নায়াগ্রার গর্জন পেরিয়ে টরন্টোর পথে

বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৃষ্টি নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মোহনীয় সৌন্দর্যে টানা দুইদিন ডুবে থাকার পর ৫ জুলাই সকালটি ছিল ভিন্ন অনুভূতির। নায়াগ্রার গর্জন তখনো যেন কানে বাজছে, জলকণার শীতল স্পর্শ এখনো শরীর ও মনজুড়ে রয়ে গেছে। কিন্তু ভ্রমণের নিয়মই যেন এমন যে, একটি সৌন্দর্যকে পেছনে রেখে আরেকটি সৌন্দর্যের সন্ধানে এগিয়ে যেতে হয়। তাই সেদিন আমাদের গন্তব্য ছিল কানাডার বৃহত্তম নগরী টরন্টো। সকাল ঠিক নয়টায় বাফেলোর এয়ারবিএনবিতে এসে পৌঁছালেন আমার মামাতো শ্যালিকা মনি এবং ভায়রা ভাই অরুণ। প্রায় এক দশক পর তাদের সঙ্গে দেখা। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান যেন এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল আন্তরিক হাসি, উষ্ণ আলিঙ্গন এবং অসংখ্য স্মৃতিচারণায়। বর্তমানে তারা টরন্টোর স্কারবরো এলাকায় বসবাস করছেন। আমাদের কানাডা পর্বের আতিথ্য ও সফরসঙ্গী হবেন তারাই। গাড়িতে ওঠার আগে বিদায় জানাতে হলো বড় মেয়ে, জামাই, বেয়ান, আদরের ছোট্ট দিদিভাই বাঁশরী এবং সবচেয়ে বেশি কষ্ট নিয়ে ছোট মেয়ে মৃত্তিকাকে। ওরা তখন যুক্তরাষ্ট্রের লাফায়েতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মৃত্তিকা ৮ জুলাই বাংলাদেশে ফিরে যাবে। জীবনের এই প্রথম

নায়াগ্রার গর্জন পেরিয়ে টরন্টোর পথে

বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৃষ্টি নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মোহনীয় সৌন্দর্যে টানা দুইদিন ডুবে থাকার পর ৫ জুলাই সকালটি ছিল ভিন্ন অনুভূতির। নায়াগ্রার গর্জন তখনো যেন কানে বাজছে, জলকণার শীতল স্পর্শ এখনো শরীর ও মনজুড়ে রয়ে গেছে। কিন্তু ভ্রমণের নিয়মই যেন এমন যে, একটি সৌন্দর্যকে পেছনে রেখে আরেকটি সৌন্দর্যের সন্ধানে এগিয়ে যেতে হয়। তাই সেদিন আমাদের গন্তব্য ছিল কানাডার বৃহত্তম নগরী টরন্টো। সকাল ঠিক নয়টায় বাফেলোর এয়ারবিএনবিতে এসে পৌঁছালেন আমার মামাতো শ্যালিকা মনি এবং ভায়রা ভাই অরুণ। প্রায় এক দশক পর তাদের সঙ্গে দেখা। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান যেন এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল আন্তরিক হাসি, উষ্ণ আলিঙ্গন এবং অসংখ্য স্মৃতিচারণায়। বর্তমানে তারা টরন্টোর স্কারবরো এলাকায় বসবাস করছেন। আমাদের কানাডা পর্বের আতিথ্য ও সফরসঙ্গী হবেন তারাই।

গাড়িতে ওঠার আগে বিদায় জানাতে হলো বড় মেয়ে, জামাই, বেয়ান, আদরের ছোট্ট দিদিভাই বাঁশরী এবং সবচেয়ে বেশি কষ্ট নিয়ে ছোট মেয়ে মৃত্তিকাকে। ওরা তখন যুক্তরাষ্ট্রের লাফায়েতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মৃত্তিকা ৮ জুলাই বাংলাদেশে ফিরে যাবে। জীবনের এই প্রথম ওকে একা রেখে আমরা অন্য দেশে যাচ্ছি। একজন বাবা হিসেবে বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছিল। ভ্রমণের আনন্দের মাঝেও সন্তানের বিচ্ছেদের এই বেদনাটুকু নিঃশব্দে হৃদয়কে আরও ভারী করে তুলেছিল। আনন্দ, প্রত্যাশা এবং বিচ্ছেদের অনুভূতি মিলেমিশে সেই সকালের যাত্রাকে আমার কাছে এক গভীর আবেগময় স্মৃতিতে পরিণত করেছিল।

যা-ই হোক, আবেগকে সঙ্গী করেই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে অরুণ, তাঁর পাশে আমি। পেছনের আসনে মনি ও আমার সহধর্মিণী ময়না। গাড়ি ছুটে চলল প্রশস্ত আমেরিকান মহাসড়ক ধরে। জানালার ওপারে সবুজের বিস্তার, পরিচ্ছন্ন বসতি এবং সুশৃঙ্খল যান চলাচল যেন পুরো পথটিকেই এক চলমান চিত্রপটে পরিণত করেছিল। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার আন্তর্জাতিক সীমান্তে। নায়াগ্রা নদীর ওপর নির্মিত এই সীমান্ত পারাপার উত্তর আমেরিকার অন্যতম ব্যস্ত স্থলবন্দর। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এবং অসংখ্য যানবাহন এই সীমান্ত অতিক্রম করে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করে।

গ্রীষ্মকাল হওয়ায় সেদিনও দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছিল শত শত গাড়ি। প্রায় চল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর আমাদের গাড়ির পালা এলো। সীমান্ত কর্মকর্তারা পাসপোর্ট পরীক্ষা করলেন এবং কয়েকটি স্বাভাবিক প্রশ্ন করলেন। তারা জানতে চাইলেন, আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি এবং কতদিন কানাডায় থাকব। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই অনুমতি মিলল কানাডায় প্রবেশের। সীমান্ত অতিক্রমের সেই মুহূর্তটি ছিল এক অন্যরকম অনুভূতির। মাত্র কয়েক মিনিট আগেও আমরা যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম, আর এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করলাম। সীমান্ত পেরোনোর সেই ক্ষণিকের অভিজ্ঞতা আমাদের ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল।

canada

সীমান্ত পেরিয়ে অন্টারিও প্রদেশের মহাসড়কে গাড়ি যত এগোতে লাগল; ততই বদলে যেতে লাগল চারপাশের দৃশ্য। পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সুউচ্চ বৃক্ষের সারি, বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর এবং নিয়মতান্ত্রিক নগর পরিকল্পনা চোখে পড়ার মতো। প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ পেরিয়ে দুপুরের দিকে পৌঁছে গেলাম টরন্টো শহরের পূর্বাংশের পরিচিত আবাসিক এলাকা স্কারবরোতে। প্রথম দর্শনেই স্কারবরো মন জয় করে নিলো। বিস্তৃত রাস্তা, ছায়াঘেরা পাড়াগুলো, পরিচ্ছন্ন বাড়িঘর, নান্দনিক লন, রঙিন ফুলের বাগান এবং চারদিকে ছড়িয়ে থাকা সবুজ গাছপালা যেন প্রকৃতি ও আধুনিক নগরজীবনের এক অপূর্ব সমন্বয়। কোথাও অযথা কোলাহল নেই, নেই হর্নের কর্কশ শব্দ। প্রতিটি বাড়ির সামনের ঘাস কাটা, গাছপালা পরিচর্যায় সাজানো এবং ফুটপাত ঝকঝকে পরিষ্কার। মনে হচ্ছিল, পুরো এলাকাটি যেন এক বিশাল উন্মুক্ত উদ্যান। আরও একটি বিষয় মুহূর্তেই দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এই এলাকায় বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান টরন্টোকে সত্যিকার অর্থেই একটি বিশ্বনগরীতে পরিণত করেছে।

দক্ষিণ এশীয়, চীনা, আফ্রিকান, ইউরোপীয়সহ বহু সংস্কৃতির মানুষ এখানে পাশাপাশি বসবাস করছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশি এবং বাংলাভাষী মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আশপাশে বাংলা ভাষায় কথোপকথন, পরিচিত মুখের হাসি এবং বাঙালি সংস্কৃতির নানা ছাপ দেখে মুহূর্তেই এক ধরনের আপন অনুভূতি তৈরি হলো। বৈচিত্র্যের মধ্যেও রয়েছে অসাধারণ শৃঙ্খলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং একে অপরের সংস্কৃতির প্রতি আন্তরিক সম্মান। বিদেশের মাটিতে এমন বহু সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বাংলা ভাষার সহজ উপস্থিতি আমাদের কাছে স্কারবরোকে আরও আপন ও হৃদয়ের কাছাকাছি করে তুললো।

বাড়িতে পৌঁছেই শুরু হলো আন্তরিক আপ্যায়ন। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল মনির হাতে তৈরি ধোঁয়া ওঠা বাঙালি মধ্যাহ্নভোজে। সুগন্ধি ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, ভর্তা এবং দেশীয় স্বাদের নানা পদ যেন হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশের রান্নাঘরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনল। প্রতিটি খাবারের স্বাদে মিশে ছিল আপনজনের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা। বিদেশের মাটিতে আপনজনের হাতের রান্নার স্বাদ যে কতটা প্রশান্তি এনে দেয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন।

মধ্যাহ্নভোজের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির হ্রদ লেক অন্টারিওর তীরে। উত্তর আমেরিকার পাঁচটি গ্রেট লেকের মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে ছোট হলেও অর্থনীতি, পরিবহন, পরিবেশ এবং নগরজীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রায় ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল হ্রদের উত্তর তীরজুড়েই গড়ে উঠেছে কানাডার সবচেয়ে জনবহুল মহানগর টরন্টো। শহরের জলবায়ু, বাণিজ্য, পর্যটন এবং নৌ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই হ্রদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

canada

লেকের তীরে পৌঁছেই মন ভরে গেল। যতদূর চোখ যায়, শুধু বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি। দিগন্তে জল আর আকাশ যেন একাকার হয়ে গেছে। মৃদু বাতাসে হ্রদের ঢেউ আলতো করে তীরে আছড়ে পড়ছে। সাদা পালতোলা নৌকা, ছোট ছোট ইয়ট, আকাশে উড়ে বেড়ানো সিগাল এবং দূরে টরন্টোর সুউচ্চ ভবনগুলোর অবয়ব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্যপট তৈরি করেছে। প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য এবং আধুনিক নগরীর নান্দনিক রূপ যেন একই ক্যানভাসে পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছে। সেই মনোরম পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমরা কিছুক্ষণ নীরবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করলাম এবং স্মৃতির অ্যালবামে যোগ করার জন্য বেশ কয়েকটি ছবিও ধারণ করলাম।

সূর্যের স্নিগ্ধ আলো তখন হ্রদের জলে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিকেলের শেষ আলোয় লেক অন্টারিও যেন আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছিল। সেই অপূর্ব পরিবেশে আমরা দীর্ঘক্ষণ হাঁটলাম, গল্প করলাম এবং স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি করলাম অসংখ্য ছবি। প্রতিটি ছবির পেছনে ছিল শুধু একটি দৃশ্য নয় বরং বহুদিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো কিছু অমূল্য মুহূর্ত। ক্যামেরার প্রতিটি ক্লিক যেন আনন্দ, ভালোবাসা এবং পুনর্মিলনের একেকটি স্মৃতি ধরে রাখছিল। মনে হচ্ছিল, ভ্রমণের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু নতুন স্থান দেখা নয় বরং প্রিয় মানুষের সঙ্গে সেই মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই তার পূর্ণতা নিহিত।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হতে লাগল। লেক অন্টারিওর শান্ত জলরাশি তখন দিনের শেষ আলোকে বিদায় জানিয়ে নতুন এক রাতের অপেক্ষায়। দূরে শহরের ভবনগুলোতে একে একে আলো জ্বলে উঠছিল, আর হ্রদের জলে সেই আলোর প্রতিফলন সৃষ্টি করছিল এক অপূর্ব নান্দনিক আবহ। চারপাশের নীরবতা, শীতল বাতাস এবং প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য মনকে এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে দিচ্ছিল। আর আমি নীরবে অনুভব করছিলাম যে, ভ্রমণ কখনো শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার নাম নয়। ভ্রমণ হলো অনুভূতির বিস্তার, সম্পর্কের পুনর্মিলন, স্মৃতিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা এবং পৃথিবীকে নতুন চোখে আবিষ্কারের এক অনন্ত যাত্রা।

canada

সেই সন্ধ্যায় লেক অন্টারিওর তীরে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তিগুলো অনেক সময় কোনো দর্শনীয় স্থানে নয় বরং প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো এমন আন্তরিক মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow