দুবলহাটি রাজবাড়ির নীরব কান্না

আশরাফুল ইসলাম আকাশ আমার ছুটি চলছে। অবসরে ঘোরাঘুরি করে কাটিয়ে দিই। এর মধ্যে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হলো। কী এক জটিলতা! নানা অনিশ্চয়তা নিয়েই চারমাথা বাসট্যান্ডে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি কোনো বাস নেই। কিছু বাস হাইওয়ের পাশে থাকলেও সেসবের ইঞ্জিন বন্ধ। এখন কী করি? বাসা থেকে যেহেতু ঘুরতে বের হয়েছি। এর শেষ দেখে ছাড়বো! ঘণ্টাখানেক যেতেই নতুন সিদ্ধান্ত। লোকাল বাস চালু হবে। তবে একটা শর্তে; যাত্রীদের ভাড়া গুনতে হবে তিনগুণ। যারা দূরপাল্লায় যাবে তারাও নিরুপায়; সঙ্গে আমিও। মিনিবাসের শেষদিকে একটা সিট জুটলো। বগুড়া থেকে নওগাঁ যাওয়ার অসংখ্য ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছে। দেড়ঘণ্টার যাত্রা শেষ করে নওগাঁ বাস টার্মিনালে পৌঁছলাম। একে তো বড় দিন, তার ওপর তীব্র রোদের বেলা। নওগাঁয় নেমে কিছু পথ পায়ে হেঁটে গেলাম গোশত হাটিতে। সেখান থেকে একটা ব্যাটারিচালিত টেসলা নিয়ে রওয়ানা করেছি দুবলহাটি গ্রামে। এই গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট এক পুরাতন রাজবাড়ি। আর সেটা হলো দুবলহাটি রাজবাড়ি। রোমান সাম্রাজ্যের নকশায় যেখানে ছিল জমিদারি শাসনের গৌরব। তবে অযত্নে-অবহেলায় সেই রাজকীয় দালানের এখন বেহাল দশা। কিন্তু আজও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের দেওয়ালে! ট

দুবলহাটি রাজবাড়ির নীরব কান্না

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

আমার ছুটি চলছে। অবসরে ঘোরাঘুরি করে কাটিয়ে দিই। এর মধ্যে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হলো। কী এক জটিলতা! নানা অনিশ্চয়তা নিয়েই চারমাথা বাসট্যান্ডে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি কোনো বাস নেই। কিছু বাস হাইওয়ের পাশে থাকলেও সেসবের ইঞ্জিন বন্ধ। এখন কী করি? বাসা থেকে যেহেতু ঘুরতে বের হয়েছি। এর শেষ দেখে ছাড়বো! ঘণ্টাখানেক যেতেই নতুন সিদ্ধান্ত। লোকাল বাস চালু হবে। তবে একটা শর্তে; যাত্রীদের ভাড়া গুনতে হবে তিনগুণ। যারা দূরপাল্লায় যাবে তারাও নিরুপায়; সঙ্গে আমিও। মিনিবাসের শেষদিকে একটা সিট জুটলো। বগুড়া থেকে নওগাঁ যাওয়ার অসংখ্য ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছে। দেড়ঘণ্টার যাত্রা শেষ করে নওগাঁ বাস টার্মিনালে পৌঁছলাম।

একে তো বড় দিন, তার ওপর তীব্র রোদের বেলা। নওগাঁয় নেমে কিছু পথ পায়ে হেঁটে গেলাম গোশত হাটিতে। সেখান থেকে একটা ব্যাটারিচালিত টেসলা নিয়ে রওয়ানা করেছি দুবলহাটি গ্রামে। এই গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট এক পুরাতন রাজবাড়ি। আর সেটা হলো দুবলহাটি রাজবাড়ি। রোমান সাম্রাজ্যের নকশায় যেখানে ছিল জমিদারি শাসনের গৌরব। তবে অযত্নে-অবহেলায় সেই রাজকীয় দালানের এখন বেহাল দশা। কিন্তু আজও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের দেওয়ালে!

টেসলা থেকে নেমেই বাড়ির প্রবেশপথে চোখ আটকে গেল। কাঁচা সড়ক পেয়েছে পিচের ছোঁয়া। হাতের ডানপাশে বড় এক সিঁড়ি নেমে গেছে। যার শেষপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই বিশাল এক দিঘির জলরাশি দুই পায়ের পাতাকে স্পর্শ করছে। দিঘি থেকে নববধূ কিংবা অপরূপা কেউ স্নান করে রাজপ্রাসাদের পথে পা বাড়ালে মুগ্ধ হতো নিশ্চয়ই। কারণ প্রবেশপথটা সেভাবেই সাজানো হয়েছিল। রোমান স্টাইলের বিশাল বিশাল সেই পিলার। এই পিলারেই গড়ে উঠেছিল রাজা কৃষ্ণনাথের সাম্রাজ্য!

raj

রাজবাড়ির প্রবেশপথ ধরে একটু এগোলেই চারপাশে পুরোনো তৃণভূমি। কিছুটা দূরে ধসে পড়া পিলার, মাটির ভাঙা টিলায় ছড়ানো ইট। প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝতে পারছিলাম, এই স্থাপনাটা এখন স্রেফ ইতিহাসের খসে পড়া কান্না। দুবলহাটি রাজবাড়ি প্রায় ২০০ বছর পূর্বে নির্মিত হয়েছিল। একটা সময় এই রাজবাড়ি ছিল জমিদারদের অধিকার ও শক্তির প্রতীক। এখানে বসতো প্রশাসনিক কাজের দরবার। আর সেনা-সৈনিক, অতিথি-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তো এর অংশ ছিলেনই।

কিন্তু আজ? দৃশ্যটা ভিন্ন। ছাদ ভেঙে আছে, অনেক দেওয়াল পড়ে গেছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব চোখে পড়ে। রাজবাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়লো দোতলা ভবনের ভগ্নাংশ। মনে হয়, কোনো একসময় এই দেওয়ালগুলো মানুষের সঙ্গে হেসে-খেলে কথা বলতো। রাজা ও অতিথিরা, পরিবেশনকারী ও দরবারিরা এখানে মিলিত হতেন। প্রাসাদের অভ্যন্তরীণ পথগুলো এখন আর পুরোনো রঙিন কাঁচ বা নকশাযুক্ত নেই—তার বদলে ময়লা, পোড়া-ছড়া অংশ ছাড়া কিছুই নয়!

এদের মাঝে কিছু কক্ষ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার চারপাশে ছাদ নেই, জানালা-দরজা নেই। এই দেওয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারতো, কত গল্প বলতো? রাজপরিবারের পারিবারিক আয়োজন, দরবার চলছে, অতিথি আসছে, স্কুল-সেমিনার হচ্ছে কিংবা সকালের নাস্তা; সেইসব ছবি আর শব্দ আজ কেবল বাতাসে ভাসে।

ধসে যাওয়া সিঁড়ি বেয়ে কিছুটা ওপরের দিকে উঠে এলাম। দোতলার পুরোনো এক কক্ষে দাঁড়িয়ে মনে হলো যেন আগেও কেউ এখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন ওই কক্ষেই সৌখিন আলোকসজ্জা ছিল—রঙিন কাঁচের শৌচালয়, খচিত-সজ্জিত ভগ্ন-কাঠ। সেসব আজ শুধু ছায়া, স্থবিরতা আর স্নানের পোড়ামাটির গন্ধ।

raj

দুবলহাটি রাজবাড়ির ইতিহাস খুব সমৃদ্ধ। ইতিহাস বলছে, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের কাছ থেকে পত্তন নিয়ে রাজপরিবারের রাজত্ব শুরু করেন রাজা কৃষ্ণনাথ রায় চৌধুরী। রাজপরিবারের এই ঐতিহ্যবাহী ভূমি দীর্ঘদিনে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে সামাজিক, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছে।

রাজা-পরিবার শুধু নিজস্ব বাসস্থান হিসেবে রাজবাড়ি ব্যবহার করেনি—তাদের তত্ত্বাবধানে দুবলহাটি গ্রামে দিঘি, মন্দির, বিদ্যালয় ও অন্যান্য দাতব্য-গ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হতো। সাধারণ মানুষের জন্য তারা বিনা খরচে শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন—এটা কোনো ছোট বা স্বল্প উদ্যোগ ছিল না। বরং সমাজকে সহযোগিতার এক বড় উদ্যোগ। এই রাজবাড়ির স্থাপত্যশৈলী ছিল তৎকালে যথেষ্ট উন্নত: রঙিন কাঁচ, প্রাসাদের বহুসংখ্যক কক্ষ, সপ্তাহভাগে আলাদা আলাদা উদ্দেশ্যে সাজানো ঘর—সবকিছু মিলিয়ে একসময় এটি ছিল সত্যিকারের রাজপরিবারের অভিজাত বসবাস।

ছাদশূন্য ঘর থেকে যদি চোখ তুলে তাকাই, তাহলে মনে হয়, সেই রাজা-রাজা আবার ফিরে এসেছে—অতিথিদের আদর করছেন, দরবার করছেন, শিক্ষা-সেবা নিয়ে ভাবছেন। সেই সময়ের প্রাসাদে শিক্ষা ও সংস্কৃতি খুব উঁচুস্তরে ছিল, আর এখানে কোনো একদিন শিশু-শিক্ষার্থীদের হাসির শব্দ বাজতো, মন্দির থেকে স্তব ও প্রার্থনার সূচনা হতো। রাজপরিবারের অতিথিরা আনন্দে মিলিত হতেন—এসব কল্পনাই আজকের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে।

দীর্ঘদিন ধরে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় রাজবাড়ির কিছু অংশ ধসে গেছে এবং মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—এই ইতিহাস কি হারিয়ে যাচ্ছে? স্থানীয়রা বহুবার চেষ্টা করেছেন রাজবাড়ি বাঁচানোর জন্য কিন্তু সরকারি উদাসীনতা ও অর্থায়নের অভাব সবকিছুকে ঝুঁকির মুখে রেখেছে। তখন মনে হয়—ইতিহাসের স্মৃতি যখন নিজের আয়ুর শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়; তখন আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দেখি—তার আগের যাত্রা ভুলে যাই।

raj

এই রাজবাড়ির জীবনের প্রবাহটা আর আগের মতো নেই—জমিদারি বিলুপ্ত হওয়া আর সামাজিক পরিবর্তনের ফলে রাজপরিবারের উত্তরসূরীরা এঁদের বাড়ি ছেড়ে চলে যান। আর রাজবাড়িটি আজ শুধু একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত নিদর্শনে পরিণত হয়েছে, যেখানে সময় নিজেই তার কঠিন পদক্ষেপ নিয়ে ধুলোয় মিলছে প্রত্নকীর্তি।

রাজবাড়ির গেট থেকে বেরিয়ে—পেছনের প্রাচীরগুলোকে এক বিবর্ণ স্মৃতি মনে হয়। কোথাও কোথাও কিছু টিলার ওপর বসে আছে কবুতর, ছাদছাড়া দেওয়ালের ওপর সন্ধ্যার সূর্য ঢলে পড়ছে। এই রাজবাড়ির একেকটি কোণা যেন আজও সেকালের গল্প বলে—কীভাবে একসময়ে খচিত-সজ্জিত দেউল ছিল, কীভাবে রাজা-রাজরাদের পায়ে পা জড়িয়ে অনুরাগীরা দাঁড়াতো, কীভাবে দরবার চলতে থাকতো; সেই সব ছবি এখনো বাতাসে ভাসছে।

এমন কোনো স্থাপনাই যদি চোখ বন্ধ করে গল্প বলে, তাহলে মনে হয়—এই রাজবাড়ি শুধু পুরোনো ভবন নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। ইতিহাস কোনো বইয়ে আটকে থাকে না—টুকরো ইট, ভাঙা দেওয়াল, তরঙ্গহীন দিঘি, আর সব মিলিয়ে গায়ে শিহরণ জাগানো অনুভূতিতে ইতিহাস বাঁচে। দোতলা রাজবাড়ির ওই স্থানে দাঁড়িয়ে সে অনুভূতি বারবার ফিরে আসে।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow