পল্লীকবির স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুর জিলা স্কুলে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া

অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ, দেশের একজন বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট। তিনি বর্তমানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ১৯৫৩ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন তিনি। ১৯৬৯ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন। জিলা স্কুল নিয়ে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাবা-মায়ের পরই শিক্ষকদের অবস্থান। আমাদের সময় তখন ছাত্রদের স্যাররা গাইড করতেন। আমি যখন জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র তখন থেকে একজন স্যার আমাকে ডাক্তার বলে ডাকতেন। শিক্ষকরা তখন খুবই আন্তরিক ছিলেন, ছাত্ররাও শিক্ষকদের সম্মান করতেন।’ তবে তিনি মজা করে একটি আক্ষেপের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলে শুধু ছাত্র ছিল। ছাত্রী থাকলে আরও ভালো হতো। এছাড়াও তখনকার স্কুল জীবনের অনেক স্মৃতি ছিল যা আজও মনে পড়ে।’ বর্তমান সময়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি বলেন, লেখাপড়ার মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম মতো লেখাপড়া করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষকদের আন্তরিক হতে হবে। ছাত্রদের উচিত শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করা, ডিসিপ্লিন মেনে চলা ও পরিশ্রম করা। ব্রিটিশ ভারতের সূচনালগ্নে যে কয়টি বিদ্যালয় আধুনিক শিক্ষার আলো জ্বেলেছিল, ফরিদপুর

পল্লীকবির স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুর জিলা স্কুলে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া

অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ, দেশের একজন বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট। তিনি বর্তমানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ১৯৫৩ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন তিনি। ১৯৬৯ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন।

জিলা স্কুল নিয়ে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাবা-মায়ের পরই শিক্ষকদের অবস্থান। আমাদের সময় তখন ছাত্রদের স্যাররা গাইড করতেন। আমি যখন জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র তখন থেকে একজন স্যার আমাকে ডাক্তার বলে ডাকতেন। শিক্ষকরা তখন খুবই আন্তরিক ছিলেন, ছাত্ররাও শিক্ষকদের সম্মান করতেন।’

তবে তিনি মজা করে একটি আক্ষেপের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলে শুধু ছাত্র ছিল। ছাত্রী থাকলে আরও ভালো হতো। এছাড়াও তখনকার স্কুল জীবনের অনেক স্মৃতি ছিল যা আজও মনে পড়ে।’

বর্তমান সময়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি বলেন, লেখাপড়ার মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম মতো লেখাপড়া করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষকদের আন্তরিক হতে হবে। ছাত্রদের উচিত শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করা, ডিসিপ্লিন মেনে চলা ও পরিশ্রম করা।

পল্লীকবির স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুর জিলা স্কুলে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া

ব্রিটিশ ভারতের সূচনালগ্নে যে কয়টি বিদ্যালয় আধুনিক শিক্ষার আলো জ্বেলেছিল, ফরিদপুর জিলা স্কুল তাদের অন্যতম। দীর্ঘ সময়ে স্কুলটি শুধু শিক্ষা প্রদান করেনি, বরং সমাজে আলোকিত মানুষ গড়ে তুলেছে। যখন দেশে শিক্ষার ধারণাটিই সুস্পষ্ট হয়নি, তখন সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষের সন্তানদের জন্য এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই বিদ্যালয় হয়ে উঠেছে জনগণের স্কুল, সবার জন্য শিক্ষা ও সবার জন্য আলোর দিশা। তবে ঐতিহ্যবাহী স্কুলটিতে রয়েছে নানা সমস্যা ও সংকট। বিশেষ করে আধুনিক ল্যাব বা স্মার্ট ক্লাসরুমের অভাব যেন শিক্ষার্থীদের যুগের চেয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে।

স্কুলটি শুরু থেকেই এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, আন্দোলন ও সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, কবি আ.ন.ম বজলুর রশীদ, সাবেক মন্ত্রী এল.কে সিদ্দিকী, সিইসি এটিএম সামছুল হুদা, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তবে দীর্ঘ এত বছর পেরিয়ে গেলেও স্কুলটিতে পুরোপুরি আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। বাইরে থেকে দেখতে ঐতিহ্যবাহী ও সুন্দর মনে হলেও স্কুলটিতে নেই স্মার্ট বোর্ড, নেই ডিজিটাল ক্লাসরুম। বর্ষা মৌসুমে খেলার মাঠ জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকে। ফলে মাঠে ছাত্রদের খেলাধুলা বন্ধ থাকে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১৮৫ বছর আগে ১৮৪০ সালে যাত্রা শুরু করে এ স্কুলটি। শুরুতে ইংলিশ সেমিনারি স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও পরে ১৮৫১ সালে এটি জাতীয়করণ হয়। ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ সরকার স্কুলটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ‘ফরিদপুর জিলা স্কুল’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি ধাপে এই স্কুলের ছাত্রদের ভূমিকা গৌরবজ্বল।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকে নদীমাতৃক ফরিদপুরের বুকে শিক্ষা, প্রগতিশীল চিন্তা এবং আধুনিকতার বীজ বপন করে শতকের পর শতক ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ যাত্রাপথে এই বিদ্যালয় শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের মাঝে আলো ছড়ায়নি বরং একটি অঞ্চল, সেখানকার সমাজ এবং সার্বিকভাবে দেশের শিক্ষাগত বিকাশ আর সাংস্কৃতিক উন্নতির চলমান ইতিহাস হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিষ্ঠার কারণ ও নামকরণ

১৮৪০ সালে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এডগার এফ লুথার ‘ইংলিশ সেমিনারি স্কুল’ নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়াতে শুরু করে এবং ১৮৫১ সালে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আসার পর এটি পূর্ণাঙ্গ জিলা স্কুলে রূপান্তরিত হয়। ১৮৫৩ সালে এস ফ্রানকয়েস লেফেবরা এই বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

পল্লীকবির স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুর জিলা স্কুলে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া

১৮১৩ সালের শিক্ষানীতির আগে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ইংরেজদের তেমন কোনো চিন্তা দেখা যায় না। সেই সময় কোম্পানির সনদ নবায়নের সময় শর্ত থাকে যে বছরে সব খরচ মিটিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশবাসীর শিক্ষার জন্য এক লাখ টাকা খরচ করবে। এই অর্থ অপ্রতুল হলেও এই ব্যাপারটি পরবর্তীতে বিভিন্ন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বেশ কিছু স্কুল বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত হয় যা পরবর্তীতে জিলা স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

এর মাঝে ১৮২৯ সালে বরিশাল জেলা স্কুল এই অঞ্চলের প্রাচীনতম নিদর্শন। ১৮৩৪ সালে লর্ড বেন্টিংক এর সময়ে ম্যাকলে শিক্ষা নীতির মাধ্যমে এ দেশে ইংরেজি শিক্ষার জোরালো ভূমিকা শুরু হয়। ১৮৩৭ সালে লর্ড অকল্যান্ড ফারসির পরিবর্তে ইংরেজিকে সরকারি দপ্তরের ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এর তিন বছর পর তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এডগার এফ লুথার ও কিছু সম্ভ্রান্ত বিত্তশালীর উদ্যোগে ইংলিশ সেমিনারি স্কুল হিসেবে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা পায়।

স্কুল ক্যাম্পাস

প্রায় ১১ একর জায়গার ওপর স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত। এখানে রয়েছে একটি প্রশাসনিক ভবনসহ ৯টি পৃথক ভবন। তবে সবগুলো চালু নেই। একটি মসজিদ, দুটি ছাত্রাবাস থাকলেও ছাত্ররা থাকে না, ফলে ছাত্রাবাস বন্ধ রয়েছে। একটি ব্যায়ামাগার থাকলেও তা পড়ে আছে অচল অবস্থায়। সমৃদ্ধ কম্পিউটার ল্যাব আছে, তবে সব কম্পিউটার সচল নেই, লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বই নেই এবং তিনটি খেলার মাঠ থাকলেও দুটিতে পানি জমে থাকার কারণে খেলাধুলায় বিঘ্ন ঘটে।

স্কুলটিতে প্রভাতী ও দিবা দুই শিফটে প্রায় ১৪৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত হার ১:৩০। স্মার্ট শিক্ষার ছোঁয়া নেই, ল্যাব-লাইব্রেরি আছে কিন্তু লাইব্রেরিয়ান নেই। ফরিদপুর জিলা স্কুলে কোনো স্মার্ট বোর্ড বা ডিজিটাল ক্লাসরুমের অস্তিত্বও নেই। বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবটি বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। মাঝে মাঝে খোলা হয়। দশ বছর আগে ল্যাবটিতে চুরির ঘটনাও ঘটে। পরে যন্ত্রপাতি কেনা হলেও পূর্ণাঙ্গ যন্ত্রপাতি নেই।

১৪৫০ জন ছাত্রের বিপরীতে রয়েছেন ৫১ জন শিক্ষক। এর মধ্যে সহকারী প্রধান শিক্ষকের দুটি পদ খালি। বিদ্যালয়ে কোনো লাইব্রেরিয়ান নেই, একজন শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে এটি চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য স্কুলের আবাসিক ছাত্রাবাসটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রথম পিরিয়ডগুলো ৫০ মিনিট করে পাঠদান চললেও পরবর্তীগুলো চলে ৩৫ মিনিট করে। তবে তিনটি খেলার মাঠ থাকলেও বড় দুটি মাঠ বর্ষা মৌসুমে

ডিজিটাল শিক্ষায় পিছিয়ে জিলা স্কুল

বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে প্রাচীন স্কুলগুলোর কারিকুলাম ও প্রযুক্তিগত অভিযোজনের দিক দিয়ে ফরিদপুর জিলা স্কুল অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। কোডিং ক্লাব, রোবোটিক্স, স্টেম (STEM) এডুকেশন বা সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের দিক দিয়েও অনেক পিছিয়ে। নামি জিলা স্কুলের তুলনায় আসন সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে না। পাশাপাশি ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি এবং হোস্টেলের আধুনিকায়ন হচ্ছে না। বিজ্ঞানাগারের সব যন্ত্রপাতি সচল নয়। লাইব্রেরিতে নতুন বইয়ের অভাবও রয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নেই। দক্ষ আইসিটি শিক্ষকের অভাব, ইন্টারনেটের ধীরগতি বা রক্ষণাবেক্ষণের ফান্ডের অভাবে ল্যাবগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন পরে নতুন ষষ্ঠতলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করা হলেও এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। চেয়ার-টেবিল, আসবাবপত্রও নেই।

পল্লীকবির স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুর জিলা স্কুলে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া

তবে প্রযুক্তিগত অভিযোজনের প্রতিযোগিতামূলক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে এই জিলা স্কুল। বিশেষ করে স্মার্টবোর্ড, কোডিং ক্লাব, আধুনিক ল্যাবরেটরিসহ নানা প্রযুক্তির সংকটের কারণে আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে জিলা স্কুল। সেক্ষেত্রে আধুনিকতার দিক দিয়ে বেশ পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলে জিলা স্কুলের শ্রেষ্ঠত্ব হুমকিতে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গৌরবের ১৮৫ বছর এবং পুনর্মিলনী

এই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন বা এসএসসি পাস করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন প্রাক্তন ছাত্ররা। এই প্রাক্তন ছাত্র বা এলামনাইরা হচ্ছেন স্কুলের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি। স্কুলের সুদীর্ঘ ১৮৫ বছরের ইতিহাসে এইসব প্রাক্তন ছাত্রদের মিলনমেলা বা পুনর্মিলনী খুব বেশি হয়নি। ১৯৮০ সালের পুনর্মিলনীর পর ২০২৫ সালের শেষ অংশে আবার একটি পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়। যা এক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ, একটি ইতিহাসের পুনঃস্মরণ এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে অনুপ্রেরণার হস্তান্তর হয়।

বর্তমান ছাত্রদের কথা

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জায়েদ বিন জাফর জানায়, স্যাররা আন্তরিক। আদর করেন, স্নেহ করেন। কোনো কিছু না বুঝলে বুঝিয়ে দেন। জিলা স্কুলে পড়তে পেরে আমি ও আমার পরিবার খুশি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্র জানান, নামেই জিলা স্কুল। এখনো অনেক কিছু আধুনিকায়ন হয়নি। শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব-যন্ত্রপাতি, হোস্টেল, লাইব্রেরি অনেক সংকট ও ত্রুটি রয়েছে।

প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য

ফরিদপুর জিলা স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘ফরিদপুর জিলা স্কুল ফরিদপুর তথা বৃহত্তর ফরিদপুরবাসীর একটা অহংকারের জায়গা, গর্বের জায়গা। যুগে যুগে অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এখানে শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা জিলা স্কুলকে ধারণ করেন, লালন করেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমি জিলা স্কুলটিকে সুনামের সহিত এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানা হিসেবে যেন রূপান্তর করতে পারি এ ধরনের পরিকল্পনা আমরা এরইমধ্যে নিয়েছি।’

ফরিদপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিষ্ণু পদ ঘোষাল বলেন, জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর আমার পদ মর্যাদা একই। যার কারণে জিলা স্কুলের প্রশাসনিক বিষয়গুলো প্রধান শিক্ষক ও জেলা প্রশাসক মহোদয় দেখেন।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও ফরিদপুর জিলা স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, জিলা স্কুলের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা করে স্কুলটির আধুনিকায়ন, সমস্যা ও সংকটের বিষয়ে পরিকল্পনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হবে। আর মাঠে জলাবদ্ধতার বিষয়ে আমি সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেব।

পল্লীকবির স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুর জিলা স্কুলে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া

প্রাক্তন ছাত্রদের কথা

স্কুলের আরেক প্রাক্তন ছাত্র স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান ১৯৬৩ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। জিলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে তিনি তখনকার অনেক স্মৃতিচারণ করে জাগো নিউজকে বলেন, তখনকার সময় স্কুলে বিদ্যুৎ ছিল না। গরমের সময় পাঙ্খা ছিল। টানা পাঙ্খা। একজন লোক প্রধান শিক্ষকের রুমের শেষ মাথায় দেওয়াল ঘিরে বসে থাকতেন আর উপরে লাল কাপড়ের টানা পাটির মতো কাঠের ওপরে ঝুলানো থাকতো, দোলনার মতো দড়ি দিয়ে টানতো। পাঙ্খা টানাওয়ালাদের পদও ছিল। তারা পাঙ্খা টানতো, আর আমরা ক্লাস করতাম।

তিনি বলেন, তখন যারা শিক্ষক ছিলেন খুবই নামকরা ছিলেন। যেমন- সিদ্দিকুর রহমান সাহেব, রিয়াজ উদ্দিন সাহেব। তারা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তখন স্যারদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, কেউ অঙ্ক, কেউ ইংরেজি, কেউ বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল পড়াতেন। তখন একটা শৃঙ্খলা ছিল। তখন সকাল নয়টার মধ্যে স্কুলে হাজির হতে হতো।

তিনি বলেন, তখন এখনকার সময়ের মতো কোচিংয়ের প্রয়োজন হতো না বা প্রাইভেট পড়ার রেওয়াজ ছিল না। স্কুল জীবনের অনেক স্মৃতি আছে, তারমধ্যে শিক্ষকরা তখন বেত রাখতেন, ডাস্টার রাখতেন। তখনকার এমন কোনো ছাত্র পাওয়া যাবে না যার কানের লতি ধরে টানেননি শিক্ষকরা। আবার কানের লতির পাশে চুল ধরে টান, চড়-থাপ্পড় খায় নাই, ডাস্টারের বাড়ি খায়নাই এমন ছাত্র পাওয়া যাবে না। যে ফার্স্ট হতো সেও মার খেতো।

বর্তমান সময়ের পড়ালেখার মান নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান বলেন, গত ২৫-৩০ বছর যাবৎ সবচেয়ে বেশি অবক্ষয় হয়েছে। অবক্ষয় হওয়ার কারণটা হলো, শিক্ষকদের পেশাটাকে এখন আর শিক্ষকতার সেই মর্যাদায় ধরে রাখতে পারেনি। রাষ্ট্র কিংবা আমরাও ধরে রাখতে চেষ্টা করিনি। তার মূল কারণ হলো শিক্ষকরা এখন সবদিক দিয়েই অবহেলিত।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow