কাজী নজরুল ইসলাম তার রচিত গানে কখনো প্রকাশ্যভাবে কখনো অনুভব-অনুষঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলেছেন। গান রচনার সময় তিনি কখনো রক্ষণশীলতার পরিচয় দেননি। গানে সম্প্রীতির বাণী প্রকাশ নজরুল ছাড়া তাঁর সমকালে আর কারো মধ্যে এইমাত্রায় দেখা যায় না। তিনি লিখেছেন:
‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥
এক সে দেশের মাটিতে পাই
কেউ গোরে কেউ শ্মশানে ঠাঁই,
মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান ॥’ (১৮ নং গান: সুর-সাকী)
বহুল পরিচিত এই গান ছাড়াও হিন্দু-মুসলিমের ঐক্য ও তাদের পারস্পারিক সম্প্রীতি কামনা করে নজরুল বহু গান লিখেছেন। সে সব থেকে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:
‘হিন্দু-মুসলমান দুটি ভাই
ভারতের দুই আঁখি-তারা
এক বাগানে দুটি তরু দেবদারু আর কদম-চারা॥ (৮০নং : সুরা-সাকী)
‘ভায়ে ভায়ে হেথা নাহি প্রেম-বোধ
কেবলি কলহ কেবলি বিরোধ,
দেয়ালের পরে তুলিয়া দেয়াল নিজেরা নিজেরা করিছে শেষ।
হে দেশ বিধাতা, দূর কর এই লজ্জা ও গ্লানি, এ দীন বেশ। (৮২নং : সুরা-সাকী)
উল্লিখিত গানসমূহে নজরুল হিন্দু-মুসলিমের যে ঐক্য কামনা করেছেন তা তার বহিরঙ্গীয় আবেগ নয়, আন্তরিক বিশ্বাসের ফসল। সে কারণে নজরুলের বহু গানে পরোক্ষভাবে হলেও, এই চেতনা বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এ-প্রসঙ্গে নজরুলের ইসলামি গান ও হিন্দুধর্ম সংশ্লিষ্ট গানগুলো বিবেচনায় আনা যেতে পারে। গ্রামোফোন কোম্পানির প্রয়োজনে এবং নিজের অর্থ রোজগারের দরকারে নজরুল এক সময় প্রচুর শ্যামাসঙ্গীতসহ হিন্দুধর্মসংশ্লি¬ষ্ট গান রচনা করেন।
সে সূত্র ধরেই তিনি লেখেন ইসলামি গানও। ‘আব্বাসউদ্দীন ছাড়া ধীরেন দাশ গনি মিঞা নামে, চিত্ত রায় দোলোয়ার হোসেন নামে, গিরিন চক্রবর্তী সোনা মিঞা নামে ও হরিমতী সাকিনা বেগম নামে বহু ইসলামি গান রেকর্ড করাতে এগুলি অপ্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা লাভ করে।’ (সূত্র: সুশীলকুমার গুপ্ত, নজরুল চরিত মানস, ১৩৭০, ভারতী লাইব্রেরি, কলকাতা; পৃ. ৪৫১)
দেখা যায়, এসব ইসলামি গান বা হিন্দুধর্মসংশ্লিষ্ট গানেও নজরুলের ধর্মীয় সমন্বয়চেতনা ব্যাপক। যেমন: ‘খেয়া-পারের তরণী’ কবিতায় যে নৌকা, নদী, মাঝির চিত্রকল্পটি তৈরি হয়েছে বা যে চিত্রকল্প অনুসরণ করে জুলফিকার গীতিগ্রন্থে ‘যাবি কে মদিনায়, আয় ত্বরা করি’ বলে যে গান রচিত হয়েছে, তাতে ইসলামি ভাবধারা প্রকাশিত হলেও চিত্রকল্পটি নজরুল নিয়েছেন ভারতীয় পুরাণ থেকে। এই গানের কয়েক পঙ্ক্তি উল্লেখ করা হলো:
‘যাবি কে মদিনায় , আয় ত্বরা করি’।
তোর খেয়া-ঘাটে এল পুণ্য-তরী ॥
আবুবকর উমর খাত্তাব
আর উসমান আলী হাইদর
দাঁড়ি এ সোনার তরণীর
পাপী সব নাই আর ডর।’ (১৩নং গান : জুলফিকার)
ভারতীয় পুরাণের ধর্মীয় চিত্রকল্পটি নজরুল ইসলামি গানে প্রয়োগ করেছেন। ভারতীয় পুরাণে যশোদা মায়ের কোলে শিশু কৃষ্ণের বিভূতিময় অধিকারের বর্ণনা আছে। এই বর্ণনা অনুসরণে বাজারে যশোদা ও কৃষ্ণের ক্যালেন্ডার ছাপা হয়েছে এবং ভক্ত হিন্দুদের ঘরে সে গুলো শ্রদ্ধার সঙ্গে শোভা পাচ্ছে এখনো। নজরুল তাঁর একটি গানে যশোদা ও কৃষ্ণের বদলে নিজধর্মীয় শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গকে স্থাপন করেছেন।
স্মরণীয়, নজরুল যশোদা-কৃষ্ণের জননী ও পুত্রের এই রূপকল্পটি হুবহু ব্যবহারও করেছেন তাঁর অনেক গানে। এ রকম একটি গান:
‘নন্দ-যশোদা কোলে গোপাল
যে রূপে খেলিত, ক্ষীর ননী খেত,
এস সেই রূপে ব্রজ-দুলাল।’ (৬৩নং গান / বন-গীতি)
একটি গানে নজরুল ধার্মিক মুসলিম নারীর মনের কথা ব্যক্ত করেছেন। পুরুষেরা মসজিদে গিয়ে খোদার নাম নিতে পারে, সে মেয়ে বলে তাকে থাকতে হয় ঘরে। গৃহাভ্যন্তরে অবস্থানকরী এই নারীর কথা ও আচারণে কৃষ্ণের জন্য উন্মাদিনী-প্রায় রাধার সাদৃশ্য লক্ষ করা যাবে। ‘কেবা শুনাইল শ্যাম নাম/কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো/আকুল করিল মন প্রাণ’Ñ রাধার এই কথার মতোই এক মুসলিম নারী।
নজরুলের গানে বলেছেন:
“মাগো আমায় শিখাইলি কেন আল্লার নাম
জপিলে আর হুঁশ থাকে না, ভুলি সকল কাম॥
লোক বলে, আল্লাতা’লার যায় না না-কি পাওয়া;
নাম জপিলে প্রাণে কেন বহে দখিন হাওয়া;
ও নাম জপিলে হিয়ার মাঝে
কেন এত ব্যথা বাজে,
কে তবে মা আমার বুকে কাঁদে অবিরাম॥”
(সূত্র: আবদুল কাদির সম্পাদিত নজরুল রচনাবলি, তৃতীয় খ-, নতুন সংস্করণ, ১৯৯৩; পৃ. ৪৫৪)
রাধা যেমন কৃষ্ণের জন্য তার রান্না থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনের সবই বিপর্যস্ত করে ফেলে, এই মুসলিম নারীও ‘আল্লার নাম’-এর জন্য প্রায় একই অবস্থায় পতিত হয়। আল্লাহর এই নাম নারীর ভেতরে বিশেষ ভক্তি-আকর্ষণের সৃষ্টি করে। বোঝাই যায়, নজরুল মুসলিম নারীর খোদাপ্রেম প্রকাশের ধারণাটি কোথা থেকে নিয়েছেন। গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত নজরুলের একটি গানের প্রথম দুই পঙ্ক্তি (দ্রষ্টব্য : নজরুল রচনাবলি, তৃতীয় খ-, পৃ. ৪০৬) :
‘মোহাম্মদ মোর নয়ন-মণি
মোহাম্মদ মোর জপমালা।’
মনের দিক থেকে চরম ও পরম সম্প্রীতিসাধক না হলে নিশ্চয়ই কেউ মহানবি হযরত মোহাম্মদকে (সা.) জপমালার সঙ্গে তুলনা করবেন না, করবেন তসবির সঙ্গে। নজরুলের কাছে হিন্দুদের জপমালা আর মুসলিমদের তসবির ভেদ ছিল না। এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে। নজরুল একটি গানে বলেছেন :
‘ফেরি করি ফিরি আমি
আল্লাহ নবীর নাম।
দেশ-বিদেশে পথে-ঘাটে
হাঁকি সুব্হ্-শাম॥’
(৩২নং গান : জুলফিকার : দ্বিতীয় খ-)
এই একনিষ্ঠতার মধ্যে একই গ্রন্থে তিনি লেখেন :
‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম নদীর চরে।
যুগলরূপে এসেছি গো আবার মাটির ঘরে॥’
(১১নং গান : জুলফিকার দ্বিতীয় খ-)
উল্লেখ্য, ইসলাম ধর্মে পুনর্জন্মের ধারণা নেই, এটা ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের প্রভাব; আর নজরুলের সমন্বয়বাদী মানসিকতার প্রতিফলন। রক্ষণশীল হলে নজরুল তাঁর গানে ইসলাম ধর্মে অননুমোদিত পুনর্জন্মর ধারণা প্রয়োগ করতেন না।
নজরুল ইসলাম যে শ্যামাসঙ্গীত, ভজন, কীর্তনগুলো রচনা করেছেন তা শুনলে বোঝা যায়, তার কতটা আত্তীকৃত ছিল ভারতীয় দর্শন, বিশেষ করে হিন্দুপুরাণ। নজরুলের গান সর্ম্পকে মন্তব্য করতে গিয়ে অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ বলেছেন : ‘তাঁর ইসলামিক গান শুনলে যেমন তাঁকে একান্তভাবে মুসলমান বলে মনে হয়, তেমনি তাঁর শ্যামাসঙ্গীত শুনলে তাঁকে নিতান্তই শাক্ত মনে হওয়া স্বাভাবিক। আবার যে পথ দিয়ে শ্যাম চলে যাবেন, তিনি যেভাবে ব্যাকুল হয়ে সেই পথের ধূলি হওয়ার বাসনা জানিয়েছেন, তাতে তাঁকে আত্যন্তিতভাবে বৈষ্ণব বলেই ধারণা জন্মে।’
বিভিন্ন ধর্ম-মতের দর্শনে এভাবে লীন হয়ে যাওয়াই সম্প্রীতিসাধনার বীজমন্ত্র। নজরুল এই বীজমন্ত্র গ্রহণ করেছিলেন। আর গ্রহণ করেছিলেন বলেই তিনি এই মত ও পথের সমন্বয়ের চেষ্টাও করেন। তাই রাধার রূপকল্প তৈরি করে ‘কে বিদেশী বন উদাসী/ বাঁশের বাঁশি বাজাও বনে’ গান লিখলেও সেখানে সংস্কৃত শব্দ নয়, ‘সুর সোহাগ’ ‘কুসুম বাগ’ ‘গুল বদন’ ইত্যাদি বাংলা ও পারসি শব্দ-বন্ধের চমৎকার সম্মিলন ঘটিয়েছেন। রাধার মানভঞ্জন পর্বের একটি চমৎকার গান ‘কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে/আসলে প্রাতে পুষ্পচোর।’
রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক এই গানে নজরুল আরবি-পারসি শব্দ ও ইসলামি অনুষঙ্গ এমন দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন যে, মনেই হয় না এগুলো রাধা বা কৃষ্ণকথার মূলে নেই। কীর্তন ঢঙের একটি গানে তিনি বোরকার কথা বলেছেন, বলেছেন ‘গুল-ডাকাত’। অন্যত্র তিনি লেখেন:
‘গায় কাওয়ালি বাদলি রুমঝুম,
তয়ফাওয়ালী নাচে মর্উ
ঝুরছে কদম, মেখ-তমালে
বিজলি-চোখে চায় কিশোর॥’ (৪৩নং গান: বুলবুল)
কীর্তন ঢঙের গানে মানানসই না হলেও নজরুল ইচ্ছে করেই এবং অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে ইসলামি অনুষঙ্গাবলি গানটিতে প্রয়োগ করেছেন। নজরুল প্রচুর বাংলা ‘ভজন’ লিখেছেন কাওয়ালির সুরে। কাওয়ালির সুরে এ রকমের একটি ভজন : ‘রাখ এ মিনতি ত্রিভুবন পতি/তব পদে মতি (রাখ) ।’
তিনি শুধু হিন্দু ও মুসলিম প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গের সম্মিলন তার গানে ঘটিয়েছেন তা নয়। হিন্দুদের মধ্যে শাক্ত ও বৈষ্ণবদের সম্পর্কের যে দা-কুমড়ো ভাব, তা-ও সম্প্রীতির এক সূত্রে গাঁথতে চেয়েছেন। তাই একই গানে তিনি শ্যাম ও শ্যামার প্রসঙ্গ এনেছে অপূর্ব দক্ষতায়। নজরুল ছাড়া শাক্ত ও বৈষ্ণবদের এমন মিলনডোরে অন্য কেউ বেঁধেছেন বলে তো মনে হয় না। একটি গান এরকম :
‘শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে
জপি আমি শ্যামের নাম।
মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু
ঠাকুর হলেন রাধাশ্যাম ॥’
(৬৫নং গান : রাঙা জবা)
এই গানেই আছে সম্প্রীতির সেই দোতারাটি, এভাবে :
‘আমার মনের দো-তারাতে
শ্যাম শ্যামা দুটি তার,
সেই দোতারায় ঝঙ্কার দেয়
ওঙ্কার রব অনিবার ॥’ (ঐ)
শুধু একটি গানেই শাক্ত ও বৈষ্ণবদের সম্প্রীতির সোনালি বাঁধনে নজরুল বাঁধতে চেয়েছেন তা নয়। এ রকম বহু গান আছে তার। আর একটি ছোটো গানের সম্পূর্ণ উল্লেখ করা যাক :
‘শ্যামা তোরে শ্যাম সাজায়ে দেখি, আয়!
পীত ধড়া মোহন চূড়া কেমন মানায়॥
করেতে দেবো মা বাঁশি, বনমালা গলে;
দাঁড়াবি ত্রিভঙ্গ হয়ে কদম্বেরই তলে;
নতুবা ত্যাজিব প্রাণ যমুুনারই জলে;
অহরহ এ-বিরহ সহা নাহি যায় ॥’ (৮৮নং গান : রাঙা জবা)
শ্যামা ও শ্যামের অভেদ কল্পনা ভারতীয় দর্শনে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে সন্দেহ নেই। পরস্পর-বিপরীত এই মতকে নজরুল বেঁধেছেন অন্তরের রতির দরদ দিয়ে। নজরুলের এই মৈত্রীময় অভেদ দর্শনই সম্প্রীতির মূলকথা। নজরুল তার অন্যান্য রচনার মতো গানেও যে সম্প্রীতিসাধনা করে গেছেন, তা সবার জন্য অনুসরণীয়।
লেখক
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।