রক্তাক্ত সকাল : এক অব্যক্ত আর্তনাদ
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়ায়নি। সদর দরজার পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে কয়েকজন শিশুর খেলা—কেউ জানত না, কয়েক মুহূর্ত পরেই সবকিছু বদলে যাবে। হঠাৎ ভেসে এলো গুলির শব্দ। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
একজন অফিসার স্তব্ধ হয়ে ফোন কানে নিয়ে বলছেন—
‘সব ঠিক হয়ে যাবে… চিন্তা করো না।’
কিন্তু তাঁর কণ্ঠের ভেতরে লুকিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা।
ঘরের ভেতরে এক মা জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলেন ধোঁয়া উঠছে। তাঁর ছোট ছেলে জিজ্ঞেস করল,
‘বাবা কি আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে?’
তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ভুল বোঝাবুঝি ও ক্ষোভের আগুন
দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, বেতন ও সুযোগ–সুবিধা নিয়ে ক্ষোভ, নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অবিশ্বাসের দেয়াল।
যেখানে সংলাপ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে জমে উঠেছিল সন্দেহ।
যেখানে সহমর্মিতা প্রয়োজন ছিল, সেখানে বেড়ে উঠেছিল বিচ্ছিন্নতা।
একই ইউনিফর্ম পরা মানুষগুলো, যারা সীমান্তে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতেন, হঠাৎ একে অপরের মুখোমুখি। ভুল বোঝাবুঝি আর উসকানির আগুনে মানবিক সম্পর্কগুলো মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেল।
পরিবারের সংকট ও দীর্ঘশ্বাস
সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল পরিবারের অপেক্ষা।
টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠছিল ভাঙা ভবন, উদ্বিগ্ন মুখ।
ফোন বেজে উঠলেই বুক ধড়ফড় করত—সুখবর, না দুঃসংবাদ?
অনেক পরিবার ফিরে পেয়েছিল নিথর দেহ, অনেকেই শুধু স্মৃতি।
একটি মেয়ে তার বাবার শেষ কথাটি মনে করে আজও কাঁদে—
‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’
কিন্তু সেই আশ্বাস আর কখনও ফিরে আসেনি।
অনুভূতির উত্তরাধিকার
এই ঘটনা শুধু একটি বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল বিশ্বাসভঙ্গ, বেদনা
আর জাতীয় শোকের প্রতিচ্ছবি।
রক্তাক্ত সেই দিন আমাদের শিখিয়েছে—
সংলাপের অভাব, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অবহেলা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আজও যখন ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ আসে,
ঢাকার আকাশ যেন ভারী হয়ে ওঠে—
স্মরণ করিয়ে দেয়, শান্তি ও মানবিকতার বিকল্প নেই।
(পিলখানা ট্রাজেডি স্মরণে)
নিরন্তর আহাকার
তবু তাকে ফিরে পেতে হৃদয় কাঁদে নিঃশব্দে,
সোনালি হাসির দিনগুলো ভেসে ওঠে চোখের জলে ভিজে।
বাবা–মায়ের পাশে বসে কাটানো সাধারণ সময়,
আজ তা-ই সবচেয়ে দামী, সবচেয়ে অচেনা সুখময়।
কতটা পথ পেরিয়ে এলাম, বুঝিনি কখনো,
পেছনে ফেলে এসেছি শিকড়, ছায়া, আপন জন কতজন।
চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায় নিশ্বাসের গতি,
বাঁচতে চাই—এই আকুতিই হয়ে ওঠে শেষ মিনতি।
বাবার মুখটা মনে পড়ে না ঠিক করে আর,
তবু বুকের ভেতর শূন্যতা ডাকে নিরন্তর হাহাকার।
শৈশবে না বোঝা ভাইবোনের নিঃশর্ত টান,
আজ ক্লান্ত জীবনে সেটাই সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থান।
এই কাছে, এই দূরে—সময়ের নিষ্ঠুর খেলা,
স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকে, যা আর কোনোদিন ফেরে না একেলা।
কিছু অনুভব
কিছু ভালোবাসা ও থাকবে—নামহীন, নীরব,
কবিতা পড়ে চোখ ভিজবে, বুক হবে ভারী গভীরতর।
যাদের বলা হয়নি কথা, ছোঁয়া হয়নি আর,
তাদেরই স্মৃতি এসে বসে রাতের অন্ধকার।
কিছু ভালোবাসা কষ্ট দেবে, তবু যাবে না দূরে,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকবে দীর্ঘশ্বাস ভরে।
সময় সব নিয়ে যায়, রেখে যায় দাগ,
কবিতার লাইনে লাইনে কাঁদে অব্যক্ত রাগ।
ভালোবাসা মানেই সুখ নয়—এ কথাই শেখায়,
কিছু অনুভব আজীবন হৃদয় বিদীর্ণ করেই বাঁচায়।