তিস্তা প্রশ্নে নতুন আশা, পুরোনো সংশয়

গত ২১ থেকে ২৩ মে ২০২৬ পর্যন্ত কলকাতার ফেয়ারফিল্ড হোটেলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক দুই দেশের পানি কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর এবারের বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত হওয়া। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্য সরকার আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক মনোভাব দেখানোয় দুই পক্ষই তথ্যভিত্তিক পানিবণ্টন কাঠামো তৈরির বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে তিস্তা সমস্যার সমাধান নিয়ে অতীতের দীর্ঘসূত্রতা এবং সাম্প্রতিক পুশইন ইস্যুর কারণে পারস্পরিক আস্থার সংকট আবারও আলোচনায় এসেছে। তা সত্ত্বেও ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেই বৈঠকের আরও একটি ইতিবাচক দিক ছিল রিয়েল টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ। এছাড়া নদীভাঙন রোধ, যৌথ নদী খনন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, তবুও রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংলাপের ইতি

তিস্তা প্রশ্নে নতুন আশা, পুরোনো সংশয়

গত ২১ থেকে ২৩ মে ২০২৬ পর্যন্ত কলকাতার ফেয়ারফিল্ড হোটেলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক দুই দেশের পানি কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর এবারের বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত হওয়া। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্য সরকার আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক মনোভাব দেখানোয় দুই পক্ষই তথ্যভিত্তিক পানিবণ্টন কাঠামো তৈরির বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে তিস্তা সমস্যার সমাধান নিয়ে অতীতের দীর্ঘসূত্রতা এবং সাম্প্রতিক পুশইন ইস্যুর কারণে পারস্পরিক আস্থার সংকট আবারও আলোচনায় এসেছে। তা সত্ত্বেও ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সেই বৈঠকের আরও একটি ইতিবাচক দিক ছিল রিয়েল টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ। এছাড়া নদীভাঙন রোধ, যৌথ নদী খনন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, তবুও রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংলাপের ইতিবাচক পরিবেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের নমনীয় অবস্থান এবারের বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারত—এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো অভিন্ন নদনদী। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে, যেগুলোর পানি শুধু কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্যই নয়; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, মানবিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সেই প্রেক্ষাপটে কলকাতায় অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) ৯০তম বৈঠক নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষত ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর শেষে শেষ হতে যাচ্ছে বলে এবারের আলোচনা কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, বরং ভবিষ্যৎ নদী-রাজনীতির একটি নির্ধারক মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পানি রাজ্য-সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বিষয়। গত এক দশকে তিস্তা চুক্তি বারবার আলোচনায় এলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তৎকালীন রাজ্য সরকারের যুক্তি ছিল, উত্তরবঙ্গের কৃষি ও পানির চাহিদা বিবেচনায় তিস্তার পানি ছেড়ে দেওয়া পশ্চিমবঙ্গের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই অবস্থানের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নতুন রাজ্য সরকার নির্বাচনি প্রচারণার সময় আঞ্চলিক সহযোগিতা, সীমান্ত অর্থনীতি এবং বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে। বিশেষত উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং নদীকেন্দ্রিক কৃষি টেকসই করতে যৌথ পানি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তারা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে তিস্তা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং সাম্প্রতিক পুশ-ইন ইস্যুর কারণে পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। তাই বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিস্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নিজস্ব উদ্যোগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের চিন্তা করছে। ইতোমধ্যে নতুন বিএনপি সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতা এবং সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুও নিজস্ব অর্থায়নের বিষয়টি গণমাধ্যমে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং সব মৌসুমে এর পানিপ্রাপ্তি ও ব্যবহার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কারণ বারবার অকাল বন্যা ও খরার সময় তিস্তার পানি কমে যাওয়ায় রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রামের বিশাল অঞ্চল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকরা সেচসংকটে পড়ছেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং নদীভিত্তিক জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। অনেক স্থানে তিস্তার বুকে চর জেগে উঠেছে। ফলে নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্য। নতুন পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তির পথ সহজ হতে পারে।

কলকাতায় অনুষ্ঠিত তিন দিনের এই বৈঠক হয়তো অনেকের কাছে একটি নিয়মরক্ষার সভা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু এখন নিঃসন্দেহে তিস্তা এবং তিস্তা তীরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-জীবিকা। নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিস্তার শুকনো বুকে আবার প্রবাহ ফিরুক, কৃষকের মাঠ সবুজ হয়ে উঠুক এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নদীগুলো নতুন প্রাণ ফিরে পাক—এটাই সবার প্রত্যাশা।

এখানে মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন কোনো একক দেশের দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার এবং অভিন্ন সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহারের প্রশ্ন। তবে শুধু আইনি ও নৈতিক যুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বাস্তব সমাধানের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ। নতুন পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি উপলব্ধি করে যে বাংলাদেশকে ন্যায্য পানি দেওয়া মানে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, তাহলে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব। কারণ নদী নিয়ে সংঘাত সীমান্ত অঞ্চলে অসন্তোষ বাড়ায়, অথচ সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ গলন, অনিয়মিত বর্ষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর প্রবাহের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের পানি সংকট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতায় একতরফা পানি ব্যবস্থাপনা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং বিজ্ঞানভিত্তিক যৌথ পরিকল্পনা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলেও নতুন মাত্রা প্রয়োজন। শুধু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সহযোগিতা বাড়াতে হবে। জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, নদীকেন্দ্রিক গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের যৌথ উদ্যোগ এবং সীমান্ত অঞ্চলের ব্যবসায়িক সংযোগ শক্তিশালী করা গেলে নদী ইস্যুতে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে। কারণ অনেক সময় রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যথায় কূটনৈতিক দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভারতের নতুন পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি বাস্তববাদী ও সহযোগিতামূলক অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। কারণ নদীর পানি প্রশ্নে ইতিবাচক অগ্রগতি শুধু পরিবেশগত নয়, রাজনৈতিক সম্পর্কেও বড় ধরনের আস্থা তৈরি করবে। সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্য কিংবা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যার ক্ষেত্রেও তখন সহযোগিতার নতুন পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।

অবশ্য আশাবাদের পাশাপাশি সতর্ক থাকারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অতীতে বহুবার ইতিবাচক আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। ফলে জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি বাস্তবমুখী। বাংলাদেশ চায় লিখিত, কার্যকর এবং সময়োপযোগী চুক্তি, যার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত হবে। শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, নদীর প্রবাহে তার প্রতিফলন দেখতে চায় মানুষ।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু নিঃসন্দেহে তিস্তা নদী। বহু বছর ধরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি আলোচনায় থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আপত্তি, ভারতের কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়হীনতা এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কারণে বিষয়টি ঝুলে আছে। অথচ উত্তরবঙ্গের লাখো কৃষক তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী অনেক স্থানে প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। নদীর বুকে চর জেগে ওঠে, সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এই বাস্তবতায় তিস্তার ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক দাবি নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন।

তবে এবারের বৈঠক নিয়ে আশাবাদেরও কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সংযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ, বাণিজ্য এবং যোগাযোগে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে নদী ইস্যুতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ভারতের জন্যও কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক নয়। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা এখন বৈশ্বিক আলোচনার অংশ। এ অবস্থায় উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল নয়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় ‘Equitable and Reasonable Utilization’ বা ‘ন্যায্য ও যৌক্তিক ব্যবহার’র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো উজানের দেশ একতরফাভাবে নদীর পানি ব্যবহার করে ভাটির দেশের ক্ষতি করতে পারে না। নদীকে একটি অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে যৌথ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এই নীতিগত অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর যৌথ ব্যবস্থাপনার সুযোগও রয়েছে। দুই দেশ চাইলে রিয়েল টাইম ডাটা শেয়ারিং, বন্যা পূর্বাভাস, নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং যৌথ গবেষণা কার্যক্রম চালু করতে পারে। এতে অবিশ্বাস কমবে এবং পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধও হ্রাস পাবে। ইতোমধ্যে ফারাক্কা এলাকায় যৌথভাবে পানির প্রবাহ পরিমাপের উদ্যোগ সেই সম্ভাবনার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।

কলকাতায় অনুষ্ঠিত তিন দিনের এই বৈঠক হয়তো অনেকের কাছে একটি নিয়মরক্ষার সভা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু এখন নিঃসন্দেহে তিস্তা এবং তিস্তা তীরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-জীবিকা। নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিস্তার শুকনো বুকে আবার প্রবাহ ফিরুক, কৃষকের মাঠ সবুজ হয়ে উঠুক এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নদীগুলো নতুন প্রাণ ফিরে পাক—এটাই সবার প্রত্যাশা।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার যদি সেই সম্ভাবনার পথে কোনো অযৌক্তিক বাধা সৃষ্টি না করে, তবে তা শুধু তিস্তা সমস্যার সমাধানের পথই প্রশস্ত করবে না; বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্যও একটি নতুন ও ইতিবাচক অধ্যায়ের সূচনা করবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow