ্রি-হুইলার সংশ্লিষ্ট ছিল।
প্রতিদিনই ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনায় আহত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এটি এখন শুধু ট্রাফিক সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক রোগী স্থায়ী অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকেন।-নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কেনান
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরেএসএফ) বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে— যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়ক।
ঢাকার দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই ছিল পথচারী (৪৭.০৩%), যার পরেই রয়েছে মোটরসাইকেল আরোহী (৪৩.৩৭%)।
২০২৫ সালের মোট দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ২২ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৭ দশমিক ১৩ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ ফিডার বা গ্রামীণ রাস্তায় এবং ৪ দশমিক ২২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনার প্রধান বাহন মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার।
ঢাকা ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে ফিটনেসবিহীন থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা) মোট দুর্ঘটনার প্রায় ১১ দশমিক ৮২ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল।
হাসপাতালে বাড়ছে রিকশা দুর্ঘটনার রোগী
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (নিটোর) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৯৮৮ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১১৪ জনই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার। ২০২৪ সালে রিকশা ও ই-রিকশা দুর্ঘটনায় নিটোরে চিকিৎসা নেন ৪ হাজার ২৭৭ জন অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১১ জনের বেশি।
যাত্রী তোলায়ও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই/জাগো নিউজ
নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কেনান জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিনই ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনায় আহত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এটি এখন শুধু ট্রাফিক সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক রোগী স্থায়ী অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকেন।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোস্তাক আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা ও অভ্যন্তরীণ আঘাত প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়। সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত শিশু ও পথচারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
দুর্ঘটনার কারণ আসলে কী
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সামছুল হক ও অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম এবং যান্ত্রিক কাঠামোর অসামঞ্জস্যতাকে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভিশন’ একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’।
তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ
যান্ত্রিক ও প্রকৌশলগত অসামঞ্জস্যতা
বাহনগুলো মূলত সাধারণ প্যাডেল রিকশার কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা উচ্চতর গতির জন্য ডিজাইন করা হয়নি।
ব্রেকিং অকার্যকারিতা
ইজিবাইকের ওজন ও গতিবেগের বিপরীতে এদের মেকানিক্যাল ব্রেক সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। গবেষণায় দেখা যায়, জরুরি অবস্থায় ব্রেক চাপলে অনেক ক্ষেত্রে ব্রেক ড্রাম জ্যাম হয়ে যায় অথবা চাকা লক হয়ে গাড়িটি উল্টে যায়।
সেন্টার অফ গ্রাভিটি
এই বাহনগুলোর উচ্চতা ও সরু চাকা রাস্তার বাঁক ঘোরার সময় উচ্চগতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।
মানহীন ব্যাটারি ও চার্জিং সিস্টেম
নিম্নমানের ব্যাটারি ব্যবহার ও ত্রুটিপূর্ণ ওয়ারিংয়ের কারণে প্রায়ই যান্ত্রিক গোলযোগ ঘটে, যা চলন্ত অবস্থায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণহীন করে দেয়।
অপ্রশিক্ষিত চালক
প্রায় ৯০ শতাংশ চালকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেই। তারা ট্রাফিক সাইন, লেন ডিসিপ্লিন এবং রাইট-অফ-ওয়ে সম্পর্কে অজ্ঞ।
ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং
বড় যানবাহনের পাশ দিয়ে অত্যন্ত সরু জায়গা দিয়ে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা (যাকে প্রতিবেদনে ‘Aggressive Filtering’ বলা হয়েছে) ভয়াবহ সংঘর্ষের কারণ।
অবসাদ ও ক্লান্তি
অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানোর ফলে চালকের রিফ্লেক্স কমে যায়, যা বিশেষ করে রাতের বেলা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মিশ্র ট্রাফিকের সংঘর্ষ
মূল সড়কগুলোতে যখন একটি ৫ কিমি/ঘণ্টা গতির রিকশা এবং ৬০ কিমি/ঘণ্টা গতির বাস একই লেনে চলে, তখন গতির ব্যাপক তারতম্যের কারণে দুর্ঘটনা অনিবার্য হয়ে পড়ে।
রাস্তার উপরিভাগের ত্রুটি
ব্যাটারিচালিত রিকশার ছোট চাকা রাস্তার ছোট গর্ত বা খানাখন্দে আটকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ হারায়, যা বড় যানবাহনের তুলনায় তাদের জন্য বেশি বিপজ্জনক।
অনিবন্ধিত গ্যারেজ
ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরির হাজার হাজার অননুমোদিত গ্যারেজ রয়েছে, যারা কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্যান্ডার্ড ছাড়াই রিকশা বানাচ্ছে।
অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য
যান্ত্রিক সক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার ফলে গাড়ির সাসপেনশন ভেঙে যাওয়া বা টায়ার ফেটে যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
আইন প্রয়োগে বিভ্রান্তি
রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ নাকি বৈধ- এ নিয়ে খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেই রয়েছে সংশয়। গত ২৩ মে শাহবাগ মোড়ে কর্তব্যরত সরোয়ার আলম নামে এক পুলিশ সার্জেন্টের কাছে অবৈধ এ যানবাহনটি কীভাবে চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো বৈধভাবেই চলছে।’ তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘নিষিদ্ধ হলে এগুলো চলছে কীভাবে?’
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এসব যানের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৮টি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫১৮টি যান ডাম্পিং, ব্যাটারি এবং মিটার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ রয়েছে। তবু রাস্তায় রিকশার সংখ্যা কমেনি।-ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি তাদের কাজের একটি বড় অংশজুড়ে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছে। এ রিকশাগুলো রাস্তার নিয়ম না মেনে প্রায়ই উল্টাপাল্টা বা ভুল পথে চলাচল করে, যা ট্রাফিক পুলিশের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।’
প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে রিকশার ডিজাইনে/জাগো নিউজ
পরে এ বিষয়ে ডিএমপির নবনিযুক্ত কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এসব যানের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৮টি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫১৮টি যান ডাম্পিং, ব্যাটারি এবং মিটার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ রয়েছে। তবু রাস্তায় রিকশার সংখ্যা কমেনি।’
‘স্পিড মিসম্যাচ’ তৈরি করছে ঝুঁকি
সিপিডি ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা যায়, এসব যানের বেশিরভাগ চালকের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। বড় অংশের বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। উল্টো পথে চলাচল, অতিরিক্ত গতি ও অপ্রশিক্ষিত চালক— এ তিনটি কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
প্রধান সড়কের দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার গতির সামঞ্জস্য নেই। এই স্পিড মিসম্যাচই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। জোনভিত্তিক চলাচল বা ফিডার রোড ব্যবস্থা ছাড়া এই চাপ কমানো সম্ভব নয়।-সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মো. খালিদ মাহমুদ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মো. খালিদ মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রধান সড়কের দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার গতির সামঞ্জস্য নেই। এই স্পিড মিসম্যাচই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। জোনভিত্তিক চলাচল বা ফিডার রোড ব্যবস্থা ছাড়া এই চাপ কমানো সম্ভব নয়।’
বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এহসান বলেন, ‘সাধারণ রিকশা মূলত মানুষের কায়িক শ্রমে চালানোর জন্য নকশা করা। এতে মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করার ফলে যাত্রী ও সড়ক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বাড়তি গতি ও যান্ত্রিক ভার বহনের মতো কাঠামো এসব রিকশার নেই।’
কোনো সুনির্দিষ্ট রুলস বা রেগুলেশন ছাড়াই যে যার মতো মোটর ও ব্যাটারি লাগিয়ে রিকশা রাস্তায় নামাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে রিকশার ডিজাইনে/জাগো নিউজ
সার্বিক বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, ‘এসব যানের বড় অংশের বৈধ নম্বরপ্লেট নেই। দুর্ঘটনার পর অনেক যান শনাক্ত করা যায় না, কারণ কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ নেই।’
অর্থনীতি বনাম নিরাপত্তা
অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন নগর অর্থনীতির অংশ। এটি কর্মসংস্থান ও দ্রুত যাতায়াতের চাহিদা পূরণ করছে।’ তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘উচ্ছেদ নয়, বরং নির্দিষ্ট রুট, লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা জরুরি।’
এটি শুধু পরিবহন সমস্যা নয়, নগর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের সংকট। অনিয়ন্ত্রিত যান, দুর্বল গণপরিবহন ও নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা মিলেই এ সংকট তৈরি করেছে।-নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব
বিশ্লেষকদের মতে, কম পুঁজি ও দ্রুত আয়ের সুযোগ থাকায় এ খাতের বিস্তার দ্রুত হয়েছে। কিন্তু সেই বিস্তার এখন শহরের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘এটি শুধু পরিবহন সমস্যা নয়, নগর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের সংকট। অনিয়ন্ত্রিত যান, দুর্বল গণপরিবহন ও নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা মিলেই এ সংকট তৈরি করেছে।’

অটোরিকশার ধাক্কায় প্রাণ গেলো দুই শিশুর
সরকারের প্রস্তাবিত ‘ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা–২০২৫’-এ লাইসেন্স, সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার, ওয়ার্ডভিত্তিক চলাচল ও নিরাপত্তামান নির্ধারণের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন এখনো সীমিত।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ডিজিটাল নিবন্ধন ও সমন্বিত মনিটরিং ছাড়া এ সংকট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
জান্নাতি, সুমাইয়া, রাচির মতো অসংখ্য মৃত্যু এখন নগর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রযুক্তির বিস্তার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়েই গেছে। এই অনিয়ন্ত্রিত গতি আর কত প্রাণ কেড়ে নিলে নগর প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে?
তৃতীয় পর্বে পড়ুন: সরকার বদলায়, বহাল তবিয়তে থাকে রিকশা সিন্ডিকেট
এমইউ/এএসএ/এমএফএ
What's Your Reaction?




