তূয়া নূরের একগুচ্ছ কবিতা
অন্যরকম সকালের অপেক্ষায় আবার যদি সকাল হয় কখনো কোনোদিন রাত হতে দিও না এমন দীর্ঘতর এক জীবনের সমান এমন যে রাত যা অমাবস্যার রাতের চেয়েও অন্ধকার নৃশংসতায় পূর্ণ, সন্তান হারানো মায়ের কান্না একা ঘরে দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ একজন শিশু যার বাবা আসি বলে আজও আসে নি কিশোরী সে এখন বাবার ছবি পড়ার টেবিলে বাতাসে পাতা ওড়ে, সেই খসখস শব্দ শুনে দৌড়ে আসে বাবা তার আসবে ফিরে, তার বিশ্বাসে একটুও চিঁড় ধরে নি। এই অন্ধকার ভরা শুধু ধোঁকায় ইচ্ছে মতো খুন গুম আর মিথ্যাচার পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। গাছ থেকে ঝুলে থাকা শরীর গায়ে এসে লাগে। সকাল আসে না প্রতিদিন যে সকাল জীবনের সমস্ত কিছু দিয়ে চাওয়া যে সকাল জীবনের সব দুয়ার খুলে দেয় যে সকাল রোদ হয়ে এসে জানলা দিয়ে শিশুর কপালে দেয় চুমু এমন আলো ভরা বানভাসি সকাল যদি আসে কখনো কোনদিন ধরে রেখো তাকে, রাতের কাছে পরাজিত হতে দিও না। রূপ ভালোবাসা ক্রম সম্প্রসারিত অসীম আকৃতির বৃত্তের মতো তার মধ্যে যদি পেন্সিল দিয়ে আঁকি তোমার ভালোবাসা, তা হবে একটা বিন্দুর মতো। আবার সেই ভালোবাসা অনেকটা সময় থাকে হিমাঙ্কের নিচে, বরফে ঢাকা চারদিক, জমে হিম হওয়া বাইরের ব
অন্যরকম সকালের অপেক্ষায়
আবার যদি সকাল হয় কখনো কোনোদিন
রাত হতে দিও না এমন দীর্ঘতর এক জীবনের সমান
এমন যে রাত যা অমাবস্যার রাতের চেয়েও অন্ধকার
নৃশংসতায় পূর্ণ, সন্তান হারানো মায়ের কান্না
একা ঘরে দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ
একজন শিশু যার বাবা আসি বলে আজও আসে নি
কিশোরী সে এখন বাবার ছবি পড়ার টেবিলে
বাতাসে পাতা ওড়ে, সেই খসখস শব্দ শুনে দৌড়ে আসে
বাবা তার আসবে ফিরে, তার বিশ্বাসে একটুও চিঁড় ধরে নি।
এই অন্ধকার ভরা শুধু ধোঁকায়
ইচ্ছে মতো খুন গুম আর মিথ্যাচার
পথ খুঁজে পাওয়া যায় না।
গাছ থেকে ঝুলে থাকা শরীর গায়ে এসে লাগে।
সকাল আসে না প্রতিদিন
যে সকাল জীবনের সমস্ত কিছু দিয়ে চাওয়া
যে সকাল জীবনের সব দুয়ার খুলে দেয়
যে সকাল রোদ হয়ে এসে জানলা দিয়ে শিশুর কপালে দেয় চুমু
এমন আলো ভরা বানভাসি সকাল যদি আসে কখনো কোনদিন
ধরে রেখো তাকে, রাতের কাছে পরাজিত হতে দিও না।
রূপ
ভালোবাসা ক্রম সম্প্রসারিত অসীম আকৃতির বৃত্তের মতো
তার মধ্যে যদি পেন্সিল দিয়ে আঁকি তোমার ভালোবাসা,
তা হবে একটা বিন্দুর মতো।
আবার সেই ভালোবাসা অনেকটা সময় থাকে হিমাঙ্কের নিচে,
বরফে ঢাকা চারদিক, জমে হিম হওয়া বাইরের বাতাস
শাবল ঠেলে পাথর বরফ পরিষ্কার করা ড্রাইভওয়ে থেকে।
কখনো স্ফুটনাংকের উপরে, মরুভূমির তপ্ত বালি,
পায়ের তলার মোটা চামড়া পুড়ে যায়
গরম হাওয়া আসে, বালু উড়িয়ে আসে মরুঝড়,
উটের মতো মুখ গুঁজে বুঁদ হয়ে থাকি।
অগ্নুৎপাত হয় কখনো বুকের আগ্নেয়গিরি থেকে
লাভা নামে আগুন নদীর স্রোত হয়ে।
এর মাঝে কতটুকু ভালোবাসো তুমি ভালোবাসার মতো
কী নেশায় মাতাল করো তুমি?
কীসের টানে টানো এমন তীব্র করে?
ভবঘুরে হয়ে যাবো ঠিক করে ঘর ছাড়ি
আর কোনদিন ফিরবো না। ঠিক তিন দিন পার করে
ঘরে ফিরে আসি, কড়া নাড়ি দরজায়।
এক টোকায় খুলে যায়, যেন দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলে
আমার অপেক্ষায়।
নাম ধরে ডাকে
হঠাৎ কী খেয়াল চাপলো তার মাথায়
পড়া থামিয়ে, বইয়ের পাতার ফাঁকে আঙুল রেখে
মাথা তুলে আনমনা তাকালো জানলা দিয়ে বাইরে।
কী ভাবলো সে মনে মনে,
জানালার পাশে নারকেল গাছের পাতা থির থির করে কাঁপছিলো,
তার উপরে সূর্যের আলোর ঝিকিমিকি।
ঠোঁটের কোণে ফুটলো কী হাসি তার?
চোয়ালে ফুটলো কী টোল ঘাসফুলের মতো?
আমার দিকে চেয়ে বললো, তুমি আমার অপু হবে?
এটুক বলে একটু থামে। তারপর হেসে ওঠে কোজাগরী রাতে ভূতে পাওয়া রমণীর মতো।
বলে, তোমার সাথে ফাজলামি করছিলাম!
কিছুই বলতে হবে না তোমাকে।
নিষ্প্রভ হয়ে আসে তার মুখ নিভে যাওয়া তারাদের মতো
রংধনুর সাতরং খসে পড়ে
বিবর্ণ ছাই ঢেকে ফেলে তার আকাশ।
কী দেখে ছিলো সেদিন সে চোখে
কী ভেবে ছিলো মনে মনে নিজের মতন করে
ছোট্ট কিছু কথা সারা জীবনের মানে হয়ে যায়,
ছোট্ট কিছু কথা জমে যায় সিমেন্ট মাটির মতো
কিছু নাম যেন শুধু নাম নয়
বুকের অস্তিত্ব জুড়ে সীসার হরফে কালো কালিতে
মুদ্রিত হয়ে যায়।
গল্প পড়ার ছলে, কোন প্রিয় নাম ধরে ডেকে
কেউ কী কারো সব হয়ে যায়?
একান্ত একজন হয়ে যায় সারা জনমের?
এতোটা বছর পর এতো মানুষের ভিড়ে
আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললো, তুমি অপু না?
ভাঙে
হাত থেকে মেঝেতে পড়ে চায়ের কাপ ভাঙে
পানির কাচের জগ, গ্লাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়।
নদী ভাঙে, ঘর বাড়ি ভাঙে,
তুমি নদীর পারে দাঁড়ালে দেখতে পাবে।
কিছু জিনিস ভাঙে চোখের আড়ালে,
দেয়ালের আড়ালে—শব্দ হয় না তাতে।
ঘুম ভেঙে গেলে গোমড়া মুখ করে স্বপ্নরা ভেঙে যায়।
মন ভেঙে যায়।
অথচ দেখো এই মনটা কাঁচ-মাটি ও পানির মতো
কঠিন, তরল কোন পদার্থে তৈরি নয়।
পরের সময়ের জন্য
মাটির অনেক গভীরে একটা গ্রিন হাউস বানাও
সব ধরনের গাছ, ধান পাট খাদ্য শস্যের বীজ রেখো সেখানে।
সবার গুদামে জমানো আণবিক বোমা দিয়ে পৃথিবীটাকে হাজার বার ঝলসানো যাবে।
গাছ পালা মাটি পুড়ে হবে কয়লা।
কোন মানুষ যদি সেই তাণ্ডব থেকে বেঁচে যায় সৌভাগ্যক্রমে?
সেই গাছ রোপণ করে ডেকে আনবে সবুজ
নীল আকাশ, পানি ও বৃষ্টি।
মাটি নরম হলে ছড়িয়ে দেবে ধান, গম এ রবিশস্যের বীজ,
আবার শুরু হবে নতুন করে সভ্যতার।
নতুন করে জীবনঘাতি অস্ত্র বানাতে লাগবে কয়েক শ’ বছর,
ততদিন অন্তত: শান্তিতে থাকবে পৃথিবী।
ভালোবাসার নেশা
ভালোবাসা মরণঘাতী নেশা,
বিড়ি, সিগারেট, মদ, তাড়ি, ভাং, গাজা, আফিমের মতো
রক্ত, পেশী, মন মজ্জায় টান ধরায়।
হঠাৎ করে ছাড়া যায় না নেশা
বিপদ আছে তাতে।
শুরু হয় উইথড্রল সিন্ড্রোম,
শরীর কুঁকড়ায় ধনুষ্টংকার রোগীর মতো
হৃৎপিণ্ডটাকে নিংড়ায় ধোপার কাপড়ের মতো।
নেশা ছাড়াতে হয় নেশার দ্রব্য দিয়ে
আস্তে আস্তে কমাতে হয় নেশার ওষুধের মাত্রা।
ভালোবাসাহীন মানুষের কোন নিরাময় নেই,
ভালোবাসা থাকা ভালো না —
ভালোবাসায় কষ্ট বেশী,
ধারালো নখে টেনে ধরে ঠুকরে ঠোঁটে ছিঁড়ে খায় হৃদয়।
হারায়ে ফেলা
হারায়ে যেন না যায়—নিজেকে খুব শাসায়ে
খুব যত্নে তুলে রেখেছো।
তুমি ছাড়া আর অন্য কেউ জানেনা তার খবর।
কেউ কখনো সন্ধান পাবে না তার।
খুব মূল্যবান একটা রত্ন।
এতো সাবধান হয়েও হারায়ে ফেললে তুমি!
ঠিক কোথায় রেখেছো বলতে পারো না,
তন্নতন্ন করে ঘরবাড়ির খুঁজেছো সব জায়গা।
আলমারি, ড্রয়ার, জামা ও জিনসের প্যান্টের পকেটের ভেতর ছোট পকেট।
ভুল করে কোথাও পড়ে গেলো কী না!
চলে গেছে আবর্জনার সাথে?
কিছুতো রয়ে যাবে
সব কিছু ধুয়ে মুছে আনকোরা করে রাখা যায়?
কাটা দাগ মিশে যায় যতোটা পারে
বাকীটা থেকে যায় যেন তুমি ভুলতে না পারো।
হাসপাতালের বেড থেকে ফিরে আসো যখন ভাল হয়ে
মিশে যাও জগত সংসারের কাজে
তার মানে হলো কষ্ট তোমাকে নয়
তুমি করায়ত্ত করেছো কষ্ট,
কষ্টের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরতে শিখেছো তুমি।
কষ্ট থাকে সাথে,
একেবারে ছেড়ে ছুড়ে চলে যায় ন।
ছোট্ট একটা মেয়ে আসে প্রতি শনিবার তার বাবার সাথে
একদিন এলো তার জন্য খেলনা কিনে দিতে
কপালের মাঝখানে ব্যান্ডেড দিয়ে ঢাকা
বাবার সাথে খেলতে গিয়ে ডেস্কের কোনায় কেটেছে কপাল।
খুলে দেখালো
কাঁটাটা গভীর ছিলো
বললাম, মেয়েটা বড় হবে
দাগটাও গভীর হয়ে থাকবে।
আমার পরামর্শ শুনে নিয়ে গেলো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে।
পরের শনিবার আমাকে দেখাতে নিয়ে এলো
আধুনিক চিকিৎসায় নতুন ধারণা প্রতিদিন
কসমেটিক সেলাই না, সেখানে লাগিয়ে দিয়েছে আঠা।
ঝাপসা লাগছিলো কাটা দাগটা।
এই ছোট্ট মেয়েটা একদিন বড় হবে
অনেক সুন্দরী হবে নীল নয়না
তার মাঝ কপালের দাগটা কতোটুকু ম্লান হবে
আমার দেখা হবে না।
শিরোনাম নেই
হাত ধরা ছিল।
কে হাত ছেড়েছিলো টেনে?
এতদিন আগের কথা থাকে কারো মনে?
ছেলেটা বলেছিল, তোমাকে চাই!
মেয়েটা বলেছিল, বাবা মাকে বলো।
কিছুদিন পর আত্মীয় মারফত সম্বন্ধের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো,
আর সবিনয়ে নাকচ হয়েছিলো।
মেয়েটা বিয়ে করেছিলো মায়ের পছন্দের অন্য এক জনকে,
বাবার মত ছিলো না।
বয়সে বড়ো, অনেকটা জেদ করেই বিয়ে করেছিলো ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়।
ছেলেটা ফুল পাখি পাতাদের নাম জানে,
একটা চাকরি ছেড়ে আরেকটা চাকরি ধরে
কিছুদিন বেকার বসে থাকে।
ঠিক বসে থাকা না, ঘুরে বেড়ায় ভবঘুরে
চমৎকার ছবি তুলে সে ক্যামেরায়।
এসব নিয়ে বড়সড় মাপের পাণ্ডুলিপি আছে অনেকদিন ধরে পড়ে,
বাকী কাজের উৎসাহ কেটে খেয়েছে উইপোকা।
অনেক দিন পর যোগাযোগ হল সামাজিক মাধ্যমে।
মেয়েটা তাকে জিগ্যেস করে, বিয়ে করেছো?
ছেলেটা বলে, না।
মেয়েটা বলে, তোমার জন্য মেয়ে দেখে দি?
ছেলেটা বলে দাও।
মেয়েটা ফোন করে বলে, দেখে এসেছ যে মেয়েটার ঠিকানা দিয়েছিলাম।
ছেলেটা বলে, হ্যা।
মেয়েটা বলে, কেমন দেখলে, পছন্দ হয়েছে?
ছেলেটা বলল, খুব সুন্দর মেয়েটা।
মেয়েটা বলল, পছন্দ হয়েছে তাহলে?
ছেলেটা বলল, না। তোমার মতো দেখতে না যে!
মেয়েটার মন ভীষণ খারাপ হয়েছিলো।
তার অন্তরের অন্তরে বেহালা করুণতম সুরে বেজেছিল,
ঠিক তখনই অনেক দিন পর ছেলেটা ফোন করে।
বললো, একটা দিনের কথা তোমার মনে পড়ে?
হাত তুমি ছাড়িয়ে নাওনি
কারো আসার পায়ের শব্দ শুনে আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।
মেয়েটা বলে, মনে আছে।
ছেলেটা বলে, একদিন যখন তুমি একা হবে,
আমাদের বয়স ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই হবে..
চুল পেকে সব সাদা হবে
তোমার ভাঁজ পড়া হাতে চুমু দেবো
দেখবো উলট পালট করে কতবার পুড়েছে চুলার আগুনে মনের ভুলে,
হাত ধরাধরি করে হেঁটে পার হবো রাস্তা।
শীতের দিনে বেতের মোড়ায় রোদে বসে চা খেতে খেতে
শুনবো তোমার প্রতিটা দিনের গল্প।
মেয়েটা শুনল শুধু,
কিছুই বলল না।
তার চোখ কি ভিজে গিয়েছিলো?
মেয়েটা তার কোন এক বন্ধুর কাছে বলেছিল,
আলোক সজ্জায় ভরা তার বিয়েটা
ছিল এক ভুতুড়ে ব্যাপার।
সুযোগ পেলে টাইম মেশিনে পিছনে ফিরে গিয়ে কিছু ভুল শুধরে আসতো!
ভুলে ভরা মানুষের জীবন,
ইরেজার দিয়ে সাদা খাতায় দাগ মুছতে গিয়ে
আরও ময়লা করে ফেলে শিশুদের মতো।
মুছে ফেলো
চোখ বন্ধ করে ভেতর ঘরের বাতিটা জ্বেলে দেখো
কোথাও কী রয়েছে জমা অহংকারের বিন্দু ধূলিকণা!
যতক্ষণ থাকে সেই ধূলিকণা
জেনে রেখো ততক্ষণ তুমি অসাম্প্রদায়িক নও
সাদা চামড়ার অহংকার তোমার, তুমি কাল, খয়েরী বা পীত চামড়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ!
আমরা ধর্মের বড়াই করি
জাতের বড়াই করি।
নিম্ন জাত, অচ্ছুত বলে গালাগালি করি।
সীমানা তুলে ভাগ ভাগ করে দেই।
তার একটু এপার ওপার হলে মাংসাশী দাঁতে
রক্তাক্ত কামড়াকামড়ি শুরু হয়ে যায়।
তুমি যখন এইডসের রোগীকে ঘৃণা করো
হাত তুলে ছি ছি করে তাড়িয়ে দাও নুলো ভিখারি,
বয়সের দোহাই
জাতিভেদের দোহাই
ভাষা, সংখ্যালঘু, উপজাতি ও আঞ্চলিকতার বাছবিচার
এতো কিছু বুকে রেখে তুমি ভালবাসার মত মানুষ হবে কী ভাবে?
সব রক্তের রং সমান লাল
সবাই একই মাটির সন্তান, সেই মাটিতে মেশে।
একটা আকাশ সবার
একটা সূর্য সবার, একটা চাঁদ সবার।
আস্তে আস্তে করে সরাও বুকের ভেতর জমানো ক্লেদ,
অহংকারের দানা আছে কী না খুঁজে দেখো!
নিজের চোখে ধরা পড়ে না নিজের ত্রুটি
ভেতর ঘরের বাতি জ্বালো
দাড়াও আয়নার সামনে
ভালবাসা দিয়ে ধুয়ে ফেলা যায় সব কষ্ট।
What's Your Reaction?