তিন প্রজন্ম ধরে এক ঘরে দুর্বিষহ বসবাস বিহারিদের

‘আবাসনে জমিসহ ঘর পাচ্ছেন গৃহহীনরা। রোহিঙ্গারা দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। করা হয়েছে তাদের সুন্দর থাকার ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। জীর্ণ একটি ঘরে ছেলে-বউ ও তাদের সন্তানদের নিয়ে গাদাগাদি করে বাস করছি। ভোটে জনপ্রতিনিধিরা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে কিছুই আর করেন না।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন নীলফামারীর সৈয়দপুরে আটকে পড়া অবাঙালি ক্যাম্পের (যারা এদেশে ‘বিহারি’ নামে পরিচিত) বাসিন্দা মেহেরুন নেসা (৭০)। আরও পড়ুন তহবিল সংকটের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ২০ লাখ ইউরো দিচ্ছে ফিনল্যান্ড মেহেরুন নেসার জন্ম ভারতের বিহার রাজ্যে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান। সেসময় বিহার থেকে অনেক মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তার পরিবারও বাংলাদেশে চলে আসে। সুখে শান্তিতে কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু ১৯৭১ সালে শোষণ ও বঞ্চনায় পিষ্ট বাঙালিরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেন। তখন মেহেরুন নেসার স্বামী সোলায়মান মাস্টার সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানে চলে যাবেন। তাই স্থাবর-অস্থাবর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে আশ্রয় নেন পাকিস্তানি শিবিরে। অনেকে গেলেও তাদের আর যাওয়া হয়নি। থেকে গেলেন আটকে পড়া পাকিস্তানি ক

তিন প্রজন্ম ধরে এক ঘরে দুর্বিষহ বসবাস বিহারিদের

‘আবাসনে জমিসহ ঘর পাচ্ছেন গৃহহীনরা। রোহিঙ্গারা দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। করা হয়েছে তাদের সুন্দর থাকার ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। জীর্ণ একটি ঘরে ছেলে-বউ ও তাদের সন্তানদের নিয়ে গাদাগাদি করে বাস করছি। ভোটে জনপ্রতিনিধিরা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে কিছুই আর করেন না।’

আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন নীলফামারীর সৈয়দপুরে আটকে পড়া অবাঙালি ক্যাম্পের (যারা এদেশে ‘বিহারি’ নামে পরিচিত) বাসিন্দা মেহেরুন নেসা (৭০)।

মেহেরুন নেসার জন্ম ভারতের বিহার রাজ্যে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান। সেসময় বিহার থেকে অনেক মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তার পরিবারও বাংলাদেশে চলে আসে। সুখে শান্তিতে কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু ১৯৭১ সালে শোষণ ও বঞ্চনায় পিষ্ট বাঙালিরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেন। তখন মেহেরুন নেসার স্বামী সোলায়মান মাস্টার সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানে চলে যাবেন। তাই স্থাবর-অস্থাবর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে আশ্রয় নেন পাকিস্তানি শিবিরে। অনেকে গেলেও তাদের আর যাওয়া হয়নি। থেকে গেলেন আটকে পড়া পাকিস্তানি ক্যাম্পে।

তিন প্রজন্ম ধরে এক ঘরে দুর্বিষহ বসবাস বিহারিদের

সৈয়দপুরে আটকে পড়া অবাঙালি ক্যাম্প রয়েছে ২২টি। এসব ক্যাম্পে ৪ হাজার ৫৩০টি পরিবারের ১৯ হাজার ৬৯৭ জন বিহারির বসবাস। মেহেরুন নেসার মতো অসংখ্য পরিবার জরাজীর্ণ ৮ ফুট বাই ৮ ফুট একটি ঘরে তিন প্রজন্ম নিয়ে গাদাগাদি করে বাস করছেন। বাব-মা ঘুমান খাটে, ছেলে-বউ মাটিতে আর বৃদ্ধরা ওই ঘরের বারান্দাতেই রাত যাপন করে জীবন পার করছেন। জীবনের তাগিদে কেউ নরসুন্দর, কসাই, রিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক, অটোমোবাইল মেকানিকের কাজ করছেন। অনেকে আবার অপরাধ কর্মকাণ্ডেও জড়িয়েছেন। মহিলারা জরি-কারচুপির আবার কেউ ঝিয়ের কাজ করেন। এদের শিশুদেরও তাড়াতাড়ি কাজে যোগ দিতে হয়। কারণ সন্তানদের শিক্ষিত করার মতো আর্থিক সক্ষমতা তাদের নেই।

‘আমরা ২০০৮ সালে ভোটাধিকার পেয়েছি। তাই বাংলাদেশ বিরোধী বলে আমাদেরকে যে তকমা দেওয়া হয় তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। উদ্বাস্তু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে চাই না। আমাদের মৌলিক অধিকার দিতে হবে। আমরা সত্যিকার বাংলাদেশি হয়ে সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে চাই।’

এদের মধ্যে মাত্র ৩ জন উচ্চশিক্ষিত, আর ৭ জন এসএসসি পাস করেছে। বেশিরভাগ শিশু ও গর্ভবতী অপুষ্টিতে ভুগছেন। পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে কোনো সচেতনতা নেই এদের মাঝে। অনেকে করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়ায় বিভিন্ন এনজিওর ঋণের চাপে দিশাহারা।

তিন প্রজন্ম ধরে এক ঘরে দুর্বিষহ বসবাস বিহারিদের

জানা যায়, ১৯৭২ সালে প্রায় ৫ লাখ বিহারি পাকিস্তানে প্রত্যাবাসনের জন্য নিজেদের নাম নিবন্ধিত করেন। তবে এর বাইরেও কয়েক লাখ বিহারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাসের উদ্যোগ নেন। এ শহরেও ক্যাম্পের বাইরে প্রায় লক্ষাধিক বিহারি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, যারা সমাজের মূলধারায় মিশে গিয়ে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভূমিকা রাখছেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বুকে লালন করছেন। এসব পরিবারের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করে দেশ-বিদেশে কর্মরত রয়েছেন।

ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ভোলা, মাসুম আলী, হাবিবুর রহমান ও সাবানা বেগম বলেন, ‘আমরা ২০০৮ সালে ভোটাধিকার পেয়েছি। তাই বাংলাদেশবিরোধী বলে আমাদেরকে যে তকমা দেওয়া হয় তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। উদ্বাস্তু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে চাই না। আমাদের মৌলিক অধিকার দিতে হবে। আমরা সত্যিকার বাংলাদেশি হয়ে সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে চাই।’

‘আমরা দীর্ঘ ৫১ বছর ধরে মানবেতর জীবন পার করছি। সর্বপ্রথম আমাদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ আটকে পড়া বিহারীদের ক্যাম্পগুলো খুবই জরাজীর্ণ। কিছুদিন আগে মুন্সিপাড়ায় ক্যাম্পের ছাদ ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টিতে ক্যাম্পবাসীদের দুর্দশার সীমা থাকে না।’

মানবাধিকার ব্যুরো’র সৈয়দপুর কমিটির সহসভাপতি আখাতারুল ইসলাম জানান, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে পাকিস্তানে ১ লাখ ১৮ হাজার বিহারি প্রত্যাবাসন হয়েছে। ৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর প্রত্যাবাসন ধারা থেমে যায়। সেই থেকে বিহারিরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর ও সৈয়দপুরে আটকে পড়া ক্যাম্পে বাস করছেন। পরে ১৯৯২ সালে পাকিস্তানে ফিরে যেতে ইচ্ছুকদের খুঁজে বের করতে একটি জরিপ চালানো হয়। সেসময় পাকিস্তান সরকার ৩২৩ জনকে ফিরিয়ে নেওয়ার পর আর কাউকেই ফিরিয়ে নেয়নি। তবে এখন বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। বিয়ে-শাদিসহ বিভিন্ন আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠছে। মতানৈক্য না থাকার কারণে এ শহরে অনেক ইতিবাচক উন্নয়ন হচ্ছে।

তিন প্রজন্ম ধরে এক ঘরে দুর্বিষহ বসবাস বিহারিদের

উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবাল বলেন, আমরা দীর্ঘ ৫১ বছর ধরে মানবেতর জীবন পার করছি। সর্বপ্রথম আমাদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ আটকে পড়া বিহারিদের ক্যাম্পগুলো খুবই জরাজীর্ণ। কিছুদিন আগে মুন্সিপাড়ায় ক্যাম্পের ছাদ ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টিতে ক্যাম্পবাসীদের দুর্দশার সীমা থাকে না। বিহারিদের মাসিক খাদ্য বরাদ্দ বিগত ২০০৫ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও আটকে পড়া পাকিস্তানি ইস্যুটির আজ পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি। অদূর ভবিষ্যতেও এ সমস্যা সমাধানে কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথাও নেই। শুধু নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা এসে খোঁজ-খবর নেন, আর দেন প্রতিশ্রুতি। ভোট শেষ হলে আর তাদের দেখা মেলে না।

নীলফামারীর-৪ আসনের এমপি হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম বলেন, সৈয়দপুরে আটকে পড়া অবাঙালিদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের জন্য সংসদে প্রস্তাবনা দিয়েছি। আগামীতে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে একটি লিখিতভাবে প্রস্তাবনা দেওয়া হবে। আমার প্রস্তাবনাটি অনুমোদন পেলে তাদের জন্য বহুতল আধুনিক আবসন গড়ে তোলা হবে।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow