দুর্নীতির অর্থের পেছনে রাষ্ট্রের দীর্ঘ দৌড়

দুর্নীতি কোনো দেশের জন্য নতুন সমস্যা নয়। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই কোনো না কোনো সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে দুর্নীতির চরিত্র বদলে গেছে। এখন আর দুর্নীতির অর্থ দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; কয়েকটি ব্যাংক লেনদেন, অফশোর কোম্পানি কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা মুহূর্তেই সীমান্ত পেরিয়ে যায়। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা বিচারের মুখোমুখি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্রকে তখন শুরু করতে হয় আরও কঠিন এক অভিযান—লুট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের অভিযান। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং বিদেশে গড়ে ওঠা বিপুল সম্পদের প্রশ্ন নতুন করে জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—যদি সত্যিই রাষ্ট্রের অর্থ বিদেশে পাচার হয়, তবে তা কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব? প্রশ্নটি যেমন যৌক্তিক, উত্তরটিও ততটাই জটিল। বাস্

দুর্নীতির অর্থের পেছনে রাষ্ট্রের দীর্ঘ দৌড়

দুর্নীতি কোনো দেশের জন্য নতুন সমস্যা নয়। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই কোনো না কোনো সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে দুর্নীতির চরিত্র বদলে গেছে। এখন আর দুর্নীতির অর্থ দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; কয়েকটি ব্যাংক লেনদেন, অফশোর কোম্পানি কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা মুহূর্তেই সীমান্ত পেরিয়ে যায়। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা বিচারের মুখোমুখি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্রকে তখন শুরু করতে হয় আরও কঠিন এক অভিযান—লুট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের অভিযান।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং বিদেশে গড়ে ওঠা বিপুল সম্পদের প্রশ্ন নতুন করে জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—যদি সত্যিই রাষ্ট্রের অর্থ বিদেশে পাচার হয়, তবে তা কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব? প্রশ্নটি যেমন যৌক্তিক, উত্তরটিও ততটাই জটিল।

বাস্তবতা হলো, দুর্নীতির অর্থ পুনরুদ্ধার কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; এটি অনেকটা ম্যারাথনের মতো দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং অনিশ্চয়তায় ভরা একটি প্রক্রিয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ লড়াই দশকব্যাপীও হতে পারে। কারণ অর্থ পাচারকারীরা সাধারণত এতটাই পরিকল্পিতভাবে অর্থ স্থানান্তর করেন যে প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দুর্নীতির অর্থ বিদেশে নেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি, অতিমূল্যায়িত বা কম মূল্যায়িত বিল, অফশোর কোম্পানি, বেনামি সম্পদ ক্রয়, করস্বর্গে বিনিয়োগ এবং আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ সঞ্চয়। এসব ক্ষেত্রে অর্থের প্রকৃত মালিককে আড়াল করার জন্য বহুস্তরবিশিষ্ট আর্থিক কাঠামো ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক জগতে একে বলা হয় ‘লেয়ারিং’—অর্থাৎ এমনভাবে টাকার পথ ঘুরিয়ে দেওয়া, যাতে তার উৎস অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উন্নয়ন কার্যক্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যে অর্থ একটি হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা যদি বিদেশে বিলাসবহুল বাড়ি কেনার কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। তাই অর্থ উদ্ধার মানে শুধু টাকা ফেরত আনা নয়; এটি জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারেরও প্রশ্ন।

ফলে যখন কোনো রাষ্ট্র সেই অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়, তখন তাকে শুধু একটি ব্যাংক হিসাব নয়, বরং বিভিন্ন দেশ, কোম্পানি, ট্রাস্ট, বিনিয়োগ এবং সম্পত্তির জটিল নেটওয়ার্ক অনুসরণ করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, একটি দেশের দুর্নীতির অর্থ পাঁচ বা ছয়টি দেশের মধ্য দিয়ে ঘুরে শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো দেশের সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তদন্ত কার্যক্রম আর কেবল জাতীয় বিষয় থাকে না; তা আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। নাইজেরিয়ার সাবেক সামরিক শাসক সানি আবাচার বিরুদ্ধে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচারের অভিযোগ ছিল। তার মৃত্যুর পর নাইজেরিয়া সরকার প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন দেশে আইনি লড়াই চালিয়ে ধাপে ধাপে অর্থ ফেরত আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু সেই অর্থ উদ্ধার করতে যে সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা নিজেই একটি বড় শিক্ষা।

ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফের্দিনান্দ মার্কোসের পরিবারের সম্পদ উদ্ধারের প্রচেষ্টাও কয়েক দশক ধরে চলেছে। একইভাবে মালয়েশিয়ার বহুল আলোচিত ওয়ান এমডিবি কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দক্ষ তদন্ত এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া দুর্নীতির অর্থ পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্যান্য তদন্ত সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা অপরিহার্য। কারণ কোনো দেশের আদালত বা ব্যাংক শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পদ জব্দ করে না। তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়, অর্থের উৎস দেখাতে হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

এখানেই শুরু হয় রাষ্ট্রের দীর্ঘ দৌড়।

অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। তারা আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে, মামলার সময় বাড়ায়, সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক তোলে কিংবা সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে রাষ্ট্রকে শুধু তদন্ত নয়, আন্তর্জাতিক আদালত, সালিশি প্রক্রিয়া এবং কূটনৈতিক পর্যায়েও সমানভাবে সক্রিয় থাকতে হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন দুর্নীতির অর্থ পুনরুদ্ধার এত গুরুত্বপূর্ণ?

এর উত্তর অর্থনৈতিক যেমন, তেমনি নৈতিকও। রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উন্নয়ন কার্যক্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যে অর্থ একটি হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা যদি বিদেশে বিলাসবহুল বাড়ি কেনার কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। তাই অর্থ উদ্ধার মানে শুধু টাকা ফেরত আনা নয়; এটি জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারেরও প্রশ্ন।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আমাদের মনে রাখতে হবে। দুর্নীতির অর্থ ফেরত আনার চেয়ে তা পাচার হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর। কারণ একবার অর্থ বিদেশে চলে গেলে সেটি ফেরত আনতে বছরের পর বছর সময় লেগে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই পুরো অর্থ আর কখনও ফিরে আসে না।

সুতরাং রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ডিজিটাল আর্থিক নজরদারি, সম্পদের বাধ্যতামূলক ঘোষণাপত্র, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্বাধীন তদন্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি পরিবর্তন হতে পারে, সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি কার্যকর ও স্বাধীন থাকে, তাহলে দুর্নীতির সুযোগ অনেক কমে যায়।

এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বহু আলোচিত দুর্নীতির ঘটনা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে। পানামা পেপারস, প্যান্ডোরা পেপারস কিংবা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা দেখেছি, কীভাবে গোপন সম্পদ ও অর্থপাচারের জাল উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য অধিকার এবং নাগরিক নজরদারি দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো যাবে না। যদি তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। বিদেশি আদালত ও সংস্থাগুলোও তখন সংশ্লিষ্ট দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা অর্থ পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে অপরিহার্য।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। অনেক সময় বড় কোনো অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে না। এতে হতাশা তৈরি হয়। তাই তদন্ত, সম্পদ শনাক্তকরণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।

আসলে দুর্নীতির অর্থের পেছনে রাষ্ট্রের দীর্ঘ দৌড় কেবল অর্থ উদ্ধারের গল্প নয়; এটি ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। যে রাষ্ট্র নিজের লুট হওয়া সম্পদের খোঁজে অবিচল থাকে, সে রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছে একটি বার্তা দেয়—জনগণের সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এর প্রতিটি টাকার হিসাব দিতে হবে।

আজকের বিশ্বে অর্থ লুকানোর কৌশল যত আধুনিক হচ্ছে, তা শনাক্ত করার প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও তত শক্তিশালী হচ্ছে। ফলে দুর্নীতিবাজদের জন্য পৃথিবী আগের মতো নিরাপদ আশ্রয়স্থল আর নেই। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু কত টাকা উদ্ধার হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন দুর্নীতিবাজরা বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে অবৈধ সম্পদের কোনো নিরাপদ গন্তব্য নেই; দেশের ভেতরে নয়, দেশের বাইরেও নয়। যে দিন এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন দুর্নীতির অর্থের পেছনে রাষ্ট্রের দীর্ঘ দৌড় কেবল একটি অনুসন্ধান নয়, একটি সভ্য ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের মাইলফলকে পরিণত হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow