তিন শতকের সাক্ষী চট্টগ্রামের কাঞ্চননাথ শিব মন্দির

চট্টগ্রাম শহর থেকে অক্সিজেন হয়ে ফটিকছড়ির বিবিরহাট। সেখান থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলে কাঞ্চননগর ইউনিয়নের কাঞ্চন হাটখোলা বাজার। বাজার থেকে খরস্রোতা ধুরং খালের পাড় ধরে কয়েক মিনিট হাঁটলেই চোখে পড়ে তিনশ বছরের প্রাচীন শিব মন্দিরটি। স্থানীয়দের কাছে এটি কাঞ্চননাথ শিব মন্দির নামে পরিচিত। ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটি। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ও মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরের সমসাময়িক এই মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এখানে স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গের আবির্ভাব ঘটে। পরে কাঞ্চননাথ শিবের নামেই ঐ এলাকার নামকরণ হয় কাঞ্চননগর। মন্দিরটিকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা  মন্দিরটি ঘিরে প্রচলিত রয়েছে এক লোককথা। স্থানীয় প্রবীণ নুরুল আলম, নুরুল হক ও মন্দিরের পুরোহিত চন্দন চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় কাঞ্চননগর এলাকায় লালা তিলকচাঁদ নামে এক জমিদার ছিলেন। তার একটি গাভি প্রতিদিন দুপুরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হারিয়ে যেত এবং বিকেলে গোয়ালে ফিরে আসত। জমিদারের রাখাল বালক গাভিটি খুঁজ

তিন শতকের সাক্ষী চট্টগ্রামের কাঞ্চননাথ শিব মন্দির
চট্টগ্রাম শহর থেকে অক্সিজেন হয়ে ফটিকছড়ির বিবিরহাট। সেখান থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলে কাঞ্চননগর ইউনিয়নের কাঞ্চন হাটখোলা বাজার। বাজার থেকে খরস্রোতা ধুরং খালের পাড় ধরে কয়েক মিনিট হাঁটলেই চোখে পড়ে তিনশ বছরের প্রাচীন শিব মন্দিরটি। স্থানীয়দের কাছে এটি কাঞ্চননাথ শিব মন্দির নামে পরিচিত। ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটি। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ও মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরের সমসাময়িক এই মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এখানে স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গের আবির্ভাব ঘটে। পরে কাঞ্চননাথ শিবের নামেই ঐ এলাকার নামকরণ হয় কাঞ্চননগর। মন্দিরটিকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা  মন্দিরটি ঘিরে প্রচলিত রয়েছে এক লোককথা। স্থানীয় প্রবীণ নুরুল আলম, নুরুল হক ও মন্দিরের পুরোহিত চন্দন চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় কাঞ্চননগর এলাকায় লালা তিলকচাঁদ নামে এক জমিদার ছিলেন। তার একটি গাভি প্রতিদিন দুপুরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হারিয়ে যেত এবং বিকেলে গোয়ালে ফিরে আসত। জমিদারের রাখাল বালক গাভিটি খুঁজতে গিয়ে একদিন দেখেন বর্তমান মন্দিরস্থলে গাভিটি নিজে থেকেই দুধ ঝরিয়ে দিচ্ছে। পরে জমিদার নিজেও ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। যেস্থানে গাভিটি দুধ ঝরিয়েছিল সেস্থানের বনজঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি পাথরের অংশ দেখতে পান। সেদিন রাতে স্বপ্নে মহাদেব শিবের নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি স্থানটিতে খননকাজ শুরু করেন। খনন করার সময় খুঁজে পান একটি শিবলিঙ্গ। সে সময় শিব লিঙ্গের উপরে অংশ ভেঙে যায়। ঐ রূপেই কাঞ্চননাথ শিব প্রকাশিত হয়েছেন। লালা জমিদার তিলক চাঁদ সেখানেই মন্দির নির্মাণ করেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মন্দিরটি  কাঞ্চননগরকে স্থানীয়রা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ মন্দিরটি। মন্দিরের দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো হিন্দু বসতি না থাকলেও দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে এর দেখভাল করেছেন মো. ইউসুফ নামে এক মুসলিম বাসিন্দা।  স্থানীয় বাসিন্দা মো. শওকত বলেন, আব্বার মুখে মন্দিরটি নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। ইউসুফ চাচা অনেক দিন থেকে ধরে এর দেখভাল করেছেন। তিনি প্রতিদিন মন্দিরের চারপাশ একবার হলেও ঘুরে আসতেন। আমাদেরও বেশ শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে মন্দিরটির জন্য। অনেক অলৌকিক ঘটনার কথা শুনেছি মন্দিরটিকে ঘিরে। হামলা, ক্ষতি ও পুনর্জাগরণ  মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রিপন কান্তি শীল জানান, ১৯৯২ সালে ভারতের বাবরি মসজিদ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময় মন্দিরটি হামলার শিকার হয়। এতে কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে তা পুনরুদ্ধার করা হয়। ১৯৯২ থেকে ২০০৫-০৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৭-১৮ বছর মন্দিরে নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে নতুন করে সংস্কার ও পূজা-অর্চনা শুরু হলে মন্দিরটি আবারও পরিচিতি ফিরে পায়। বর্তমানে মন্দিরটিতে নিত্য পূজা হয়। উত্তরায়ণ তিথি, পৌষ সংক্রান্তি ও শিবচতুর্দশী উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মেলার। প্রতিটি আয়োজনে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ভক্তের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়। উন্নয়ন হলেও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম মন্দির পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নির্মল কান্তি দেব জানান, গত কয়েক বছরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মন্দিরের সংস্কার, শিব বিগ্রহ স্থাপন, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, অফিসঘর, নাটমন্দির সংস্কার, পুকুরঘাট, টিউবওয়েল, ওয়াশরুম ও বিদ্যুতায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তার ভাষ্য, বিগত ১০ বছরে এ পর্যন্ত মন্দিরে ৪৫ লক্ষ টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। তন্মধ্যে সরকারি সহায়তার চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ থেকে ৩ লক্ষ টাকা ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) থেকে ৫ লক্ষ টাকার অনুদান পাওয়া গেছে। স্রাইন কমিটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন দাশ চন্দ্রনাথ ফান্ড থেকে ১১ লাখ টাকা প্রদান করেছেন। তা থেকে মন্দিরের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে ৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বাকি টাকা সাইন কমিটির একজন প্রতিনিধির কাছে জমা রয়েছে।  উল্লেখ্য স্থানীয়দের অনুদানেই অধিকাংশ কাজ হয়েছে। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ তীর্থক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে আরও বড় পরিসরে উন্নয়ন প্রয়োজন।   তিনি আরও বলেন, স্রাইন কমিটি যদি আমাদের স্থানীয় কমিটিকে সাথে নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে এগিয়ে আসেন তাহলে এ কাঞ্চননাথ শিব মন্দিরটি বড় তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিদ্যমান সমস্যা  স্থানীয় মন্দির পরিচালনা কমিটি ভবিষ্যতে কাঞ্চননাথ মন্দিরকে দেশের অন্যতম সনাতনী তীর্থক্ষেত্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ লক্ষ্যে তীর্থযাত্রী নিবাস, প্রসাদ ঘর, স্টোররুম, আধুনিক ওয়াশরুম, স্নানঘাট, বাণিজ্যিক দোকানঘর, ড্রেনেজ ও সিসিটিভি ব্যবস্থা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে নানা সমস্যাও। নাটমন্দিরের ওপর দিয়ে রয়েছে ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইন। যা সরানো খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সাজসজ্জার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ লাইটটি বিশাল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ লাইনটি সরানোর জন্য প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকার ব্যয় নির্ধারণ করলেও অর্থের অভাবে কাজটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়াও কাঞ্চননাথ শিবমন্দির অনেক জায়গা বেদখল হয়ে রয়েছে। যা উদ্ধার করা গেলে মন্দিরটির জন্য নানা আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন মন্দির সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের দাবি ও স্রাইন কমিটির পরিকল্পনা  স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, কাঞ্চননাথ মন্দির সীতাকুণ্ডের স্রাইন কমিটির আওতাভুক্ত হওয়ার পরও খানিকটা অবহেলিত। স্রাইন কমিটির আওয়তাভুক্তির পর থেকে শুরু করে ২০১৮ সাল অবধি দীর্ঘ সময় সরাসরি তদারকি হয়নি স্রাইন কমিটির তরফ থেকে। ফলে স্থানীয়দের উদ্যোগেই মন্দিরের যাবতীয় ধর্মীয় ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে স্রাইন কমিটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশ কাঞ্চননাথ শিব মন্দিরে সীতাকুন্ড চন্দ্রনাথ ফান্ড থেকে ১১ লাখ টাকা অনুদান প্রদান করেছেন। স্রাইন কমিটি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন দাশ বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্দিরটিতে দুইবার গিয়েছি। চন্দ্রনাথ ফান্ড থেকে দুই কিস্তিতে ১১ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছি। পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে সদিচ্ছা থাকলেও অনেক সময় থমকে যেতে হয়। তিনি আরও বলেন, আগামী ১৫/২০ দিনের মধ্যে স্থানীয় মন্দির কমিটির সঙ্গে বসে মন্দির সংশ্লিষ্ট সকল সমস্যার তালিকা করব। স্থানীয় কমিটিকে সঙ্গে নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে মন্দির সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন মূলক কাজ ও সমস্যা নিরূপণে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করব।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow