দেলোয়ার হোসাইন খানের গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা
অভিশাপলিপি তুমি আমার বুকে অদৃশ্য শিলালিপি যেখানে প্রতিটি বর্ণ খোদিত যন্ত্রণায় আমি পাঠ করি নীরবতায় মুছতে পারি না কোনোদিন কারণ স্মৃতির ক্ষরণে পাথরও একসময় রক্তাক্ত হয়। আমার ভালোবাসা আজ দিগভ্রান্ত নাবিক অচেনা নক্ষত্রমণ্ডলীর মানচিত্রে পথ খোঁজে তোমার নির্লিপ্ত দৃষ্টি সমুদ্রের মতো— অগাধ অথচ তীরে ভিড়তে দেয় না কোনো আর্ত প্রার্থনা। তুমি আমার জন্য অনধিগম্য গিরিশৃঙ্গ চূড়ায় স্থাপিত স্বপ্নের সমাধিফলক আমি প্রতিদিন আরোহণ করি ব্যর্থতার ঢালে আর প্রতিটি পতনে হাড়ে হাড়ে ভাঙে প্রত্যাশার কর্কশতা। আমার হৃদয় এখন নিঃসঙ্গ নেক্রোপলিস যেখানে মৃত আশার সারি সারি ফলক তোমার একফোঁটা হাসি ছিল ক্ষণিক প্রসূন— আজ সে শুকিয়ে হয়ে গেছে স্মৃতির বিষাক্ত হার্বেরিয়াম। তুমি আমাকে চেনো না তবু আমি তোমার নাম বহন করি শিরায় শিরায়— যেমন বিষলতা নিজের আশ্রয়দাতা বৃক্ষকেই ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে। আমি জানি এই প্রেমের কোনো অভিষেক নেই আছে কেবল অবসানের অমোঘ দলিল তবু তাতে আমি স্বাক্ষর রাখি প্রতিদিন— কারণ প্রত্যাখ্যানই এখন আমার একমাত্র পরিচয়। দীপাঞ্জলি তোমার নয়নের অন্তঃসলিলে অগ্নিবর্ণ প্রদীপ জ্বলে, আমি তা
অভিশাপলিপি
তুমি আমার বুকে অদৃশ্য শিলালিপি
যেখানে প্রতিটি বর্ণ খোদিত যন্ত্রণায়
আমি পাঠ করি নীরবতায়
মুছতে পারি না কোনোদিন
কারণ স্মৃতির ক্ষরণে পাথরও একসময় রক্তাক্ত হয়।
আমার ভালোবাসা আজ দিগভ্রান্ত নাবিক
অচেনা নক্ষত্রমণ্ডলীর মানচিত্রে পথ খোঁজে
তোমার নির্লিপ্ত দৃষ্টি সমুদ্রের মতো— অগাধ
অথচ তীরে ভিড়তে দেয় না কোনো আর্ত প্রার্থনা।
তুমি আমার জন্য অনধিগম্য গিরিশৃঙ্গ
চূড়ায় স্থাপিত স্বপ্নের সমাধিফলক
আমি প্রতিদিন আরোহণ করি ব্যর্থতার ঢালে
আর প্রতিটি পতনে হাড়ে হাড়ে ভাঙে প্রত্যাশার কর্কশতা।
আমার হৃদয় এখন নিঃসঙ্গ নেক্রোপলিস
যেখানে মৃত আশার সারি সারি ফলক
তোমার একফোঁটা হাসি ছিল ক্ষণিক প্রসূন—
আজ সে শুকিয়ে হয়ে গেছে স্মৃতির বিষাক্ত হার্বেরিয়াম।
তুমি আমাকে চেনো না
তবু আমি তোমার নাম বহন করি শিরায় শিরায়—
যেমন বিষলতা নিজের আশ্রয়দাতা বৃক্ষকেই
ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে।
আমি জানি এই প্রেমের কোনো অভিষেক নেই
আছে কেবল অবসানের অমোঘ দলিল
তবু তাতে আমি স্বাক্ষর রাখি প্রতিদিন—
কারণ প্রত্যাখ্যানই এখন আমার একমাত্র পরিচয়।
দীপাঞ্জলি
তোমার নয়নের অন্তঃসলিলে অগ্নিবর্ণ প্রদীপ জ্বলে,
আমি তার শিখায় দগ্ধ নই—আমি সেই দহনে ধাতবীভূত।
প্রেম আমার কাছে উৎসব নয়—প্রেম দীর্ঘতর দীক্ষা,
যেখানে স্বত্বা ক্ষয়ে ক্ষয়ে নবরূপে পুনর্লিপ্ত।
তুমি নিকটে নও—তবু অনুপস্থিতির কুহকে
আমার উপস্থিতি খোদিত থাকে, নীরব অক্ষরে।
শূন্যতার গর্ভে গর্ভিত আমার সমস্ত প্রাপ্তির অভিসার,
অভাবের শিলালিপিতে উৎকীর্ণ প্রার্থনার ধ্বনি।
তোমার নাম উচ্চারণ না-করার মধ্যেই নামটি জ্বলে ওঠে,
নীরবতার স্তম্ভে দীপশিখা আঁকে নীলাভ ছায়া।
আমার অহংকারের মরুভূমিতে তুমি এক ক্ষীণ নদী,
যার স্পর্শে ধূলি অঙ্কুরিত হয় অনিবার্য সবুজে।
প্রেম এখানে দখল নয়—প্রেম আত্মসমর্পণের দহন,
নিজেকে ক্ষয় করে অপরের অস্তিত্বে অভিষেক।
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তুমি অনামা অক্ষর,
যে অক্ষরে লিখিত থাকে আমার সমগ্র অনুবাদ।
প্রতিচ্ছবি
তোমার দৃষ্টির দর্পণে আমি দেখি ভগ্নমূর্তি,
চূর্ণ অহংকারের কণায় কণায় পরিচয়ের রক্তক্ষরণ।
আমি যা নই—তারই দিকে আমাকে ঠেলে দেয় প্রেম,
কারণ অসম্পূর্ণতার মাঝেই পূর্ণতার প্রতিধ্বনি।
প্রেম কোনো অধিকার নয়—প্রেম আত্মসীমার অবক্ষয়,
যেখানে আমি নিজেকে ক্ষয় করি অপরের সত্তায়।
তুমি আমার পূর্ণতা নও—তুমি অপূর্ণতার শুদ্ধ দলিল,
তোমার চোখে শিখি নিজেকে অস্বীকারের বিদ্যা।
আমার ভেতরের অরণ্যে তুমি এক অনির্বচনীয় অগ্নিস্রোত,
যার উষ্ণতায় শীতল সংশয় ধীরে ধীরে গলে যায়।
আমি তোমাকে ধারণ করি না—আমি তোমাতে বিলীন,
ধারণার খাঁচা ভেঙে সত্তার আকাশে উড্ডীন।
তোমার নীরবতা আমার কান্নাকে অর্থ দেয়,
অর্থের ভারে কান্না পরিণত হয় ধ্যানের মতো।
এই প্রেমে বিজয় নেই—আছে দীর্ঘ অনুশীলন,
নিজেকে হারিয়ে অন্যকে পাওয়ার মর্মান্তিক সৌন্দর্য।
নৈঃশব্দ্য
তুমি গেলে—পৃথিবী শূন্য হলো না, শূন্য হলো আমার শব্দকোষ,
দৃশ্যেরা আজ আমার কাছে অনুবাদহীন শিলালিপি।
আকাশ নীলাভ শবপট্টে শুয়ে থাকে নিরুদ্বেগে,
ধুলো উড়ে আগের মতোই—তবু আমি পাঠোদ্ধারহীন।
বিচ্ছেদ মানে কেবল দূরত্ব নয়—বিচ্ছেদ ভাষাহীনতা,
যে ভাষায় চিনতাম আমরা পরস্পরের নাড়িনক্ষত্র।
স্মৃতি এখন নিস্পৃহ অভ্যাস—বেদনারও অধিকার নেই,
অভ্যাসের শীতলতাই আমার গভীরতম শোক।
আমার কণ্ঠে নামহীন স্তব্ধতা জমে ওঠে প্রতিরাতে,
শব্দ জন্মায়—অর্থের জন্ম হয় না।
আমি শিখছি বহন করতে অনুপস্থিতির ভার,
কারণ কিছু শূন্যতা পূরণযোগ্য নয়—বহনযোগ্য।
দিনগুলো আমার কাছে প্রশ্নের ফলক,
রাতগুলো উত্তরহীনতার দীর্ঘশ্বাস।
আমি হারাইনি তোমাকে—হারিয়েছি আমার ভাষা,
ভাষাহীন বেঁচে থাকা—এ আমার নিঃশব্দ দণ্ড।
অতল
তোমার অনুপস্থিতি শূন্যতা নয়—সে অতলাকার কুহর,
যেখানে স্মৃতিরা ডুবে যায় নিঃশ্বাসহীন অন্ধকারে।
আমি তোমাকে হারাইনি—হারিয়েছি সেই আমিকে,
যে তোমার দিকে ঝুঁকে থাকত দিগন্তের মতো।
আমার দিনগুলো ঈশ্বরহীন স্তোত্র—শব্দ আছে, অর্থের অস্থি নেই,
রাতগুলো দীর্ঘ প্রলাপ—কান্নাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
প্রতিটি সকাল আমাকে শেখায় সহাবস্থানের কৌশল,
অতলের কিনারায় দাঁড়িয়ে শ্বাস নেওয়ার বিদ্যা।
আমার হৃদয়ে প্রতিধ্বনি জমে ওঠে নীরবতার স্তূপে,
প্রতিধ্বনির ভারে হৃদয় ভারী—তবু ভাঙে না।
আমি স্মৃতিকে দোষ দিই না—স্মৃতি তো নদী,
ডুবিয়েই সে আমাদের সাঁতার শেখায়।
এই অতলে পড়ে থেকে আমি শিখি গভীরতা,
গভীরতার ভারে হালকা হয় ভ্রমের পালক।
তুমি নেই—তবু অনুপস্থিতির ছায়ায়
আমি নিজেকে নতুন নামে ডাকতে শিখি।
সহবাস
জীবন আমাকে বিজয়ের মুকুট দেয়নি—দিয়েছে কাঁটামুকুট,
প্রতিটি কাঁটা সীমারেখা—রক্তে আঁকা মানচিত্র।
ব্যর্থতা আমার দর্পণ—নির্মম স্বচ্ছতায় মুখোমুখি,
এই মুখোমুখিতাই আমাকে স্থির থাকতে শেখায়।
ভবিষ্যৎ ভীতির কারুকাজ—অতীতের ভাঙা ইটে গাঁথা আশ্রয়,
সেখানে আশ্রয় আছে—নিশ্চয়তা নেই।
সুখ কোনো বন্দরে নোঙর নয়—সুখ ক্লান্ত নাবিকের শপথ,
ঝড়ের মধ্যেও বৈঠা ছাড়বে না বলে।
প্রতিটি প্রাপ্তি ক্ষণিকের আশ্বাস,
প্রতিটি অপূর্ণতা দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা।
আমি শিখছি ক্ষুদ্র আনন্দে দীর্ঘ শ্বাস নিতে,
দীর্ঘ শ্বাসে ক্ষুদ্র দুঃখকে হালকা করতে।
জীবন প্রতিযোগিতা নয়—জীবন সহবাস,
ব্যর্থতার পাশে বসে থাকার নীরব অনুশীলন।
এই অনুশীলন আমাকে অপরাজেয় করে না,
কেবল সংযতভাবে দৃঢ় করে তোলে।
সম্ভাবনা
জীবন প্রতিশ্রুতি নয়—সে আধখোলা দ্বার,
চৌকাঠে ঝরে পড়ে প্রত্যাশার কোমল মিথ্যা।
প্রাপ্তি ক্ষণিকের আশ্বাস—অপূর্ণতা স্থায়ী শিক্ষক,
এই শিক্ষায় অহংকার ধীরে ধীরে ক্ষয়।
প্রতিটি দিন প্রশ্নের ফলক—চোখে ধরা না-পড়া খোদাই,
প্রতিটি রাত উত্তরহীনতার শীতল তপস্যা।
আমি তপস্যায় মহিমা খুঁজি না—খুঁজি ধৈর্য,
ধৈর্যে ক্ষুদ্র আলো জ্বলে অন্ধকারের কিনারে।
ভবিষ্যৎ কোনো মানচিত্র নয়—সে কুয়াশার রেখাচিত্র,
হাঁটতে হাঁটতেই পথের নাম জানা যায়।
ভ্রান্তি আমাকে দোষী করে না—ভ্রান্তি আমাকে শেখায়,
ভুলের মধ্যেই সঠিকের কণিকা উজ্জ্বল।
এই আধখোলা দ্বারে দাঁড়িয়ে আমি অপেক্ষা করি না—
আমি প্রবেশ করি প্রশ্ন নিয়েই।
প্রশ্নের ভারে হালকা হয় নিশ্চিতের অহং,
এই হালকাতেই জন্ম নেয় পথচলার শক্তি।
অবস্থা
স্তম্ভে খুঁজেছি ঈশ্বর—মিনারে খুঁজেছি চিহ্ন,
শাস্ত্রের জীর্ণ অক্ষরে পেয়েছি কেবল ছায়া।
পরে জেনেছি—তিনি অবস্থান নন, তিনি অবস্থা,
যেখানে আত্মা অহং ছিন্ন করে শূন্যতায় মিলিত।
প্রার্থনা আবেদন নয়—প্রার্থনা আত্মনমন,
অন্তর্গহনে অন্ধকারের কাছে নত হওয়া।
এই নত হওয়ায় আলো জন্মায়—অলৌকিক নয়,
শুধু কঠোরতার খোলস আলগা হয়।
আমি যত নত হই—তত হালকা হয় আমার ভার,
ভারহীনতায় শোনা যায় নীরব উচ্চারণ।
নামহীন সেই উচ্চারণে ভয় ক্ষয়ে যায়,
ভয় ক্ষয়ে গেলে জন্ম নেয় করুণা।
করুণা কোনো দান নয়—করুণা উপলব্ধি,
অপরের যন্ত্রণায় নিজের প্রতিধ্বনি।
এই উপলব্ধিতে ঈশ্বর দূরে নন—
তিনি নীরবতার ভেতরেই নিকটতর।
বিসর্জন
আত্মা বন্দী নয়—তবু দেহের কারাগারে অভ্যস্ত,
অভ্যস্ততার শেকলে গাঁথা দৈনন্দিন ভ্রম।
মুক্তি মানে পলায়ন নয়—মুক্তি জানালার দীক্ষা,
সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়েই অসীমের শ্বাস।
আমি জানালা খুললে বাতাস ঢোকে—ভয়ের ধুলো ঝরে,
আলোর স্পর্শে সংকীর্ণতা নরম হয়।
অহং নীরব হলে শোনা যায় অশব্দের মন্ত্র,
সেই মন্ত্রে সত্তা ও শূন্যতা মিলিত।
আমি কিছু চাই না—চাওয়াহীনতাই আমার প্রার্থনা,
প্রার্থনার ভারে হালকা হয় অন্তরের পাথর।
হালকাতায় জন্ম নেয় বিসর্জনের সাহস,
এই সাহসেই আমি নিজের বোঝা নামাই।
যা নামাই—তা হারাই না,
হারাই কেবল অপ্রয়োজনীয় ভার।
ভার নামলে পথ দেখা যায় স্পষ্টতর,
স্পষ্ট পথে হাঁটলেই অসীম নিকটে আসে।
What's Your Reaction?