পক্ষ্মীরাজ, প্রদীপের আলো আর গ্রামের ফুটবল
ছোটবেলার গল্প শোনার সেই দিনগুলো আজ যেন কুয়াশার ওপারে হারিয়ে যাওয়া কোনো বিকেল। কত দূরে সরে গেছে সেই সময়, যখন কল্পনার আকাশ ভেঙে রাজার কুমার পক্ষ্মীরাজে চড়ে উড়ে আসত আমাদের নিঃশব্দ স্বপ্নের রাজ্যে। সন্ধ্যা নামলেই মনে হত পৃথিবীর কোথাও এক বীর যুবক তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলেছে, দিনের শেষ আলো গায়ে মেখে। তার চোখে ছিল সাহস, হৃদয়ে ছিল ভালোবাসা, আর সেই ভালোবাসার নাম ছিল মধুর চন্দ্রলেখা। শিশুমনের ভয়ও ছিল নির্মল। যদি সে খুঁজে না পায় তার প্রিয় মানুষটিকে। যদি পথ হারিয়ে যায় সেই রূপকথার অভিযানে। অথচ সেই আশঙ্কার মধ্যেও কী অদ্ভুত এক মায়া ছিল। কারণ তখন গল্প মানেই ছিল আশ্রয়, গল্প মানেই ছিল বিশ্বাস। মনে পড়ে সন্ধ্যাবেলার কথা। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। আলো আর অন্ধকারের মাঝামাঝি এক শান্ত সময়। আমরা কয়েকজন মুগ্ধ হয়ে বসে আছি, শুনছি মধুমালার গল্প। আর সেই গল্পের প্রতিটি শব্দ মায়ের কণ্ঠে যেন সুর হয়ে ভেসে আসত। সেই কণ্ঠে ছিল নিরাপত্তা, ভালোবাসা, ঘুমপাড়ানি স্বপ্নের মায়াবী ছোঁয়া। আজও মনে হলে বুকের ভিতর এক নিঃশব্দ হাহাকার জেগে ওঠে। আহা, মায়ের গলার সেই মিষ্টি সুর। আর আসে না রাজার কুমার পক্ষ্মীরাজ
ছোটবেলার গল্প শোনার সেই দিনগুলো আজ যেন কুয়াশার ওপারে হারিয়ে যাওয়া কোনো বিকেল। কত দূরে সরে গেছে সেই সময়, যখন কল্পনার আকাশ ভেঙে রাজার কুমার পক্ষ্মীরাজে চড়ে উড়ে আসত আমাদের নিঃশব্দ স্বপ্নের রাজ্যে।
সন্ধ্যা নামলেই মনে হত পৃথিবীর কোথাও এক বীর যুবক তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলেছে, দিনের শেষ আলো গায়ে মেখে। তার চোখে ছিল সাহস, হৃদয়ে ছিল ভালোবাসা, আর সেই ভালোবাসার নাম ছিল মধুর চন্দ্রলেখা।
শিশুমনের ভয়ও ছিল নির্মল। যদি সে খুঁজে না পায় তার প্রিয় মানুষটিকে। যদি পথ হারিয়ে যায় সেই রূপকথার অভিযানে। অথচ সেই আশঙ্কার মধ্যেও কী অদ্ভুত এক মায়া ছিল। কারণ তখন গল্প মানেই ছিল আশ্রয়, গল্প মানেই ছিল বিশ্বাস।
মনে পড়ে সন্ধ্যাবেলার কথা। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। আলো আর অন্ধকারের মাঝামাঝি এক শান্ত সময়। আমরা কয়েকজন মুগ্ধ হয়ে বসে আছি, শুনছি মধুমালার গল্প। আর সেই গল্পের প্রতিটি শব্দ মায়ের কণ্ঠে যেন সুর হয়ে ভেসে আসত। সেই কণ্ঠে ছিল নিরাপত্তা, ভালোবাসা, ঘুমপাড়ানি স্বপ্নের মায়াবী ছোঁয়া। আজও মনে হলে বুকের ভিতর এক নিঃশব্দ হাহাকার জেগে ওঠে। আহা, মায়ের গলার সেই মিষ্টি সুর। আর আসে না রাজার কুমার পক্ষ্মীরাজে উড়ে।
মান্নান ভাই, প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও শিক্ষাবিদ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্টকহোমের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে সিনিয়র সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের হরাইজন ২০২০ প্রকল্পে সুইডিশ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার কর্মজীবনে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ও ওয়ারশ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে গবেষণা ও ফেলোশিপ পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি মালারডালেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং ওয়ারশ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তার গবেষণা ও কাজের ক্ষেত্র মূলত প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় দূরপ্রবাসে বসবাস করেও বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ এবং গ্রামের জীবনের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক অটুট রেখেছেন।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক জাগরণের নানা উদ্যোগে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছেন নীরবে। এবারের বাংলাদেশ সফরে গ্রামীণ জীবনের নানা বাস্তবতা নিয়ে তার ভাবনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। দূরপ্রবাস থেকে আমি সেসব অনুসরণ করছিলাম। হঠাৎই তার স্মৃতির ভাঁজে ফিরে আসা ছোটবেলার দিনগুলো আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল।
মান্নান ভাইয়ের দেখা অভিজ্ঞতা
জলমগ্ন মাঠে কিশোরদের ফুটবল খেলতে দেখে তিনি যেন ফিরে গিয়েছিলেন নিজের শৈশবে, গ্রামবাংলার সেই সোনালি দিনগুলোতে। দৃশ্যটি যেন একটুও বদলায়নি। কাদা আর বৃষ্টির পানিতে ভেজা মাঠে খালি পায়ে ছেলেদের ছুটে চলা, বলের পেছনে প্রাণপণ দৌড়, হঠাৎ পিছলে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ানো, আর চারদিকে ভেসে আসা নির্মল হাসির শব্দ তাকে ফিরিয়ে নিয়েছিল বহু দূরের এক সময়ে। মনে হচ্ছিল সময় যেন থেমে আছে সেই পুরনো বাংলার উঠোনে।
তার কথায় ফুটবল তখন শুধু খেলা ছিল না, ছিল আনন্দের ভাষা, বন্ধুত্বের বন্ধন, আর সম্মিলিত জীবনের এক গভীর উৎসব। কারও পায়ে দামি বুট ছিল না, ঝকঝকে জার্সি ছিল না, ছিল না আধুনিক স্টেডিয়াম। বাঁশের কঞ্চি গেঁথে গোলপোস্ট বানানো হতো, কখনও বা স্যান্ডেল রেখে। পুরনো, সেলাই করা বল নিয়েই চলত স্বপ্নের খেলা। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত স্বাধীনতা। ছিল কল্পনা, উচ্ছ্বাস আর জীবনের নির্মল আনন্দ।
বর্ষাকালে মাঠ পানিতে ডুবে গেলে আনন্দ না কি আরও বেড়ে যেত। বৃষ্টি নামার অপেক্ষায় থাকত ছেলেরা। মাঠে পানি জমলেই শুরু হতো জলকাদা ফুটবল। বলের আঘাতে চারদিকে পানি ছিটকে পড়ত, কেউ কাদায় গড়িয়ে যেত, কেউ পিছলে পড়ে আবার হেসে উঠত। সন্ধ্যা নেমে এলেও খেলা থামাতে মন চাইত না। বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুনি ছিল নিশ্চিত, কিন্তু সেই বকুনির মধ্যেও লুকিয়ে থাকত মমতা। কারণ মায়েরা জানতেন, এটাই শৈশব, এটাই জীবনের প্রাণস্পন্দন।
তার স্মৃতিচারণে সবচেয়ে গভীর যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো ফুটবল তাদের শুধু খেলতে শেখায়নি, মানুষ হতেও শিখিয়েছে। দলবদ্ধতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য, নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, এসবের প্রথম পাঠ তারা পেয়েছিল গ্রামের মাঠে। তারা শিখেছিল একসঙ্গে লড়তে, একসঙ্গে জিততে, আবার হার মেনেও সম্পর্ক ধরে রাখতে। গ্রামের ফুটবল ম্যাচ মানেই ছিল এক সামাজিক উৎসব।
কৃষক মাঠের কাজ ফেলে খেলা দেখতে আসতেন, বৃদ্ধরা খেলার বিশ্লেষণ করতেন, ছোটরা বিস্ময়ে বড় ভাইদের অনুসরণ করত। ধনী গরিব, শিক্ষিত অশিক্ষিত, সব বিভাজন যেন মিলিয়ে যেত সেই এক টুকরো মাঠে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন তিনি দেখেন গ্রামের ছেলেরা এখনও জলভরা মাঠে ফুটবল খেলছে, তখন তার মনে আশার জন্ম হয়। এত প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন, শহরমুখী জীবন আর সামাজিক পরিবর্তনের মাঝেও গ্রামবাংলার ফুটবলের প্রাণ এখনও বেঁচে আছে। আর এই প্রাণশক্তিকেই তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করেন।
কারণ ফুটবল শুধু খেলাধুলা নয়। এটি তরুণদের ইতিবাচক পথে রাখার এক শক্তিশালী মাধ্যম। এটি শরীরকে শক্তিশালী করে, মনকে উদার করে, হতাশা ও একাকীত্ব থেকে দূরে রাখে। গ্রামের তরুণদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সংযোগ তৈরি করে। যেখানে সুযোগ সীমিত, সেখানে খেলাধুলা হতে পারে স্বপ্ন দেখার নতুন দরজা।
তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে অসংখ্য অজানা প্রতিভা লুকিয়ে আছে। আজ যে ছেলেটি কাদামাখা মাঠে খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে, সঠিক পরিচর্যা ও সুযোগ পেলে সেও হয়তো একদিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। প্রয়োজন শুধু সঠিক প্রশিক্ষণ, মাঠ, পরিচর্যা এবং উৎসাহ।
তিনি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে প্রতিটি গ্রামের স্কুলে একটি ভালো খেলার মাঠ থাকবে; যেখানে স্থানীয় ফুটবল টুর্নামেন্টগুলো মর্যাদা পাবে; যেখানে গ্রামের ছেলে মেয়েরা খেলাধুলার মাধ্যমে নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পাবে। ফুটবল তার প্রজন্মকে দিয়েছে স্মৃতি, বন্ধুত্ব, সাহস এবং মানবিক শিক্ষা। তিনি বিশ্বাস করেন, আগামী প্রজন্মকেও এটি একইভাবে আলোকিত করতে পারে।
সেদিন সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। মাঠের পানি ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছিল, কিন্তু ছেলেদের খেলা থামছিল না। তাদের হাসি, চিৎকার আর দৌড়ের শব্দ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, গ্রামবাংলার হৃদয় এখনও বেঁচে আছে। আর হয়তো সেই কাদামাখা ফুটবল মাঠগুলোতেই নীরবে গড়ে উঠছে বাংলাদেশের আগামী দিনের শক্তি, সৌন্দর্য এবং মানবিকতা।
তখন আবারও মনে পড়ে যায় সেই হারিয়ে যাওয়া সন্ধ্যাগুলোর কথা। প্রদীপের আলো, মায়ের কণ্ঠ, রূপকথার রাজপুত্র, আর জলকাদায় ভেজা মাঠে ছুটে চলা শৈশব। সময় বদলেছে, পৃথিবী বদলেছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের সেই নির্মল শিশুটি এখনও বেঁচে আছে। যে এখনও অপেক্ষা করে কোনো এক পক্ষ্মীরাজের ডানার শব্দ শোনার জন্য, অথবা কাদামাখা মাঠে আবার একবার প্রাণভরে দৌড়ে যাওয়ার জন্য।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]
এমআরএম
What's Your Reaction?