দেশের ব্যাংকিং খাতে ছোট, বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় বিদেশি ব্যাংক
দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই সম্পন্ন হচ্ছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে দেশের মোট রপ্তানি বিলের ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি ব্যাংকগুলো। একই সময়ে মোট আমদানি বিল পরিশোধের ১৩ দশমিক ১ শতাংশও হয়েছে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত, ঋণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের এ চিত্র উঠে এসেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম সুদে আমানত পেলেও আস্থা ও উন্নত সেবার কারণে বিদেশি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের গ্রাহকেরা এসব ব্যাংকের প্রধান গ্রাহক। বৈশ্বিক ব্যাংকিং সেবা দ্রুত গ্রহণ, করপোরেট ব্যাংকিংয়ে দক্ষতা এবং ট্রেজারি কার্যক্রমের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো দেশে ভালো করছে। তাদের বিভিন্ন সেবা ও ব্যাংকিং সংস্কৃতি থেকে দেশীয় ব্যাংকগুলোও অনেক কিছু গ্রহণ করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের ৭০টি শাখা ও ৫টি উপশাখা রয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এইচএসবিসি ও স
দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই সম্পন্ন হচ্ছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে দেশের মোট রপ্তানি বিলের ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি ব্যাংকগুলো। একই সময়ে মোট আমদানি বিল পরিশোধের ১৩ দশমিক ১ শতাংশও হয়েছে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত, ঋণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের এ চিত্র উঠে এসেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম সুদে আমানত পেলেও আস্থা ও উন্নত সেবার কারণে বিদেশি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের গ্রাহকেরা এসব ব্যাংকের প্রধান গ্রাহক। বৈশ্বিক ব্যাংকিং সেবা দ্রুত গ্রহণ, করপোরেট ব্যাংকিংয়ে দক্ষতা এবং ট্রেজারি কার্যক্রমের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো দেশে ভালো করছে। তাদের বিভিন্ন সেবা ও ব্যাংকিং সংস্কৃতি থেকে দেশীয় ব্যাংকগুলোও অনেক কিছু গ্রহণ করছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের ৭০টি শাখা ও ৫টি উপশাখা রয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার ব্যাংব। অন্য ব্যাংকগুলো হলো- সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, উরি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও ব্যাংক আলফালাহ।
আমানতে কম খরচ, ঋণে সংকোচন
বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত গত এক বছরে সামান্য বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায়। তবে পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের আমানতের অংশ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের ধরনও দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় ভিন্ন। এসব ব্যাংকের মাত্র ১৬ শতাংশ আমানত স্থায়ী আমানত বা এফডিআর। বিপরীতে দেশীয় ব্যাংকগুলোর আমানতের ৪৮ শতাংশই এ ধরনের আমানত। বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৩৯ শতাংশ আমানত আসে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে, যেখানে দেশীয় ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ হার ২৯ শতাংশ।
এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের ১৭ শতাংশ রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি)। দেশীয় ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ২ শতাংশ। মূলত করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের খরচ তুলনামূলক কম।
তবে ঋণ বিতরণে গত বছর সংকোচন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায় নেমেছে। ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের অংশও ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
শিল্প ও কৃষিতে ঋণ বেড়েছে
ঋণ কমলেও শিল্প খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে তাদের ঋণ ছিল ২২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা।
কৃষি ও মৎস্য খাতেও ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে বিদেশি ব্যাংকের ঋণ ছিল ৭২৬ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা হয়েছে।
তবে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ঋণ কমেছে। ২০২৪ সালের ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায়।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। এর বড় কারণ ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঋণের প্রায় পুরোটাই খেলাপি হয়ে পড়া।
রপ্তানি-আমদানিতে শক্ত অবস্থান
বৈদেশিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবস্থান বেশ শক্ত। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এসব ব্যাংক ৩৭৩ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল সংগ্রহ করেছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১২ কোটি ডলারে। এতে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ তাদের মাধ্যমে এসেছে।
একই সময়ে আমদানি বিল পরিশোধের পরিমাণ ৩৮৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৪২৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশের মোট আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এখন এসব ব্যাংকের মাধ্যমে হচ্ছে। তবে রেমিট্যান্সে তাদের অংশ খুবই কম মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ।
২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা হয়েছে।
তবে মুনাফা ও অন্যান্য আয় বিদেশে পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে এ বাবদ বিদেশে পাঠানো হয়েছিল ৫৭৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে বেড়ে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা হয়েছে।
বড় ব্যাংকগুলোর মুনাফায় চাপ
অর্থনীতিতে ধীরগতির প্রভাব পড়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফায়ও। ২০২৫ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের নিট মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এইচএসবিসির মুনাফা ২৩ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা থেকে ৮২৩ কোটি টাকায় নেমেছে।
এ ছাড়া কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মুনাফা ৬০০ কোটি থেকে কমে ৫৭৬ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক এনএ বাংলাদেশের ৩৮৪ কোটি থেকে ৩২৮ কোটি টাকা এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ২৩০ কোটি থেকে ২০৭ কোটি টাকায় নেমেছে। হাবিব ব্যাংকের মুনাফাও ২৪ কোটি থেকে কমে ১৮ কোটি টাকা হয়েছে।
ইএআর/এসএনআর
What's Your Reaction?