পরিকল্পনা-ভ্যাকসিনেশনে খুলতে পারে গবাদি পশু রপ্তানির দুয়ার

হবিগঞ্জের হাওরের বিস্তীর্ণ সবুজে প্রতিদিনই দেখা মেলে এক জীবন্ত জনপদের। ভোরের আলো ফুটতেই সারি সারি গরু নিয়ে হাওরের পথে ছোটে রাখাল, দিনভর চলে অবাধ বিচরণ। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, যেন সবুজের বুকে বসেছে গবাদি পশুর বিশাল মেলা। বিকেলে আবার বহর নিয়ে ঘরে ফেরা- প্রকৃতি আর জীবিকার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই চিরচেনা দৃশ্যই এখন নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও ভ্যাকসিনেশন নিশ্চিত করা গেলে হাওরাঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গবাদি পশু পালন হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাত; মাংসের পাশাপাশি পশুর চামড়া রপ্তানিও এনে দিতে পারে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। সরেজমিন বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও নবীগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে ঘুরে দেখা যায়, হাওরাঞ্চলের সবগুলো গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একাধিক গরু, ছাগল, ভেড়া রয়েছে। কিন্তু মহিষের সংখ্যা অনেক কম। গরু, মহিষ থাকলেও নেই গরু বা মহিষের গাড়ি। এখন আর এগুলোর তেমন প্রয়োজন নেই। এগুলো দিয়ে হাল-চাষও হয় না। সবই এখন আধুনিক যন্ত্রপাতির আওতায় চলে গেছে। ফলে অনেকাংশেই কমেছে গবাদি পশুর পালন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের গ্রামাঞ্চলে এক সময়

পরিকল্পনা-ভ্যাকসিনেশনে খুলতে পারে গবাদি পশু রপ্তানির দুয়ার

হবিগঞ্জের হাওরের বিস্তীর্ণ সবুজে প্রতিদিনই দেখা মেলে এক জীবন্ত জনপদের। ভোরের আলো ফুটতেই সারি সারি গরু নিয়ে হাওরের পথে ছোটে রাখাল, দিনভর চলে অবাধ বিচরণ। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, যেন সবুজের বুকে বসেছে গবাদি পশুর বিশাল মেলা। বিকেলে আবার বহর নিয়ে ঘরে ফেরা- প্রকৃতি আর জীবিকার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই চিরচেনা দৃশ্যই এখন নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও ভ্যাকসিনেশন নিশ্চিত করা গেলে হাওরাঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গবাদি পশু পালন হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাত; মাংসের পাশাপাশি পশুর চামড়া রপ্তানিও এনে দিতে পারে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

সরেজমিন বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও নবীগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে ঘুরে দেখা যায়, হাওরাঞ্চলের সবগুলো গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একাধিক গরু, ছাগল, ভেড়া রয়েছে। কিন্তু মহিষের সংখ্যা অনেক কম। গরু, মহিষ থাকলেও নেই গরু বা মহিষের গাড়ি। এখন আর এগুলোর তেমন প্রয়োজন নেই। এগুলো দিয়ে হাল-চাষও হয় না। সবই এখন আধুনিক যন্ত্রপাতির আওতায় চলে গেছে। ফলে অনেকাংশেই কমেছে গবাদি পশুর পালন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের গ্রামাঞ্চলে এক সময় প্রায় সব বাড়িতেই গবাদি পশু পালন করা হতো। এখন অনেকেই পশু পালন কমিয়ে দিয়েছেন। তবে এখনও অনেক বাড়িতে গবাদি পশু পালন করা হয়। এক সময় কোরবানিতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে গরু আসতো। কিন্তু এখন দেশীয় গরুতেই মিটছে চাহিদা। প্রচুর খামার গড়ে উঠেছে। এখন কোরবানি শেষেও প্রচুর গরু উদ্বৃত্ত থাকে।

তিনি বলেন, গবাদি পশু বাড়াতে কৃত্রিম প্রজনন বাড়াতে হবে। রোগ প্রতিরোধ করতে হবে। সব পশুকেই ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে।

মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ফুট-অ্যান্ড-মাউথ ডিজিজ (এফএমডি) নামে একটি রোগ আছে। আমাদের দেশে গরুর এ রোগ হয়। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কিছু কিছু গরু চোরাই পথে এসে আমাদের দেশের গরুর সঙ্গে মিশে। ফলে আমাদের গরুর মধ্যেও এ রোগ ছড়ায়। এ রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়া ভ্যাকসিনেরও অভাব রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, যদি আমরা এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে পারি তাহলে আমাদের দেশের পশু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পাশাপাশি আমাদের দেশের পশুর চামড়া অত্যন্ত গুণগত মানসম্পন্ন। চামড়া রপ্তানি করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্র আয় করা সম্ভব।

পরিকল্পনা-ভ্যাকসিনেশনে খুলতে পারে গবাদি পশু রপ্তানির দুয়ার

বানিয়াচংয়ের হাওর থেকে দলবেধে বাড়ি ফেরানো হচ্ছে গরুগুলো/ ছবি: জাগো নিউজ

বানিয়াচং দক্ষিণ-পশ্চিম ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান মামুন বলেন, আমাদের উপজেলাটি হাওর বেষ্টিত। এখানে প্রায় সব পরিবারই কৃষিতে নির্ভরশীল। ফলে যুগ যুগ ধরেই প্রতিটি বাড়িতে গরু, মহিষ পালন করা হচ্ছে। গরু, মহিষ দিয়ে জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। তবে কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতির আবিষ্কারে কৃষি কাজে গরু, মহিষের ব্যবহার এখন প্রায়ই বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এখন গরু, মহিষ পালন কিছুটা কমেছে। কিন্তু এরপরও গ্রামাঞ্চলের প্রায় বাড়িতেই এখনও গরু পালন করা হয়। যদিও সংখ্যায় কিছুটা কমেছে।

তিনি বলেন, যদি সরকারিভাবে গবাদি পশু পালনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয় এবং সহযোগিতা করা হয় তবে মানুষ আরও বেশি সংখ্যক পশু পালন করবে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও আরও বেশি পশু পালন করা সম্ভব। যার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা যেতে পারে।

‘উপজেলাটি হাওর বেষ্টিত। এখানে প্রায় সব পরিবারই কৃষিতে নির্ভরশীল। ফলে যুগ যুগ ধরেই প্রতিটি বাড়িতে গরু, মহিষ পালন করা হচ্ছে। গরু, মহিষ দিয়ে জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। তবে কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতির আবিষ্কারে কৃষি কাজে গরু, মহিষের ব্যবহার এখন প্রায়ই বন্ধ হয়ে গেছে’

আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামের বাসিন্দা রমাকান্ত দাশ বলেন, আমাদের হাওর এলাকার সবাই কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই হাওর এলাকার মানুষের প্রতিটি বাড়িতেই গরু আছে। কারও কম, আবার কারও বেশি। এক সময় মহিষও ছিল। এখন মহিষ খুব কম। তবে গরু, ছাগলের কমতি নেই। আমরা যদি সরকারি সহযোগিতা পাই তাহলে আরও বেশি পশু পালন করতে পারি। এর মাধ্যমে মানুষ স্বাবলম্বীও হতে পারবে।

বগুড়ার হাটে হাটে ‘হাসিল সন্ত্রাস’
চার সংকটে দুশ্চিন্তায় রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ীরা
চট্টগ্রামে সংকট নেই কোরবানির পশুর, দাম আয়ত্তে থাকার আশা
পশুর হাটে জাল টাকা-ছিনতাই ঠেকাতে এবার সর্বোচ্চ সতর্কতা

সদর উপজেলার রামপুর গ্রামের বাসিন্দা খামারি তুহিন মিয়া জানান, ১০ বছর ধরে গরুর খামার পরিচালনা করছেন তিনি। প্রতি বছরই ১৫ থেকে ২০টি গরু পালন করেন। এগুলো কোরবানির হাটে বিক্রি করেন। কিন্তু ১০ বছরের মধ্যে কখনও সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি। সরকারিভাবে চিকিৎসা কিংবা ভ্যাকসিন দেওয়া হয় না।

পরিকল্পনা-ভ্যাকসিনেশনে খুলতে পারে গবাদি পশু রপ্তানির দুয়ার

দিনে হাওরের মাঠে চলে গরুর অবাধ বিচরণ/ ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, আমরা সব সময়ই ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য ওষুধ বিভিন্ন জায়গার থেকে কিনে আনি। কিছু ভ্যাকসিন আছে যেগুলো শুধু সরকারিভাবেই দেওেয়া হয়। এগুলো বাজারে পাওয়া যায় না। গরুর একটি রোগ আছে লাম্বিং। এ রোগ হলে গরুর চামড়ার উপরে এক ধরনের গোটা হয়। এ রোগে গরু মারা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। এর জন্য সরকারি ভ্যাকসিন খুবই কার্যকরী। যদি সরকারিভাবে এসব ভ্যাকসিন দেওয়া হয় তবে খামারিরা আরও বেশি লাভবান হবে। উৎসাহিত হবে। এছাড়া খাবারের দামও অনেক বেড়েছে। এগুলোও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদা বেগম সাথী বলেন, বর্তমানে আমরা জাতীয়ভাবেই পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অনেক প্রকল্প আছে। এসব নিয়ে আমাদের নিজস্ব কোন পরিকল্পনা নেই। আমরা সরকারি পরিকল্পনা শুধু বাস্তবায়ন করি।

‘গবাদি পশু বাড়াতে কৃত্রিম প্রজনন বাড়াতে হবে। রোগ প্রতিরোধ করতে হবে। সব পশুকেই ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে’

হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি (প্রাণীর শরীরস্থান বিদ্যা) বিভাগের প্রভাষক ডা. সালাউদ্দীন ইউছুপ বলেন, প্রথমেই প্রয়োজন প্রাণীর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে। এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড) রোগ অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি মশার থেকে হয়। এর জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে। যার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।

কোরবানির বাজারে ডিজিটাল পশুর হাটের দাপট
অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহী সিল্ক, ভরসা এখন বিদেশি সুতা
ঈদযাত্রায় প্রয়োজনীয় যেসব ওষুধ সঙ্গে রাখবেন
ভ্যাটের আওতায় আসছে লক্ষাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

তিনি বলেন, কোন এলাকায় যদি এলএসডি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তাহলে এর আশপাশের এলাকায় ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে। যেন এ রোগ না ছড়ায়। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতাও বাড়াতে হবে। আবার ভ্যাকসিনের সঠিক পদ্ধতিও মেনে তা দিতে হবে। যদি পশুর জ্বর থাকে, প্রচণ্ড গরম থাকে তাহলে ভ্যাকসিন দিলে কোন কাজ হবে না।

পরিকল্পনা-ভ্যাকসিনেশনে খুলতে পারে গবাদি পশু রপ্তানির দুয়ার

তিনি বলেন, পশু পালনের সঠিক নীতিমালা না থাকার কারণে কিছু সমস্যা হয়। ভালো পলিসি থাকা দরকার। তবে নিশ্চয়ই পশুর মাংস রপ্তানিযোগ্য করে তোলা সম্ভব। আর মাংস রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা সম্ভব। এটি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ব্যক্তি পর্যায়ে গরু পালন করা হচ্ছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৭৮৭টি, মহিষ পালন করা হচ্ছে ২ হাজার ৪৮৭টি, ছাগল ১ লাখ ৩১ হাজার ১৩২টি, ভেড়া ৪৪ হাজার ১৭৪টি। জেলায় দ্রুত গরুর সংখ্যা বাড়ছে। মহিষের সংখ্যা কমলেও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

‘গ্রামাঞ্চলে এক সময় প্রায় সব বাড়িতেই গবাদি পশু পালন করা হতো। এখন অনেকেই পশু পালন কমিয়ে দিয়েছেন। তবে এখনও অনেক বাড়িতে গবাদি পশু পালন করা হয়। এক সময় কোরবানিতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে গরু আসতো। কিন্তু এখন দেশীয় গরুতেই চাহিদা মিটছে। প্রচুর খামার গড়ে উঠেছে। এখন কোরবানি শেষেও প্রচুর গরু উদ্বৃত্ত থাকে’

এছাড়া চলতি বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু গরুর খামার গড়ে উঠেছে। পশু পালন করা হয় ব্যক্তি পর্যায়েও। সব মিলিয়ে এবার কোরবানির জন্য ষাঁড় পালন করা হয়েছে ২১ হাজার ৬৫৩টি, বলদ ৪ হাজার ১২১টি, গাভী ৮ হাজার ৭১৮টি, মহিষ ৬৫৮টি, ছাগল ১১ হাজার ১২৩টি, ভেড়া ৪ হাজার ৫২৯টি। কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৪৬ হাজার ৫০টি। উদ্বৃত্ত থাকবে ৪ হাজার ২৪৭টি। ৯টি উপজেলায় এ বছর স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে প্রায় ৬০টি গরুর হাট বসেছে।

এনএইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow