দূষণে জর্জরিত দেশ, পরিবেশ আদালতে মামলার খরা
ঢাকার আকাশে ধুলা আর বিষাক্ত কণার ঘন স্তর। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো শিল্পবর্জ্যে কালো হয়ে গেছে বহু আগেই। বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার, শহরজুড়ে শব্দদূষণের অসহনীয় মাত্রা, আর শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। পরিবেশ দূষণের এই বহুমাত্রিক সংকটে দেশের লাখো মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকলেও পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত বিশেষ আদালতে মামলার সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কম। বিশ্বের পরিবেশগত পারফরম্যান্স মূল্যায়নকারী বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই)-২০২৪’ অনুযায়ী, পরিবেশ সুরক্ষায় ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। অথচ পরিবেশ রক্ষার জন্য দেশে বিদ্যমান বিশেষ আদালতগুলো কার্যত পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকার রাস্তায় উড়ছে ধুলোবালি। নাক-মুখ চেপে চলতে হয় পথচারীদের, ফাইল ছবি দূষণের চিত্র ভয়াবহ, আদালতে মামলার সংখ্যা নগণ্য পরিবেশবাদীদের মতে, দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে কোনো না কোনো ধরনের পরিবেশগত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। নদী দখল ও দূষণ
ঢাকার আকাশে ধুলা আর বিষাক্ত কণার ঘন স্তর। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো শিল্পবর্জ্যে কালো হয়ে গেছে বহু আগেই। বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার, শহরজুড়ে শব্দদূষণের অসহনীয় মাত্রা, আর শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। পরিবেশ দূষণের এই বহুমাত্রিক সংকটে দেশের লাখো মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকলেও পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত বিশেষ আদালতে মামলার সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কম।
বিশ্বের পরিবেশগত পারফরম্যান্স মূল্যায়নকারী বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই)-২০২৪’ অনুযায়ী, পরিবেশ সুরক্ষায় ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। অথচ পরিবেশ রক্ষার জন্য দেশে বিদ্যমান বিশেষ আদালতগুলো কার্যত পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকার রাস্তায় উড়ছে ধুলোবালি। নাক-মুখ চেপে চলতে হয় পথচারীদের, ফাইল ছবি
দূষণের চিত্র ভয়াবহ, আদালতে মামলার সংখ্যা নগণ্য
পরিবেশবাদীদের মতে, দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে কোনো না কোনো ধরনের পরিবেশগত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। নদী দখল ও দূষণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য, ইটভাটার কালো ধোঁয়া, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, অবৈধ পলিথিনের ব্যবহার, নির্মাণসামগ্রী থেকে সৃষ্ট ধুলা এবং যানবাহনের ধোঁয়া—সব মিলিয়ে পরিবেশের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
কিন্তু এই বাস্তবতার সঙ্গে পরিবেশ আদালতের পরিসংখ্যানের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আদালতসংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, ঢাকার মূল পরিবেশ আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ২৩১টি। এর মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা মাত্র ১৩২টি। অর্থাৎ আদালতের মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৯৮ শতাংশই অন্য ধরনের মামলা।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৪ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে করা মাত্র দুটি মামলা ঢাকার পরিবেশ আদালতে পাঠানো হয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনটিতে। পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় ২৩ বছরে মোট মামলা হয়েছে ৫৯২টি, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৭৬টি।
ঢাকার পরিবেশ আদালত, ছবি: জাগো নিউজ
পরিবেশ আদালতে কেন যাচ্ছে না পরিবেশের মামলা?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিদ্যমান আইনি কাঠামো।
পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারেন না। প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ করতে হয়। অধিদপ্তরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন ছাড়া আদালতে মামলা গ্রহণের সুযোগ নেই।
ফলে সাধারণ নাগরিকের বিচারপ্রাপ্তির পথ দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগকারীরা প্রক্রিয়াগত জটিলতা, সময়ক্ষেপণ কিংবা প্রশাসনিক বাধার কারণে আইনি লড়াইয়ে এগোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, পরিবেশ দূষণের শিকার ব্যক্তি সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হতে না পারায় বহু অপরাধই বিচারের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
সব জেলায় হবে পরিবেশ আদালত, বিভাগে আপিল
‘মামলায় আগ্রহ নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের’
পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশের নির্দেশ
বছরজুড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, তবু কমে না দূষণ
ভ্রাম্যমাণ আদালতনির্ভর প্রয়োগ, কমছে নিয়মিত মামলা
পরিবেশ অধিদপ্তর বর্তমানে পরিবেশ আইন প্রয়োগে মূলত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর নির্ভরশীল। অবৈধ ইটভাটা, কালো ধোঁয়া, শব্দদূষণ, পলিথিন ব্যবহার, পাহাড় কাটা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়।
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তি হিসেবে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়। পরিবেশ আদালতের নিষ্পত্তি করা মামলাগুলোর বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বেশিরভাগ মামলায় আসামিদের জরিমানা করা হয়েছে, কারাদণ্ডের নজির তুলনামূলক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক জরিমানা কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। কারণ আদালতের রায় ভবিষ্যতের জন্য নজির তৈরি করে এবং অপরাধীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে।
ঢাকার পরিবেশ আপিল আদালত, ছবি: জাগো নিউজ
আপিল আদালতেও একই চিত্র
ঢাকার পরিবেশ আপিল আদালতের পরিস্থিতিও খুব একটা ভিন্ন নয়। বর্তমানে সেখানে বিচারাধীন পরিবেশসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা মাত্র সাতটি। অন্যদিকে একই আদালতে অন্যান্য ধরনের বিচারাধীন মামলা রয়েছে প্রায় দেড় হাজার।
গত বছর আপিল আদালতে নতুন পরিবেশ মামলা এসেছে মাত্র পাঁচটি। এর আগের বছর ছিল আটটি।
যদিও আদালত সূত্র বলছে, বিচারাধীন কোনো পরিবেশ মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে নেই।
আরও পড়ুন
ঢাকায় বায়ুদূষণ কমছে না, দায়ী নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা
নাকের ডগায় ৩০০ অবৈধ ইটভাটা, জরিমানায় দায় সারছে প্রশাসন
১৩ বছরের জানুয়ারিতে একদিনও নির্মল বাতাস পায়নি রাজধানীবাসী
অতিমাত্রায় শব্দ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে
চট্টগ্রামের আদালতে দীর্ঘসূত্রতা
জানা যায়, দেশের আরেকটি পরিবেশ আদালত চট্টগ্রামে। সেখানে পরিবেশসংক্রান্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৪টি। এর মধ্যে ২৮টি মামলা পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন।
এ তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়, পরিবেশ আদালতের সংখ্যা যেমন সীমিত, তেমনি বিদ্যমান আদালতগুলোর সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ঢাকার আদালত, ছবি: জাগো নিউজ
আদালতের সংখ্যা কি পর্যাপ্ত?
বর্তমানে কার্যকর পরিবেশ আদালত রয়েছে মাত্র তিনটি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে। এছাড়া ঢাকায় একটি পরিবেশ আপিল আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রায় ১৮ কোটির দেশে এই সংখ্যা যে একেবারেই অপ্রতুল, তা মনে করেন আইনজ্ঞ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অন্তত প্রতিটি জেলায় একটি করে পরিবেশ আদালত থাকা উচিত ছিল। কারণ পরিবেশগত অপরাধ এখন আর শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক নয়; জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও দূষণের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে।
নাগরিকদের সম্পৃক্ততা ছাড়া সমাধান নেই
আইনজীবীরা বলছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের একার পক্ষে দেশের সব ধরনের পরিবেশ অপরাধ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য সাধারণ নাগরিক, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
এতে, যত বেশি মানুষ পরিবেশগত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান আইন সেই সুযোগ সীমিত করে রেখেছে।
অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব, ছবি: সংগৃহীত
‘পরিবেশ আদালতকে কার্যকর করতে আইনি সংস্কার জরুরি’
ঢাকা মহানগর আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, পরিবেশ দূষণ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। কিন্তু যে বিচারিক কাঠামো পরিবেশ রক্ষার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে, তা এখনো জনগণের জন্য পুরোপুরি সহজলভ্য নয়। বিদ্যমান পরিবেশ আদালত আইনে সাধারণ মানুষ সরাসরি মামলা করতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত অপরাধ বিচারিক প্রক্রিয়ায় পৌঁছায় না।
তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি যদি কোনো শিল্পকারখানার বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হন কিংবা কোনো নদী, খাল বা জলাশয় অবৈধভাবে দখল বা দূষণের শিকার হতে দেখেন, তাহলেও তিনি সরাসরি আদালতে প্রতিকার চাইতে পারেন না। তাকে প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বিচারপ্রাপ্তির পথ দীর্ঘ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা হতাশ হয়ে আইনি প্রক্রিয়া থেকে সরে যান।
মাহিয়া বিনতে মাহাবুব আরও বলেন, পরিবেশ আদালতের সংখ্যা দেশের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। ঢাকার বাইরে অধিকাংশ মানুষকে পরিবেশ সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য দূরবর্তী আদালতের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সময় ও ব্যয়ের কারণে অনেকের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। ফলে পরিবেশগত অন্যায়ের শিকার হয়েও অনেকে আদালতের দ্বারস্থ হন না।
আরও পড়ুন
ধুলিকণায় বিষাক্ত খুলনার বাতাস
শীতে খুসখুসে কাশি, ঠান্ডা লাগার সমস্যা নাকি দূষণের প্রভাব
দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ায় বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন ১০ লাখ মানুষ
তামাকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি টাকা
মাহিয়া বিনতে মাহাবুবের মতে, পরিবেশ আদালতকে আরও কার্যকর করতে হলে আইনে জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, পরিবেশবাদী সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে সরাসরি মামলা করার অধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগ বা জেলায় পর্যায়ক্রমে পরিবেশ আদালত স্থাপন, বিশেষায়িত বিচারক নিয়োগ এবং পরিবেশবিষয়ক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, পরিবেশের ক্ষতি শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে না দেখে সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কার্যকর আইন, শক্তিশালী আদালত এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সমন্বয়েই পরিবেশ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ, ই-বর্জ্য, রাসায়নিক বর্জ্য, শিল্প দূষণ এবং নগরায়ণের চাপ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে হবে। সেই সঙ্গে পরিবেশ আদালত কার্যকর করতে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই।
অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, ছবি: সংগৃহীত
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র ক্যাপসের চেয়ারম্যান ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, দেশে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলেও এ আদালত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। ফলে গত ১০ থেকে ১২ বছরে পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত থেকেছে। পরিবেশগত ক্ষতির শিকার হলেও অধিকাংশ মানুষ জানেন না কীভাবে এ আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, পরিবেশ আদালতের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন না। মামলা করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) বা তার মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এতে বিচারপ্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত একটি প্রশাসনিক ধাপ তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা এবং পরিবেশ আইন বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরও ঘাটতি রয়েছে। ফলে পরিবেশ সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো আদালতে যথাযথভাবে উপস্থাপন ও পরিচালনা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকার রাস্তায় উড়ছে ধুলোবালি। নাক-মুখ চেপে চলতে হয় পথচারীদের, ফাইল ছবি
প্রমাণ সংগ্রহের বিষয়টিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ কিংবা বর্জ্য পোড়ানোর মতো অপরাধগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষণস্থায়ী। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দূষণের আলামত অনেক সময় আর পাওয়া যায় না। এতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি উত্তরণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিবেশ আদালতে মামলার পদ্ধতি সহজ করতে হবে এবং গণবিজ্ঞপ্তি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে আদালতটির কার্যক্রম পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে পরিবেশ ক্যাডার চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিটি উপজেলায় একজন করে পরিবেশ কর্মকর্তা থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশগত অপরাধ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং প্রমাণ সংগ্রহ অনেক সহজ হবে।
অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়। শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, নগর উন্নয়ন কিংবা যে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত ও আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ঢাকার রাস্তায় উড়ছে ধুলোবালি। নাক-মুখ চেপে চলতে হয় পথচারীদের, ফাইল ছবি
সংস্কারের অপেক্ষায় পরিবেশ বিচারব্যবস্থা
পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলা করার সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিবেশ অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারপ্রাপ্তি সহজ করার লক্ষ্যে আইন সংশোধনের একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংস্কার বাস্তবায়িত হলে পরিবেশ আদালতগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। অন্যথায় দূষণ বাড়বে, ভুক্তভোগীর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা কমই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের পরিবেশ সংকট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা মোকাবিলায় কেবল অভিযান বা জরিমানা নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী ও জনগণের জন্য উন্মুক্ত একটি পরিবেশ বিচারব্যবস্থা। আর সে কারণেই পরিবেশ আদালত আইন সংস্কারের দাবি এখন শুধু আইনগত নয়, পরিবেশ রক্ষার অপরিহার্য শর্ত হিসেবেই সামনে আসছে।
এমডিএএ/এমএমএআর/এমএফএ
What's Your Reaction?