দুই দশকের মধ্যে এসএসসিতে সবচেয়ে খারাপ ফল, কেন এ বিপর্যয়

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল দেখলো দেশ। এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নিয়েও ফেল করেছে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী। পরিসংখ্যান বলছে, এসএসসিতে পাসের এ হার ২০০৭ সালের পর এবার সবচেয়ে কম। ওই বছর (২০০৭ সাল) পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর ১৯ বছরে আর কখনো পাসের হার এত নিচে নামেনি। কেন এ বিপর্যয়- তা নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে বেশি ফেল করায় এমন ফল বিপর্যয়। আরও পড়ুন ইংরেজি-গণিতে বেশি ফেল, আইসিটিতে চমক তাদের দাবি, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীরা দুটি বিষয়ে ব্যাপক হারে ফেল করেছে। এ কারণে ফলাফলে গড় পাসের হারে ধস নেমেছে। যদিও শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, ‘এবার ফলাফল খারাপ নয়, বরং সুন্দর হয়েছে।’ শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতের দুর্বলতা নতুন নয়। প্রতিবছরই এ দুটি বিষয়ে বেশি ফেল দেখা যায়। কেন শিক্ষার্থীরা ফেল করছে, তা মাঠপর্যায়ে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। উত্তরপত্র যত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হোক না কেন, এতসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল গ্রহণযোগ্য নয়। কেমন হ

দুই দশকের মধ্যে এসএসসিতে সবচেয়ে খারাপ ফল, কেন এ বিপর্যয়

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল দেখলো দেশ। এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নিয়েও ফেল করেছে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী।

পরিসংখ্যান বলছে, এসএসসিতে পাসের এ হার ২০০৭ সালের পর এবার সবচেয়ে কম। ওই বছর (২০০৭ সাল) পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর ১৯ বছরে আর কখনো পাসের হার এত নিচে নামেনি।

কেন এ বিপর্যয়- তা নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে বেশি ফেল করায় এমন ফল বিপর্যয়।

তাদের দাবি, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীরা দুটি বিষয়ে ব্যাপক হারে ফেল করেছে। এ কারণে ফলাফলে গড় পাসের হারে ধস নেমেছে। যদিও শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, ‘এবার ফলাফল খারাপ নয়, বরং সুন্দর হয়েছে।’

শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতের দুর্বলতা নতুন নয়। প্রতিবছরই এ দুটি বিষয়ে বেশি ফেল দেখা যায়। কেন শিক্ষার্থীরা ফেল করছে, তা মাঠপর্যায়ে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। উত্তরপত্র যত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হোক না কেন, এতসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল গ্রহণযোগ্য নয়।

কেমন হলো এবারের এসএসসির ফল

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার অংশ নেয় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পাস করাদের মধ্যে ছাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন এবং ছাত্রী ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন।

ছাত্রীদের গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এবার ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। তাদের মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন এবং ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০ জন। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে এগিয়ে ছাত্রীরা।

১১টি বোর্ডের ফলাফলে সবার ওপরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং তলানিতে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। তবে শুধু সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের হিসাব কষলে ফলাফলে সবার নিচে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ও ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

এছাড়া বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।

বিগত ১৯ বছরে যেমন ছিল এসএসসির ফল

২০০০ সাল পর্যন্ত দেশের পাবলিক পরীক্ষায় ডিভিশন পদ্ধতি অর্থাৎ, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ছিল। ২০০১ সাল থেকে এসএসসিতে জিপিএ পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ করা হয়, যেখানে পাঁচটি স্কেলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। ওই বছর পাসের হার ছিল ৩৫ দশমিক ২২। পরের বছর ছিল ৪০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। নতুন এ পদ্ধতি চালুর পর শিক্ষার্থীদের বুঝে উঠতে কিছুটা সময় লাগে। এ কারণে প্রথম তিন-চার বছর তুলনামূলক খারাপ ফলাফল দেখা যায়।

২০০৬ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২২ শতাংশ। এর পরের বছর আবারও ফল বিপর্যয় ঘটে। সেবার পাসের হার নেমে যায় ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে। এরপর আরও কখনো খুব বেশি নিম্নমুখী ফল দেখা যায়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে ফলাফলে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল। যদিও অভিযোগ ছিল, শিক্ষার্থীদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে ফলাফলে উল্লম্ফন ঘটানো হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী- ২০০৮ সালের এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ১৮ শতাংশ, ২০০৯ সালে ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০১১ সালে এসএসসিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের ঘরে প্রবেশ করে। এরপর টানা সাত বছর ৮০ শতাংশের ওপরে পাসের হার দেখা যায়।

২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৮০ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হার ছিল। মাঝে ২০১৮ সালে এসএসসিতে পাসের হার কিছুটা কমে আসে। সে বছর পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

২০১৯ সালে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮২ দমমিক ৮৭ শতাংশ। ২০২১ সালে করোনাভাইরাসের কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও কম বিষয়ের ওপর এসএসসি পরীক্ষা হয়। সেবার দ্রুততম সময়ে ফল প্রকাশ করা হয় এবং পাসের হারও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ওই বছর পাসের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

করোনার ধাক্কায় ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ সালেও সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ছিল। তবে এ তিন বছর সব বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এ তিন বছরে যথাক্রমে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ ও ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২০২৫ সালে পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের ওপর এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাসের হার নিম্নমুখী দেখা যায়। ওই বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে বিএনপি। নতুন সরকারের অধীনে এসএসসি ও সমমানের মধ্য দিয়ে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। রীতি ভেঙে ৮২ দিন পর পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। তাতে বিগত ১৯ বছরের মধ্যে এসএসসিতে সর্বনিম্ন ফলাফলের রেকর্ড হয়েছে।

ফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

এসএসসি ও সমমানের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার মোটাদাগে দুই কারণে পাসের হারে ধস নেমেছে। একটি হলো- মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা, আর দ্বিতীয়টি হলো- গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে বেশি ফেল।

শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার বাইরে বেশি সময় কাটাচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবহারে তাদের সময় বেশি কাটছে। এ কারণে গণিত ও ইংরেজির মতো তুলনামূলক কঠিন বিষয়ে তারা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে না।-ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক আশরাফ উদ্দীন

রাজধানীর মতিঝিল বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মারুফ বিল্লাহর ছেলে মুহতাসিম বিল্লাহ। সে জিপিএ-৪ পেয়েছে। মারুফ বিল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছেলের নম্বর দেখলাম। ওর টার্গেট ছিল ‘এ প্লাস’। কিন্তু ও ইংরেজিতে খারাপ করেছে। গণিতেও একটুর জন্য এ গ্রেড আসেনি। মূলত গণিত, ইংরেজি ও অর্থনীতিতে কম পাওয়ায় এ প্লাস পায়নি।’

বিদ্যালয়ে পড়ালেখার মান নিয়ে অভিযোগ ‍তুলে তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয়ে শিক্ষক দরকার ৩২ জন। আছেন নাকি মাত্র ১৯-২০ জন। গণিতের ভালো শিক্ষক নেই। একজন থাকলেও তাকে সব ক্লাসে গণিত পড়াতে হয়। এতে সেই শিক্ষক হিমশিম খান। শিক্ষক না থাকায় ক্লাসে ছেলের পড়ালেখা ভালো হয়নি। বাসায় ও প্রাইভেটে যা পড়েছে, সেই প্রস্তুতি দিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। স্কুলে ভালো পড়াটা হলে হয়তো এ প্লাস পেতেও পারতো।’

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক আশরাফ উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আর্টসের (মানবিক বিভাগ) শিক্ষার্থীরা বরাবরই গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল থাকে। এটা আমার শিক্ষকজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। তবে এবার খুব বেশি খারাপ করেছে।’

কী কারণে এমনটি ঘটেছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার বাইরে বেশি সময় কাটাচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবহারে তাদের সময় বেশি কাটছে। এ কারণে গণিত ও ইংরেজির মতো তুলনামূলক কঠিন বিষয়ে তারা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে না।’

মানবিক বিভাগের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর টার্গেটই থাকে কোনোমতে এ দুটি বিষয়ে পাস করা জানিয়ে এই শিক্ষক বলেন, ‘ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে এ দুটি বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। অনেকটা সেই প্রবাদের মতো, যেখানে বলা হয়েছে, পচা শামুকে পা কাটে বেশি।’

কারিকুলামে যেভাবে শেখানোর কথা, সেভাবে শেখালে কেউ ফেল করার কথা নয়। প্রথমত, কারিকুলাম নামমাত্র মানে; দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তারা মানসম্মত উপায়ে ক্লাসে পড়াতে পারেন না। আর সবশেষ যেটা সমস্যা তা হলো শিক্ষকরা বেতন-ভাতা কম পাওয়ায় নিজ পেশায় মনোযোগ কম দেন। এতে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়াতেও তারা অবহেলা করেন।-শিক্ষাবিদ ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান

দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মোর্চা বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এ কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মানবিক বিভাগে এবার বিপর্যয় ঘটে গেছে। তারা ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করেছে। সেজন্য ফেলের সংখ্যাটাও মানবিকে বেশি। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ভালো করায় তাদের পাসের হার ও জিপিএ প্রাপ্তি মোটামুটি ভালো।’

ফল খারাপ নয়, সুন্দর হয়েছে: দাবি শিক্ষামন্ত্রীর

ফল প্রকাশের ঘোষণা অনুষ্ঠানে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হারকে ফল বিপর্যয় উল্লেখ করে প্রশ্ন করেন একাধিক সাংবাদিক। সেটিকে উড়িয়ে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ফল দেখেছেন? কোথায় ফল খারাপ হয়েছে। আমি তো দেখছি ফল সুন্দর হয়েছে।’

কঠোরভাবে খাতা মূল্যায়নের ইস্যুতেও কৌশলী উত্তর দেন শিক্ষামন্ত্রী। ড. এহছানুল হক মিলনের ভাষ্য, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, খাতায় তো নম্বর দেওয়া যায় না। খাতায় যা লিখেছে শিক্ষার্থীরা, সেটি অনুযায়ী নম্বর পেয়েছে। তারপরও যদি কেউ সন্দেহ-সংশয় থেকে খাতা চ্যালেঞ্জ করে, তার খাতা পুনরায় মূল্যায়ন করে দেখা হবে।’

কোনো যুক্তিতেই ফেল গ্রহণযোগ্য নয়: শিক্ষাবিদ

বর্তমানে যে সৃজনশীল কারিকুলামে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা চলছে, তা প্রণয়নে সামনের সারিতে ছিলেন অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক। ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রশ্ন কঠিন কিংবা কঠোরভাবে খাতা মূল্যায়ন-যেটিই বলেন না কেন, কোনোভাবেই ফেল গ্রহণযোগ্য নয়।’

প্রবীণ এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে নির্বাচনি পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ফরম পূরণ করলো। এরপর আরও তিনমাস সে প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু বোর্ড পরীক্ষায় এসে এক-দুই বা তার বেশি সাবজেক্টে ফেল করলো? কেন ফেল করলো, কীভাবে এটা সম্ভব?’

বিদ্যালয় পর্যায়ে ক্লাসে শেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দুর্বলতা ও অবহেলা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কারিকুলামে যেভাবে শেখানোর কথা, সেভাবে শেখালে কেউ ফেল করার কথা নয়। প্রথমত, কারিকুলাম নামমাত্র মানে; দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তারা মানসম্মত উপায়ে ক্লাসে পড়াতে পারেন না। আর সবশেষ যেটা সমস্যা তা হলো শিক্ষকরা বেতন-ভাতা কম পাওয়ায় নিজ পেশায় মনোযোগ কম দেন। এতে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়াতেও তারা অবহেলা করেন।’

এ কারণে প্রস্তুতির ব্যাপক ঘাটতি নিয়েই এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় বসে হোঁচট খাচ্ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বলে মনে করেন এ শিক্ষাবিদ।

ফেল কমাতে করণীয় কী, যা ভাবছে বোর্ড

যারা খারাপ করলো, তারা ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল কেন তা খতিয়ে দেখা হবে। কীভাবে মানবিকের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়েও আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।-আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি সৈয়দ আক্তারুজ্জামান 

প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় কিছু বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করছে। ফল প্রকাশের সময় ফেলের কারণ অনুসন্ধান করা হবে বলে জানানো হলেও বাস্তবে তা ঠিকঠাক করা হয় না। এতে প্রতিবছরই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। শিক্ষার্থীরা ফেল করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। থেমে যাচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবন।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ড চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার তো মানবিকে সমস্যাটা বেশি। ব্যবসায় শিক্ষার ছাত্র-ছাত্রীদেরও সমস্যা আছে। আর সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো মাদরাসায়।’

তিনি বলেন, ‘যারা খারাপ করলো, তারা ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল কেন তা খতিয়ে দেখা হবে। কীভাবে মানবিকের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়েও আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

 

এএএইচ/এএসএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow