ঢাকায় একের পর এক বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

ঢাকায় একের পর এক বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। ৯ দিনের ব্যবধানে দুটি বোমা ও বোমাসদৃশ দুটি বস্তু উদ্ধারের পর জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সর্বশেষ শনিবার (১ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে বোমাসদৃশ বস্তু ঘিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নিশ্চিত করা হয়, উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলো কোনো বিস্ফোরক নয়। এর আগে গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বোমা উদ্ধার করে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। এর ছয়দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে ঢাকার আশুলিয়ায় চায়ের দোকানে রাখা ব্যাগের ভেতর রাখা প্রেসার কুকারে তৈরি করা আইইডি বোমা উদ্ধার করা হয়।  তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেটি টাইমারযুক্

ঢাকায় একের পর এক বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

ঢাকায় একের পর এক বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। ৯ দিনের ব্যবধানে দুটি বোমা ও বোমাসদৃশ দুটি বস্তু উদ্ধারের পর জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

সর্বশেষ শনিবার (১ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে বোমাসদৃশ বস্তু ঘিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নিশ্চিত করা হয়, উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলো কোনো বিস্ফোরক নয়।

এর আগে গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বোমা উদ্ধার করে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। এর ছয়দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে ঢাকার আশুলিয়ায় চায়ের দোকানে রাখা ব্যাগের ভেতর রাখা প্রেসার কুকারে তৈরি করা আইইডি বোমা উদ্ধার করা হয়। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেটি টাইমারযুক্ত ছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। দুটি ঘটনাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

কী বলছে সাধারণ মানুষ

সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথী সিফাতুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের খবর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করাটা স্বাভাবিক। তাই পুলিশের আরও সতর্ক অবস্থানে থাকা প্রয়োজন।

তবে তিনি গুজব ছড়ানোর প্রবণতা থেকেও সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো পরিত্যক্ত ব্যাগ বা বস্তু দেখেই সেটিকে বোমা বলে প্রচার করা উচিত নয়। আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়ে সত্যতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

তার মতে, যেকোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা রয়েছে। তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী।

ঢাকায় ‘বোমা’ আতঙ্ক, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?মতিঝিলে গত ২৪ জুলাই রাতে বোমা উদ্ধারের পর তা নিষ্ক্রিয় করেন ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা, ছবি: জাগো নিউজ

ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অবন্তি নামের এক পথচারী জাগো নিউজকে বলেন, বারবার এমন ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একবার বা দুবার কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ভবিষ্যতেও হবে না-এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ায়, তাহলে মানুষ আরও নিরাপদ অনুভব করবে।

‘এটি পরিকল্পিত বা স্পন্সরড অপরাধও হতে পারে’

এসব ঘটনার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করণীয়- এসব বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। 

ঢাকায় ‘বোমা’ আতঙ্ক, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক, ছবি: জাগো নিউজ

ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজধানীতে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বোমা বিস্ফোরণ কিংবা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ এবং অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা-সব মিলিয়ে এক বা একাধিক কারণ থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।

তিনি বলেন, চলমান গ্যাস সংকট, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কর্মসংস্থান সংকট এবং বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটানো হতে পারে।

ড. তৌহিদুল হকের ভাষায়, ‘এটি একটি ম্যানমেড বা স্পন্সরড ক্রাইম হতে পারে। অর্থের বিনিময়ে কিংবা ভবিষ্যতে সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কাউকে ব্যবহার করে এমন ঘটনা ঘটানো হতে পারে।’

তার মতে, এসব ঘটনার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে চাপের মুখে ফেলা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করা।

 

‘সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে সাধারণ মানুষ’

ড. তৌহিদুল হক বলেন, বোমা থাকুক বা না থাকুক, বোমাসদৃশ কোনো বস্তু উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে মেট্রোরেল, গণপরিবহন কিংবা জনসমাগমস্থলে চলাচলের সময় মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।

তার মতে, এই আতঙ্ক দূর করতে দ্রুত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স নেটওয়ার্ক আরও সক্রিয় করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, কোনো ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়া গেলে সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত। কারণ এতে জনমনে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

ঢাকায় ‘বোমা’ আতঙ্ক, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক, ছবি: জাগো নিউজ

যা বললেন সিটিটিসি প্রধান

শনিবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন ও ফার্মগেট এলাকায় বোমাসদৃশ বস্তু থাকার খবর পাওয়ার পরপরই সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

তিনি জানান, অত্যাধুনিক সরঞ্জামের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নিশ্চিত হওয়া গেছে, উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলো কোনো বিস্ফোরক ছিল না। মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনে পাওয়া বস্তুগুলো ছিল পান, সুপারি, জর্দাসহ পরিত্যক্ত সামগ্রী। আর ফার্মগেটে উদ্ধার হওয়া বস্তার ভেতরে ছিল ময়লা-আবর্জনা।মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমা উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা সদৃশ বস্তুর কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

কারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে বা কোনো অপরাধী চক্র জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে শামসুল হক বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আমরা সব দিক খতিয়ে দেখছি।

এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিবাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে সিটিটিসি প্রধান বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়া বা ক্যামেরা বন্ধ থাকার প্রশ্নে তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে।

রাজধানীজুড়ে বোমা আতঙ্কের বিষয়ে শামসুল হক বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সন্দেহজনক কোনো বস্তু পাওয়া গেলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। তবে, গুজব বা অযথা আতঙ্ক ছড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। তিনি দেশবাসীকে গুজব বা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে সেটি স্পর্শ না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে আহ্বান জানান।

এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow