নারী অধিকারের নিঃশব্দ লড়াইয়ের গল্প ‘হক’

একটি আদালত কক্ষ। নিঃশব্দে জমে ওঠা উত্তেজনা। দর্শকের দৃষ্টি আটকে থাকে এক নারীর চোখে—যেখানে লড়াই আছে, কিন্তু চিৎকার নেই। ধর্ম বনাম সংবিধান, বিশ্বাস বনাম অধিকার—এই সব বিস্ফোরক উপাদান থাকা সত্ত্বেও যে ছবি চিৎকার না করেই আঘাত হানে মানবিক দৃষ্টিতে, তার নাম ‘হক’। সুপার্ন এস. ভার্মা পরিচালিত এবং রেশু নাথ রচিত এই চলচ্চিত্রটি আশির দশকের আলোচিত শাহ বানু মামলার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও, এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রোপাগান্ডার পথে হাঁটে না। বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভেতরে এক নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকেই রাখে কেন্দ্রবিন্দুতে। বর্তমান সময়ে বলিউডে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে গল্প বললেই অতিনাটকীয়তা ও একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ে, সেখানে ‘হক’ বেছে নেয় সংযমের পথ। ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটি সংঘাতের পথে দর্শকের আবেগ উসকে দেয় না, বরং যুক্তি ও মানবিক বোধের জায়গা থেকে প্রশ্ন তোলে। ছবির শেষভাগে পরপর দুটি শক্তিশালী আদালতকেন্দ্রিক একক বক্তব্য দর্শককে নাড়িয়ে দেয়। একটি দেন ইমরান হাশমি, অন্যটি ইয়ামি গৌতম। দু’জনেই সংলাপ ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে চরিত্রের গভীরতা নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন। তবে এই

নারী অধিকারের নিঃশব্দ লড়াইয়ের গল্প ‘হক’
একটি আদালত কক্ষ। নিঃশব্দে জমে ওঠা উত্তেজনা। দর্শকের দৃষ্টি আটকে থাকে এক নারীর চোখে—যেখানে লড়াই আছে, কিন্তু চিৎকার নেই। ধর্ম বনাম সংবিধান, বিশ্বাস বনাম অধিকার—এই সব বিস্ফোরক উপাদান থাকা সত্ত্বেও যে ছবি চিৎকার না করেই আঘাত হানে মানবিক দৃষ্টিতে, তার নাম ‘হক’। সুপার্ন এস. ভার্মা পরিচালিত এবং রেশু নাথ রচিত এই চলচ্চিত্রটি আশির দশকের আলোচিত শাহ বানু মামলার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও, এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রোপাগান্ডার পথে হাঁটে না। বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভেতরে এক নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকেই রাখে কেন্দ্রবিন্দুতে। বর্তমান সময়ে বলিউডে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে গল্প বললেই অতিনাটকীয়তা ও একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ে, সেখানে ‘হক’ বেছে নেয় সংযমের পথ। ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটি সংঘাতের পথে দর্শকের আবেগ উসকে দেয় না, বরং যুক্তি ও মানবিক বোধের জায়গা থেকে প্রশ্ন তোলে। ছবির শেষভাগে পরপর দুটি শক্তিশালী আদালতকেন্দ্রিক একক বক্তব্য দর্শককে নাড়িয়ে দেয়। একটি দেন ইমরান হাশমি, অন্যটি ইয়ামি গৌতম। দু’জনেই সংলাপ ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে চরিত্রের গভীরতা নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন। তবে এই দৃশ্যগুলো আসার আগ পর্যন্ত পুরো ছবি জুড়েই রয়েছে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত সংযম। চলচ্চিত্রটিতে দেখা যায়, শুরুটা প্রেমময় মধুর হলেও গল্পের করুণ কাহিনীর শুরু হয় আব্বাসের দ্বিতীয় বিয়ের পরে। এরপর একা এক নারী তার সন্তানদের নিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে নামেন সমাজে।  আব্বাস (ইমিরান হাশমি) শাজিয়াকে (ইয়ামি গৌতম) ভরণপোষণ ও সন্তানের দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে শরিয়তের কথিত ক্ষমতা ব্যবহার করতেও পিছপা হন না। এই সুবিধাবাদী অবস্থানই পরে আব্বাসকে ভারতের সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিশ্বাসভিত্তিক আইন ও রাষ্ট্রীয় আইনের এই সংঘাতই ছবিটির কেন্দ্রবিন্দু। সিনেমায় ইয়ামি গৌতম ধরের চরিত্র শাজিয়া বানু। যিনি একজন অল্পশিক্ষিত নারী এবং হঠাৎ করেই জীবনের ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তার স্বামী আব্বাস খান (ইমরান হাশমি) বিদেশ সফরে গিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে আসেন, আর সেখান থেকেই শুরু হয় শাজিয়ার দীর্ঘ আইনি ও মানসিক সংগ্রাম। একদিকে শরিয়ত আইনের ব্যাখ্যা, অন্যদিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারা,এই দ্বন্দ্বই ধীরে ধীরে রূপ নেয় জাতীয় বিতর্কে। দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে আল কুরআনের সূরা আন নিসার ৩ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে, যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, (নারী) ইয়াতীমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে , তবে নারীদের মধ্য হতে নিজেদের পছন্দমত দুই, তিন ও চার জনকে বিবাহ কর, কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, তোমরা সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকে কিংবা তোমাদের অধীনস্থ দাসীকে বিয়ে করো, এটাই হবে অবিচার না করার কাছাকাছি।    সিনেমায় আদালতের বাইরেও শাজিয়ার ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক চাপ এবং পারিপার্শ্বিক কটূক্তিকেও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। ছবিতে দেখা যায় তার বাবা, একজন ধর্মজ্ঞ মানুষ হয়েও মেয়ের পাশে দাঁড়ান,যা ছবিটিকে আরও মানবিক করে তোলে। আইনি সিনেমা হিসেবে ‘হক’ খুব বেশি চমক দেখাতে না চাইলেও ন্যাচারাল অভিনয়ের জন্য সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ ঘটায় দৃঢ়ভাবে। বড় সংঘর্ষের বদলে ছোট ছোট পারিবারিক টানাপোড়েন থেকেই গল্পটি সামনে অগ্রসর হতে থাকে। একটি ব্যক্তিগত লড়াই কীভাবে ধীরে ধীরে জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়,ছবিটি সেটাই দেখায় খুব দারুণ ভাবে। এই সিনেমায় ইয়ামির বিপরীতে নবাগত অভিনেত্রী  বর্তিকা সিং কিছু দৃশ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে শীবা চাড্ডা ও দানিশ হুসেইনের মতো শক্তিশালী অভিনেতারা আরও গভীরভাবে লেখা চরিত্র পেলে ছবিটি হয়তো আরও সমৃদ্ধ হতো। তবে বলে রাখা ভালো, বাস্তবে ভারতে এই মামলার নিষ্পত্তি হয় ২০১৯ সালে এবং পরবর্তীতে শাহ বানুকে তার পাপ্য হক লাভ করেন আদালতের আইনমতে।  সবশেষে বলা যায়, ‘হক’ এমন এক ছবি, যা আওয়াজ না তুলেও প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, উত্তেজনা সৃষ্টি না করেও ভাবতে বাধ্য করে। ধর্ম, আইন আর নারীর অধিকারের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সংযম বজায় রেখে বক্তব্য রাখার সাহসই এই ছবির সবচেয়ে বড় জয়।  উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হক’ নির্মাণে মোট বাজেট ছিল আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রুপি। এতে প্রোডাকশন ব্যয়ের পাশাপাশি শিল্পী পারিশ্রমিক ও প্রচারণা খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রথমে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর সিনেমাটির আয় সেই বাজেটের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। তবে প্রেক্ষাগৃহে সাফল্য না পেলেও ওটিটিতে দারুণ সাফল্য পেয়েছে এই সিনেমাটি।  নেটফ্লিক্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ‘হক’। অ-ইংরেজি ভাষার সিনেমা হিসেবে গ্লোবাল চার্টে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। বিশ্বের পাঁচটি দেশে এক নম্বরে রয়েছে সিনেমাটি এবং ১৪টি দেশে জায়গা করে নিয়েছে শীর্ষ দশে। 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow