ত্রিশালে দোকান বরাদ্দে অনিয়ম, দুই দশক ধরে রাজস্ব হারাচ্ছে পৌরসভা

ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভায় মহিলা বিপণিকেন্দ্রের দোকান বরাদ্দ ও ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং রাজস্ব বঞ্চনার অভিযোগ উঠেছে। দোকানপ্রতি আড়াই হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হলেও, পৌরসভার হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা। দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলা এ আর্থিক অনিয়মে পৌরসভা হারিয়েছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশে প্রতিষ্ঠিত এ বিপণিকেন্দ্রে শুরুতে ছয়টি এবং পরে আরও দুটি দোকান যুক্ত হয়ে বর্তমানে মোট আটটি দোকান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব দোকানে চা-স্টল, কাঁচামাল, ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের আগে দোকানগুলোর ভাড়া আদায় করতেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। পরে পৌরসভার বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম এবং পরবর্তীতে প্রধান সহকারী এছহাক আলী দোকানপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া আদায় করেন। তবে পৌরসভার কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা করে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের উচ্ছেদ করে নতুন করে দোকান বরাদ্দ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, গত বছরের ৩ জুলা

ত্রিশালে দোকান বরাদ্দে অনিয়ম, দুই দশক ধরে রাজস্ব হারাচ্ছে পৌরসভা

ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভায় মহিলা বিপণিকেন্দ্রের দোকান বরাদ্দ ও ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং রাজস্ব বঞ্চনার অভিযোগ উঠেছে। দোকানপ্রতি আড়াই হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হলেও, পৌরসভার হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা। দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলা এ আর্থিক অনিয়মে পৌরসভা হারিয়েছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশে প্রতিষ্ঠিত এ বিপণিকেন্দ্রে শুরুতে ছয়টি এবং পরে আরও দুটি দোকান যুক্ত হয়ে বর্তমানে মোট আটটি দোকান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব দোকানে চা-স্টল, কাঁচামাল, ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছিল।

অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের আগে দোকানগুলোর ভাড়া আদায় করতেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। পরে পৌরসভার বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম এবং পরবর্তীতে প্রধান সহকারী এছহাক আলী দোকানপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া আদায় করেন। তবে পৌরসভার কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা করে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের উচ্ছেদ করে নতুন করে দোকান বরাদ্দ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, গত বছরের ৩ জুলাই এবং চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ব্যবসায়ীদের দোকান ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়। পরে ১৮ জানুয়ারি পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী সেনাবাহিনীর সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযানে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে তা স্থগিত করতে হয়।

সে সময় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, কোনো রসিদ ছাড়াই বছরের পর বছর তাদের কাছ থেকে মাসিক ভাড়া আদায় করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবি, সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করে পরিবার চালিয়ে আসলেও হঠাৎ উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাদের চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।

পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার পর নিয়মের মধ্যে অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ব্যবসায়ীরা দোকানের সামনেই অস্থায়ীভাবে মালামাল রেখে বেচাকেনা চালিয়ে আসছিলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দের জন্য তিনবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার অজুহাতে পরে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের কম টাকায় দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, আটটি দোকানের মধ্যে দুটি দোকান দরপত্রের মাধ্যমে দোকানপ্রতি ছয় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত এবং মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাড়ার শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অন্য দোকানগুলোর জন্যও তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পাঁচটি দোকানের জন্য এক লাখ টাকা এবং একটি দোকানের জন্য দেড় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেওয়া হয়েছে।

দোকান না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক যুবদল নেতা হুমায়ুন কবির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পরও তিনি ন্যায্য সুযোগ পাননি।

দোকানবঞ্চিত ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা, ছফির উদ্দিন ও ওয়াদুদ বলেন, আমরা ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে ব্যবসা করছি। নিয়মিত ভাড়া দিলেও কখনো রসিদ পাইনি। যদি জানতাম নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তাহলে আমরাও আবেদন করতাম।

পৌর বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর ছয় মাসের ভাড়া দোকানপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করে জমা দিয়েছি। পৌরসভা কত টাকা পাওয়ার কথা ছিল বা বাকি টাকা কোথায় গেছে, তা আমার জানা নেই।

প্রধান সহকারী এছহাক আলী বলেন, আমি ভাড়া আদায় করেছি, তবে এখনো জমা দিইনি। দ্রুত জমা দেওয়া হবে। আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দোকানপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকা জমা হতো।

সদ্য বিদায়ি পৌর প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার দেবনাথ বলেন, দোকানপ্রতি ৩০০ টাকা জমা হতো। বাকি টাকা কে নিত, সেটা সবাই জানে। বরাদ্দ প্রক্রিয়ার বিষয়ে আমি পুরোপুরি অজ্ঞ ছিলাম না।

বর্তমান পৌর প্রকৌশলী লুৎফুল ইসলাম বলেন, আটটি দোকানের মধ্যে দুটি আগে থেকেই দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ ছিল। বাকি ছয়টি দোকানের জন্য তিনবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও সাড়া না পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে সক্ষমতার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে আমার জানা নেই।

পৌর প্রশাসক ও ইউএনও আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অনেক চেষ্টা করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। নিয়ম মেনে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কেউ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে থাকলে তা কার কাছে দিয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে পৌরসভার রাজস্ব ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।

হোসাইন সুলভ/কেএইচকে/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow