তামাকের ক্ষতি জানে না এমন মানুষ নেহায়েত কম। কিন্তু, অনেকেই জানেন না যে, তামাক সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর বড় কারণ। বিশ্বের এক নিরব মহামারীর নাম ‘তামাক’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৮৭ লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, যার বড় অংশ শিশু ও নারী।
বাংলাদেশেও তামাক একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা বহুমাত্রিক সংকট আরো প্রকট করে তুলছে। দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তামাকজনিত রোগে বিশেষ করে- ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুবরণ করেন। টোব্যাকো এটলাস-২০২৫ এর তথ্য মতে, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৯৯ হাজারের অধিক মানুষ প্রাণ হারায়! তামাকের সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা খরচ ৮৭ হাজার কোটি টাকা! এই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং আর্থিক ও অন্যান্য সকল ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিরোধ সম্ভব হবে, যদি প্রকৃতপক্ষে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সর্বগ্রাসী তামাকের ভয়াবহতা রুখে দিতে ১৯৮৭ সাল থেকে ৩১মে দিনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর উদ্যোগে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ৯০’র দশক থেকে বাংলাদেশেও তামাকমুক্ত দিবস পালিত হচ্ছে। জনসাধারণের মাঝে তামাক বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি এবং তামাক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনটি জোরদারকরণে দিবসটির ভূমিকা অগ্রগণ্য। এক সময় আমরা ব্যক্তি উদ্যোগে ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তৎপরতায় দিবসটি পালন করা হতো। সরকার এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতায় ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল’ গঠন করে ২০০৭ সালে।
সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসমূহের সমন্বয়ে এবছরও বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে - ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তামাক ও নিকোটিন পণ্য উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের লক্ষ্য করে নতুন নতুন কৌশলে নেশায় আসক্তির অপকৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করছে। এমনকি তামাক কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় আইন, বিধিমালা, নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না! তাদের প্রধান টার্গেট আমাদের ভষ্যিত প্রজন্ম, যাদের নেশায় আসক্ত করে বছরের পর বছর মুনাফা অর্জন করতে চায়। উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশ যখন ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুফল পেতে চলেছে, সেই সময়ে তামাক কোম্পানিগুলোও তরুণদের নেশার জালে আটকাতে ফাঁদ পেতেছে।
কিশোর-তরুণ : তামাক কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য
তামাক কোম্পানিগুলো জানে, অধিকাংশ ব্যবহারকারী কৈশোরেই নিকোটিন পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থ; অল্প বয়সে এটি মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে অন্তত ১ জন তামাক বা নিকোটিনজাত পণ্য ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধূমপান ও অন্যান্য তামাক ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বিদ্যমান। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও ক্ষেত্রেও বড় হুমকি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তামাক পণ্য সেবনের উর্ধ্বগতি বাংলাদেশকে কোনভাবেই ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুবিধা তো দেবেই না, বরং আমাদের একটি অসুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা রাষ্ট্রের বোঝা হতে পারে!
ই-সিগারেট বা ভেপ : নিরাপদ নয়, নেশায় আসক্তির নতুন ফাঁদ
তামাক কোম্পানিগুলোর অপপ্রচারে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে মনে করেন, ই-সিগারেট বা ভেপিং তুলনামূলক নিরাপদ। বাস্তবে এটি নিকোটিন আসক্তির আধুনিক রূপ। গ্রামাঞ্চলেও ই-সিগারেট বিপণন, ব্যবহার বাড়ছে। কারণ, ই-সিগারেট পণ্যগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর মধ্যে বিভিন্ন ফ্লেভার ব্যবহার করে থাকে, যা তরুণ ও উঠতি বয়সিদের আর্কষণের মূল কারণ। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে এগুলোকে তরুণদের কাছে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেগুলো বেচা-কেনা চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ই-সিগারেটসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্যসমূহ প্রচলিত তামাকের মতোই আসক্তি সৃষ্টিকারী। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আরও অধিক ক্ষতিকর। আরেকটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতিকর! ই-সিগারেট ব্যবহারে ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, স্ট্রোক এবং আচরণগত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্ষতিকর বিবেচনায় ভ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশ ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
অন্তবর্তী সরকার ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করে দেশে ই-সিগারেট ও ইমাজিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধ এবং বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্য প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিলো। কিন্তু, পরিতাপের বিষয় এ বছর সংশোধিত আইনে এ দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেওয়া হয়। ফলে তামাক কোম্পানিগুলো আরো আগ্রাসী হতে পারে। তরুণ প্রজন্মের সুরক্ষায় প্রয়োজনে নতুন আইন করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। মহামান্য আপিল বিভাগ সিভিল আপিল নং ২০৪-২০৫/২০০১ মামলায় ০১/০৩/২০১৬ তারিখের রায়ে দেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। রায়ে দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেওয়া এবং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। সুতরাং এটি মানতে হবে।
বিনোদন মাধ্যমে তামাকের গ্ল্যামারাইজেশন
চলচ্চিত্র, নাটক, ওয়েবসিরিজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধূমপানকে প্রায়ই ফ্যাশন, হিরোইজম, আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জনপ্রিয় অভিনেতা বা সোস্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদেও অনুকরণ করতে গিয়ে অনেক কিশোর-তরুণ ধূমপানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজে ধূমপান, মাদকের দৃশ্যায়ন আগুনে ঘি ঢালছে।
২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তিপ্রাপ্ত ৫টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়, যথাক্রমে ‘রাক্ষস’ ‘প্রিন্স’ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ‘দম’ ‘প্রেসারকুকার’। ‘রাক্ষস’ চলচ্চিত্রে ১৯২ বার ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সকল দৃশ্য ফোকাস করে প্রদর্শন করা হয়েছে। ধূমপানের দৃশ্যে মালবোরো সিগারেটের প্যাকেট প্রদর্শন করা হয়, যদিও আইনত তা নিষিদ্ধ। ‘প্রিন্স’ এ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধূমপান, হুক্কা/পাইপ, এলকোহল সেবন ফোকাস করে প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে ১৬৫ বার ধূমপানের দৃশ্য (ধূমপান ১২০, হুক্কা/পাইপ ৪৫) প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে নায়ক শাকিব খানের দ্বারা ৪৪ বার ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হয়। নারী চরিত্র (চলচ্চিত্রের নায়িকা) দ্বারা ৯ বার ধূমপান করার দৃশ্য ফলাও করে দেখানো হয়েছে। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে থানা/হাজতের ভিতর বিজ্ঞাসাবাদে নায়িকার টানা ১ মিনিট ধরে ধূমপান করতে দেখা যায়।
ধূমপানের দৃশ্যে সিগারেটের প্যাকেট প্রদর্শন করতে দেখা গেছে, যা আইনত: নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ! এবার ঈদেও মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র তালিকায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ অন্যতম। ২ ঘন্টা ৩৩ মিনিটের চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এ অন্যতম প্রধান চরিত্র মোশাররফ করিম ও শরীফুল রাজ এর দ্বারা অনবরত ট্রেনের কামরা এবং কমন স্পেসে ধূমপান, মদ্যপান ফোকাস করে দৃশ্যধারন ও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রচার করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে ৬৪বার ধূমপানের দৃশ্য পাওয়া গেছে। মালবোরো সিগারেট প্যাকেট প্রদর্শন একাধিকবার রয়েছে, যা তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং এগুলো আইনত নিষিদ্ধ। ‘দম’ ২ঘণ্টা ৮মিনিট দৈর্ঘ্যের এ চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্র দ্বারা ধূমপান, মদ্যপান প্রচার করা হয়নি। এ চলচ্চিত্রে মাত্র ৪বার ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়েছে এবং মদ্যপান দেখানো হয়নি। ধূমপান তুলনামূলক কম দেখানো হলেও পার্শ্বচরিত্র ‘চঞ্চল চৌধুরীর দ্বারা ধূমপান ও জর্দার ব্রান্ড প্রমোট করা হয়েছে। হাকিম জর্দার নাম সংলাপে এবং হাতে জর্দার প্যাকেট প্রদর্শন করা হয়। ফোকাস করে ক্যামেল ব্রান্ডের সিগারেট প্যাকেট প্রদর্শন করেন চঞ্চল চৌধুরী, যা তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং এগুলো আইনত নিষিদ্ধ।
‘প্রেসারকুকার’ চলচ্চিত্রে ৬০বার ধূমপানের দৃশ্য রয়েছে। এর মধ্যে ফোকাস দৃশ্য রয়েছে এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে উল্লেখিত ‘পাবলিক প্লেস’ রয়েছে, যা সর্ম্পর্ণ ধূমপানমুক্ত স্থান। ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় পুলিশ চরিত্র দ্বারা ধূমপানের দৃশ্যের সংযোজন। থানায় টানা ১ মিনিট ধরে ফোকাস করে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়েছে। ধূমপানের দৃশ্যে সিগারেটের প্যাকেট প্রদর্শন করা হয়, যদিও পর্যবেক্ষণে ব্রান্ড নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মহিলা চরিত্র দ্বারা সিগারেট এবং ই-সিগারেট সেবন প্রদর্শন করা হয়েছে, ফোকাস দৃশ্য ছিলো। মেয়েদের হাতে সিগারেট ধরিয়ে মেয়েদের ধূমপান যেভাবে ফলাও দেখানো হয়েছে সেটা আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও আইন পরিপন্থী! এই চলচ্চিত্রগুলোতে মানা হয়নি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন এবং জাতীয় সম্প্রচার নীতিসহ অন্যান্য বিধিমালা। বিনোদন মাধ্যমে ধূমপান ও মাদককে এভাবে উপস্থাপন কিশোর-তরুণদের বিপদগ্রস্ত করছে, যা জাতিগতভাবে আমাদের জন্য হুমকি স্বরুপ।
পরোক্ষ ধূমপান
শিশু, নারী অধূমপায়ীরা ঝুঁকিতে: বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় ৭,০০০-এর বেশি রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যার অন্তত ৭০টি ক্যান্সার সৃষ্টি করতে সক্ষম। এটি শুধু ফুসফুস নয়; মুখগহ্বর, গলা, খাদ্যনালী, অগ্ন্যাশয়, মূত্রথলি এবং অন্যান্য অঙ্গেও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপায়ী একা ক্ষতিগ্রস্ত হন না; পরিবারের সদস্যরাও ক্ষতির শিকার হন। বাংলাদেশে ১৫ বছরের কমবয়সী শিশুর মধ্যে ৪ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি শিশু তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে ৬১ হাজারের অধিক শিশু বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। পরোক্ষ ধূমপানে বাংলাদেশে প্রায় ২৬ হাজার অধূমপায়ী মারা যায়, এদের অধিকাংশ শিশু ও নারী! শিশুদের নিউমোনিয়া, হাঁপানি, কানের সংক্রমণ ও আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং জটিলতার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। অতএব, ধূমপান ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় এটি একটি পারিবারিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ।
তামাক ও দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্র
তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অসংখ্য পরিবারগুলোকে দরিদ্রতার শিকার হতে হচ্ছে। এছাড়াও কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর কারণে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। নি¤œআয়ের পরিবারে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ তামাকে ব্যয় হওয়ায় দারিদ্র্যের চক্র আরও গভীর হয়। ফলে সেই সকল পরিবারে অপুষ্টি দেখা দেয়। অথচ, একজন ধূমপায়ী তার প্রতিদিনের সিগারেটের খরচেই নিজের বা পরিবারের জন্য কিনতে পারে পুষ্টিকর খাবার। অনেকে বলেন, তামাক চাষ লাভজনক, কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো- তামাক চাষ কোম্পানির জন্য লাভজনক, কৃষকের জন্য নয়। সম্প্রতি, মেহেরপুরে তামাক চাষীদের হাহাকার ও দুধ দিয়ে গোসল করে তামাক চাষ ছাড়ার ঘটনা আমাদের সেই বার্তাই দেয়। সুতরাং, কৃষিজমিতে তামাক বাদ দিয়ে খাদ্য শস্য চাষাবাদ করুন। এতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
মুখগহ্বর থেকে সমগ্র দেহে তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি: বাংলাদেশে পান, সুপারি, জর্দা, গুল, সাদাপাতা, খৈনী ইত্যাদি তামাকজাত দ্রব্য মুখে চিবিয়ে খাওয়ার যে অভ্যাস রয়েছে, তা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন চিকিৎসক ও ডেন্টাল সার্জারি প্রফেসর হিসেবে আমি প্রতিদিন তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব প্রত্যক্ষ করি। ধূমপান ও তামাক ব্যবহার মুখের স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। গ্লোবাল এ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে-২০১৭ অনুসারে, বাংলাদেশে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য সেবন করেন। মুখের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ধূমপান/তামাক সেবনকে অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যেমন: পিরিওডোন্টাইটিস (দাঁতের সহায়ক হাঁড় ও নরম টিস্যুর রোগ) এবং দাঁতের ক্ষয় বা দাঁত পড়ে যাওয়া। ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে যা মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সাথে মুখের বিভিন্ন ধরনের ক্ষত বাড়িয়ে তুলে তার মধ্যে ‘মলিগন্যান্ট’ অন্যতম। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহার ও এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়-ক্ষতি বেশি। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য যেমন: জর্দ্দা, গুল, সাদাপাতা সবই বর্জন করুন।
আমাদের করণীয়:
তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি-
আইন প্রয়োগের মাধমে তামাক পণ্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা কঠোরভাবে বন্ধ করা;
নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজ, সোস্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্টে ধূমপান, তামাক পণ্য সেবনের দৃশ্য প্রদর্শন বন্ধ করা;
প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও ইমার্জিং তামাক পণ্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ অথবা নিষিদ্ধ করা;
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে ও আশপাশে তামাকপণ্য বিক্রয় ও প্রচারণা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা;
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা;
তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করা।
বাংলাদেশ তরুণ ও যুবশক্তির দেশ। এই তরুণরাই আমাদের সামগ্রীক উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের মূল চালিকাশক্তি। এই বিপুল জনগোষ্ঠিকে নিকোটিন ও তামাকের আসক্তি থেকে রক্ষা করা মানে, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা। আসুন তামাক কোম্পানির ছলনার মুখোশ খুলে দিই। তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করি এবং প্রিয়জনদের ও আপনার আশে-পাশে সকলের সুরক্ষা নিশ্চিত করি। তামাকমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ি।
লেখক: অধ্যাপক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা (একুশে পদকপ্রাপ্ত শব্দসৈনিক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)
সদস্য, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়)