পাহাড়ের পথে তিনদিন: কেওক্রাডং থেকে দেবতাখুম

ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য শুধু জায়গা দেখা নয়—মানুষ, মুহূর্ত আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে নিজের ভেতরটাকে নতুন করে আবিষ্কার করা। আমাদের কেওক্রাডং ও দেবতাখুম ভ্রমণটা ঠিক তেমনই ছিল। যেন পাহাড়ের বুকের ভেতর দিয়ে তিনদিনের এক ছোট্ট জীবন। আমরা ছিলাম সাতজন। রংপুর থেকে এসেছিলেন অগ্রজপ্রতিম ডাক্তার দম্পতি—ডা. হরিপদ সরকার ও ডা. শিলা সরকার। একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, আরেকজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। দুজনেই শান্ত স্বভাবের মানুষ কিন্তু ভ্রমণপ্রিয়। ছিল জনস্বাস্থ্যকর্মী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাজিয়া ইসলাম—ব্যাপক অনুসন্ধিৎসু, তবে স্বভাবে একটু আত্মমগ্ন। তেজগাঁও কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পরিমল বাছাড় রবীন্দ্রনাথ গিলে খাওয়া পাবলিক—সারাক্ষণ রবীন্দ্রসংগীত গুনগুন করে। আর ছিলাম আমি আর আমার সৌখিন বউ ববি—যার কাছে ভ্রমণ মানেই রঙিন স্কার্ফ, নতুন খাবারের খোঁজ আর অবিরাম ছবি তোলা। এই পুরো ভ্রমণের আয়োজক ও পরিচালক ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী ও টিভি প্রডিউসার ত্রিদিব বর্মণ—যে ছবি তোলার ওস্তাদ। যেভাবে শরীর কাৎ করে ছবি তোলে, সেটা দেখতেই বেশি ভালো লাগে। তার রয়েছে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক, অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা আর সীমাহীন রসবোধ। গানও জানে। ত

পাহাড়ের পথে তিনদিন: কেওক্রাডং থেকে দেবতাখুম

ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য শুধু জায়গা দেখা নয়—মানুষ, মুহূর্ত আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে নিজের ভেতরটাকে নতুন করে আবিষ্কার করা। আমাদের কেওক্রাডং ও দেবতাখুম ভ্রমণটা ঠিক তেমনই ছিল। যেন পাহাড়ের বুকের ভেতর দিয়ে তিনদিনের এক ছোট্ট জীবন।

আমরা ছিলাম সাতজন। রংপুর থেকে এসেছিলেন অগ্রজপ্রতিম ডাক্তার দম্পতি—ডা. হরিপদ সরকার ও ডা. শিলা সরকার। একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, আরেকজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। দুজনেই শান্ত স্বভাবের মানুষ কিন্তু ভ্রমণপ্রিয়। ছিল জনস্বাস্থ্যকর্মী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাজিয়া ইসলাম—ব্যাপক অনুসন্ধিৎসু, তবে স্বভাবে একটু আত্মমগ্ন। তেজগাঁও কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পরিমল বাছাড় রবীন্দ্রনাথ গিলে খাওয়া পাবলিক—সারাক্ষণ রবীন্দ্রসংগীত গুনগুন করে। আর ছিলাম আমি আর আমার সৌখিন বউ ববি—যার কাছে ভ্রমণ মানেই রঙিন স্কার্ফ, নতুন খাবারের খোঁজ আর অবিরাম ছবি তোলা। এই পুরো ভ্রমণের আয়োজক ও পরিচালক ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী ও টিভি প্রডিউসার ত্রিদিব বর্মণ—যে ছবি তোলার ওস্তাদ। যেভাবে শরীর কাৎ করে ছবি তোলে, সেটা দেখতেই বেশি ভালো লাগে। তার রয়েছে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক, অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা আর সীমাহীন রসবোধ। গানও জানে। ত্রিদিব ছাড়া এমন সুন্দর ট্যুর সম্ভবই হতো না।

রমজান মাস হওয়ায় পুরো ভ্রমণজুড়েই আমরা পর্যটক খুব কম দেখেছি। অনেক জায়গায় এমন হয়েছে—পাহাড়, নদী, ঝরনা সব আছে কিন্তু মানুষ নেই; যেন পুরো প্রকৃতিটা শুধু আমাদের সাতজনের জন্যই অপেক্ষা করে ছিল। যেখানে গেছি, বেশিরভাগ সময় আমরাই ছিলাম একমাত্র পর্যটক। সেই কারণে এই ভ্রমণটা শুধু ঘুরে দেখা নয়, এক ধরনের গভীর নির্জনতার স্বাদ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়ে উঠেছিল। পাহাড়ের নীরবতা, বনের গন্ধ, পাহাড়ি নদীর মৃদু ছন্দে বয়ে যাওয়া—সবকিছু যেন আলাদা তাৎপর্য নিয়ে দেখা দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।

ঢাকা থেকে পাহাড়ের পথে
রাত ঠিক ১০টায় ঢাকার কলাবাগান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। এসি গাড়ির ভেতরে প্রথমে একটু চুপচাপ পরিবেশ ছিল। রাজধানী তখন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ছে। কিন্তু গল্প আর আড্ডায় আমরাই গাড়িটাকে জাগিয়ে রাখলাম। অন্য যাত্রীরা হয়তো একটু বিরক্ত হয়েছিল কিন্তু আমরা সেদিকে তেমন নজর দিইনি।

রাতের অন্ধকারে মহাসড়ক পেরিয়ে ভোরের দিকে যখন পাহাড়ি রাস্তা শুরু হলো, তখন জানালার বাইরে দৃশ্য বদলে গেল। আকাশে ফিকে আলো ফুটছে, পাহাড়ের ধূসর রেখা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে আমরা বান্দরবান পৌঁছলাম।

প্রথমে হোটেল গ্রিন ভিউয়ে গিয়ে একটু ফ্রেশ হলাম। তারপর সকালের নাস্তার জন্য গেলাম বম পাড়ায়। রমজান মাস হওয়ায় শহরের বেশিরভাগ হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ। বম পাড়ার এই হোটেলের নাস্তার টেবিলে ছিল গরম পরোটা, সেমাই, ডিম, ডাল আর সবজি। পাহাড়ি খাবারে একটা অদ্ভুত সতেজতা থাকে—মনে হয় যেন মাটির গন্ধ মিশে আছে। ত্রিদিব মজা করে বললেন, ‘এই নাস্তা খাওয়ার পর আগামী তিনদিন আমাদের না খেলেও চলবে!’ সবাই হেসে উঠলাম।

tour

কেওক্রাডংয়ের পথে
নাস্তা শেষ করে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আমরা রিজার্ভ জিপে উঠলাম। পাহাড়ি জিপ—যাকে সবাই ‘চান্দের গাড়ি’ বলে। রাস্তা শুরু হলো রুমার দিকে। রুমা বাজারে এসে আমাদের কিছুক্ষণ থামতে হলো। এখানে পাহাড়ে প্রবেশের অনুমতি নিতে হয়। কেওক্রাডং ও বগালেক এলাকায় যাওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী একজন স্থানীয় গাইড নিতে হয়। আমরা সেখান থেকেই একজন অভিজ্ঞ গাইড নিলাম। পাহাড়ের পথ, মানুষের বসতি, কোথায় থামতে হবে—সবকিছুই সে জানে।

সেখানে অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের অনেক হ্যাপা পোহাতে হলো। জাতীয় পরিচয়পত্রের সমস্ত তথ্য অনলাইনের ফরমে পূরণ করতে হয়। কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যা ভোগান্তির কারণ হয়ে দেখা দিলো। ডাটা সেভ দিলে মোবাইল হ্যাং হয়ে যায়। আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। মোট ৭ জনের তথ্য এন্ট্রি দিতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগল। আইডি কার্ডের ফটোকপি রেখে দিলে কিন্তু এই ঝামেলা এড়ানো যায়। অথবা এখানকার চেকপোস্টে যারা আছেন; তাদের এমন সফটওয়্যার থাকা দরকার, যেন আইডি নম্বর ক্লিক করলেই সব তথ্য চলে আসে। যা হোক, রমজানে পর্যটক কম হওয়ায় আমরা তুলনামূলক কম সময়ে ছাড়া পেলাম। যদি পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি থাকতো, তাহলে তো এখান থেকে ছাড়পত্র জোগাড় করতেই বেলা শেষ হয়ে যেত!

এরপর শুরু হলো আসল পাহাড়ি পথ। পাহাড়ি রাস্তা যেন কখনো আকাশে উঠে যায়, আবার কখনো গভীর উপত্যকায় নেমে যায়। নিচে তাকালে ছোট ছোট গ্রাম, সবুজ জুম ক্ষেত আর দূরের পাহাড়ের সারি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ১৭২ ফুট উঁচু কেওক্রাডং পাহাড়। সেখানে সারাদিন চলে মেঘের খেলা। পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলে গেছে রুমা-বগা লেক-ধুপানিছড়া সড়ক। এটা দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ি সড়ক। শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো কোথাও উঁচু পাহাড়ি ঢাল, কোথাও খাদের দিকে নেমে গেছে সড়কটি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অবারিত সৌন্দর্য। জিপের ভেতরে আমরা কখনো বিস্ময়ে চুপ হয়ে যাচ্ছি, আবার কখনো হইচই করছি। ত্রিদিব আনন্দে ছবি তুলে চলেছে।

দুপুরের শেষভাগে আমরা পৌঁছলাম বগালেকে। পাহাড়ের বুকের মধ্যে স্থির হয়ে থাকা এক নীলাভ হ্রদ। চারপাশে সবুজ পাহাড়ের প্রাচীর, মাঝখানে নিঃশব্দ জল। মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজের জন্য একটি আয়না বানিয়েছে। অপূর্ব সুন্দর হ্রদ বগা। বান্দরবানের রুমা উপজেলায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ২৮৬ ফুট উচ্চতায় এর অবস্থান। ঘিরে থাকা পাহাড়, অরণ্য, আকাশের অবারিত নীল আর মেঘের ছায়ায় হাজারো রং ও আলোর খেলা হ্রদজুড়ে। ফুরফুরে বাতাসে শান্ত জলে হালকা ঢেউ দেখছিলাম মুগ্ধ হয়ে।

বগালেকের পানিতে নেমে আমরা সবাই স্নান করলাম। পাহাড়ি পানির ঠান্ডা স্পর্শ শরীরের ক্লান্তি মুহূর্তে দূর করে দিলো। তারপর দুপুরের খাবার—গরম ভাত, মিষ্টি কুমড়ার লাবড়া, ডিমের ঝোল, আলু ভর্তা, কচুর তরকারি, ডাল।
ডা. হরিপদ বললেন, ‘এত সুস্বাদু ভাত আমি অনেক দিন খাইনি।’
অমনই শিলা বৌদি বললেন, ‘তার মানে আমার রান্না সুস্বাদু না?’
এ নিয়ে খানিকটা খুনসুটি হলো। আমরা মজা লুটছিলাম।

কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আমরা পৌঁছলাম কেওক্রাডংয়ে। পাহাড়ের সর্পিল পথ ধরে যতই আমরা চূড়ার দিকে এগোচ্ছিলাম, ততই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ছিলাম। অবশেষে যখন কেওক্রাডংয়ের মাটিতে পা রাখলাম, তখনো বুঝতে পারিনি—সামনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক অদ্ভুত মায়াবী রাত। রুমা উপজেলার পাহাড়টি যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। মারমা ভাষায় যার অর্থ ‘সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়’, সেই কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় পৌঁছানোর পথ যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনই রোমাঞ্চে ভরা।

tour

একসময় কেওক্রাডং জয় করা ছিল সত্যিই অসাধ্য সাধনের মতো। তখন কোনো পাকা রাস্তা ছিল না, ছিল না কোনো যান্ত্রিক যান। অভিযাত্রীদের পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে মাইলের পর মাইল ঝিরিপথ আর খাড়া জঙ্গল-পাহাড় মাড়িয়ে ট্রেকিং করতে হতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার পর শরীর যখন ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়তো, তখন দেখা মিলতো এই চূড়ার। কিন্তু সময় বদলেছে। দুর্গম সেই পাহাড়ের বুক চিরে এখন তৈরি হয়েছে সর্পিল রাস্তা। আজ ‘চান্দের গাড়ি’র ইঞ্জিনের গর্জনে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় চূড়ায়। অ্যাডভেঞ্চারের সেই আদিম কষ্ট হয়তো কমেছে কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য পাহাড় দেখার সুযোগ খুলে গেছে অনেকটাই।

বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু এই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হলো যেন আমরা আকাশের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। চারপাশে শুধু পাহাড় আর মেঘের সমুদ্র—দৃষ্টির সীমানাজুড়ে বিস্তৃত নয়ানাভিরাম দৃশ্য। দূরের পাহাড়গুলো মেঘের আড়ালে কখনো দেখা দিচ্ছে, আবার কখনো মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি যেন নিজেই নিজের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে।

সন্ধ্যার আগে সূর্যাস্তের সময় পাহাড়ের গায়ে লাল আলো পড়ে এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করেছিল। পাহাড়ের ঢাল আর মেঘের গায়ে সেই লাল আভা যেন পুরো পরিবেশকে স্বপ্নময় করে তুলেছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো ছবির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি।

তবে কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় পৌঁছে খুব বেশি ঘোরাঘুরির সুযোগ নেই। এখানে একটি সেনা চৌকি আছে আর নিরাপত্তার কারণে নির্দিষ্ট একটি জায়গার বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এই সতর্কতা স্বাভাবিক। কেওক্রাডং থেকে খুব বেশি দূরে নয় মিয়ানমারের সীমান্ত। পরিষ্কার রাতে পাহাড়ের ওপার থেকে মিয়ানমারের গ্রামগুলোর ক্ষীণ আলোও দেখা যায়। আরেক দিকে আছে ভারতের মিজোরাম সীমান্ত। আকাশে মেঘ কম থাকলে দূরের পাহাড়ের গায়ে মিজোরামের আলোর রেখাও চোখে পড়ে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে একসঙ্গে তিন দেশের ভূগোলের এমন উপস্থিতি ভ্রমণটাকে আরও রহস্যময় করে তোলে।

রাত কাটানোর জন্য আমরা একটি ছোট জুমঘরে থাকার ব্যবস্থা করলাম। মাটির মেঝে, সাধারণ বিছানা, আর কিছুটা দূরে পুরোনো ধরনের একটি বাথরুম। এত উঁচু পাহাড়ে পানির সংকট প্রবল, তাই গোসলের সুযোগ নেই। পাহাড়ের ঢালে মাচাংয়ের ওপর তৈরি সেই জুম ঘরটি ছিল বাঁশ, কাঠ আর চাটাই দিয়ে বানানো একেবারে সাধারণ একটি আশ্রয়। রাতের খাবারে ছিল গরম ভাত, পাহাড়ি মুরগি আর ঝাল সবজি। খাওয়া শেষে আমরা বাইরে এসে বসে রইলাম। মাথার ওপর অসংখ্য তারা আর চাঁদ—শহরের আকাশে এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না।

এ সময় ত্রিদিব বর্মন ধীরে ধীরে গেয়ে উঠলেন—‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে…; এরপর গাইলেন, জোছনা করেছে আড়ি, আসে না আমার বাড়ি, গলি দিয়ে চলে যায় লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি…’
গান, কবিতা আর কৌতুকে পাহাড়ের চূড়ায় বসে ছোট্ট এক সাংস্কৃতিক আসর জমে উঠল। কিন্তু রাত যত বাড়তে লাগল, ঠান্ডা বাতাসও তত জোরালো হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সবাই কম্বলের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলাম।

রাত যত গভীর হতে লাগল, জুম ঘরের বাঁশের মেঝেতে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ এক অদ্ভুত শিহরণ তৈরি করল। নিচে গভীর খাদ, ওপরে অনন্ত আকাশ—আর মাঝখানে আমরা কজন মানুষ। সেখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, নেই শহরের কৃত্রিম আলো। শুধু জুম ঘরের মেঝেতে পিঠ ঠেকিয়ে মেঘের আনাগোনা দেখার এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে মনে হচ্ছিল, মেঘেরা যেন এসে আমাদের ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

tour

রাত নামতেই কেওক্রাডং এক ভূতুড়ে অথচ মায়াবী রূপ ধারণ করে। এখানে বিদ্যুৎ নেই। পুরো পাহাড় তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে থাকে। কেবল রাত সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত জেনারেটর চালানো হয়। এই দুই ঘণ্টাই হলো মোবাইল চার্জ দেওয়া কিংবা নিজেদের একটু গুছিয়ে নেওয়ার সময়। ঠিক নয়টা বাজতেই যখন জেনারেটর বন্ধ হয়ে যায়; তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। সেই নীরবতার মধ্যে তারাভরা আকাশ এক অন্যরকম সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়।

ভোরবেলা পাহাড়ের ওপর সূর্য ওঠার দৃশ্য দেখার জন্য আমরা বের হলাম। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। নিচে মেঘের সমুদ্র—মনে হচ্ছিল আমরা যেন আকাশের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। সেই মেঘের সমুদ্রের ওপর দিয়ে ভোরের প্রথম লাল আভা পাহাড়ের গায়ে এসে পড়ছে।

৩২৩৫ ফুট উচ্চতায় জুম ঘরের সেই অনাড়ম্বর মেঝেতে কাটানো রাতটি আমাদের শিখিয়ে দিলো—বিলাসিতায় নয়, প্রকৃতির খুব কাছাকাছি মিশে থাকাতেই জীবনের আসল সার্থকতা। কেওক্রাডংয়ের মেঘ, পাহাড় আর নীরবতার মিতালি আমাদের মনে এক অপার্থিব স্মৃতি হয়ে চিরদিনের জন্য থেকে গেল।

সকাল নয়টায় খিচুড়ি আর ডিম ভুনা দিয়ে নাস্তা সেরে আমরা আবার জিপে উঠলাম। রওনা দেওয়ার আগে শেষবারের মতো চারপাশের পাহাড়গুলোর দিকে তাকালাম। সেই সময়ই চোখে পড়ল এক মন খারাপ করা দৃশ্য। পাহাড়ের নির্মল সৌন্দর্যের মাঝখানে একটি চারতলা কংক্রিটের ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। প্রকৃতির এই অপার্থিব পরিবেশের ভেতর এমন স্থাপনা যেন বড্ড বেমানান মনে হলো।

প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি করে এ ধরনের নির্মাণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রকৃতির সামান্যতম ক্ষতি না করে যদি পর্যটন গড়ে ওঠে, তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু আধুনিক সুযোগ-সুবিধার নামে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে তৈরি হওয়া স্থাপনা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে ধীরে ধীরে ম্লান করে দেয়। কেওক্রাডংয়ের মতো অনন্য সৌন্দর্যের জায়গাগুলোতে প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রাখাটাই হওয়া উচিত সবার প্রথম দায়িত্ব।

শেষবারের মতো পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তারপর নীরবে আমাদের ফেরার যাত্রা শুরু হলো। পথে দার্জিলিং পাড়ায় একটু বিরতি। ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। কাঠ-বাঁশের ঘর, হাসিমুখের মানুষ।

দুপুরে মাউন্টেন্ট রেস্টুরেন্টে খাওয়া—গরম ভাত, পাহাড়ি শাক, দেশি মুরগি আর বাঁশকোরির ঝোল।

রুমার কাছাকাছি পৌঁছতেই আমাদের চান্দের গাড়ি বিকল হয়ে গেল। চালক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, এটা মেরামত করতে ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগবে।

আমরা মুহূর্ত দেরী না করে সড়কের পাশে বয়ে চলা শঙ্খ নদীতে নেমে পড়লাম। নদীর পানিতে পা ভিজিয়ে বসে সূর্যাস্ত দেখলাম। লাল আকাশের প্রতিফলন নদীর জলে পড়েছে। চারপাশে পাহাড়।

এক সময় গাড়ি ঠিক হলো। আমরা রওয়ানা হলাম। রুমায় চেক পোস্টে টোকেন জমা দিয়ে রওয়ানা হলাম বান্দরবান শহরের দিকে। গন্তব্য ব্লিজ ইকো ভিলেজ।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমরা বান্দরবানের ব্লিজ ইকো ভিলেজে পৌঁছালাম। পাহাড়ের ঢালে তৈরি এই ইকো রিসোর্টটা যেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে। কাঠের কটেজ, চারপাশে গাছপালা, দূরে পাহাড়ের কালো রেখা। রাতের খাবার শেষে আবার আড্ডা। গল্প, হাসি আর স্মৃতি—সব মিলিয়ে সময় দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।

দেবতাখুমের অভিযান
পরদিন বম পাড়ায় সকালের নাস্তা শেষ করেই আমরা রওয়ানা দিলাম দেবতাখুমের দিকে। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার গভীর অরণ্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি—দেবতাখুম। চারদিকে উঁচু পাথুরে পাহাড়, আর মাঝখানে প্রায় ৬০০ ফুট লম্বা স্বচ্ছ সবুজ পানির এক রহস্যময় জলাধার। জায়গাটি এতটাই শান্ত ও নির্জন যে মনে হয়, বহু বছর ধরে এখানে কোনো মানুষের কোলাহল পৌঁছায়নি।

tour

আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল বান্দরবান শহর থেকে রোয়াংছড়ির দিকে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে ‘চান্দের গাড়ি’তে ছাদখোলা ভ্রমণ যেন আলাদা এক আনন্দ। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ পাহাড়ের ঢেউ। সেই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছিল—প্রকৃতির তুলনায় মানুষ কতই না ক্ষুদ্র! প্রায় এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছলাম রোয়াংছড়ি উপজেলায়।

দেবতাখুমে যেতে হলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। প্রথমে রোয়াংছড়ি থানায় জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জমা দিতে হয় এবং একজন স্থানীয় গাইড নিতে হয়। এরপর আমরা রওয়ানা দিলাম কচ্ছপতলী বাজারের দিকে। পথে লিরাগাঁও সেনাবাহিনী ক্যাম্পে আবার রিপোর্ট করতে হলো। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হয়—দুপুর ১২টার পর আর কেউ সেখানে চেক-ইন করতে পারে না।

ক্যাম্পে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই শুরু হলো আসল অভিযান। কচ্ছপতলী থেকে দেবতাখুম পর্যন্ত মাঝারি ধরনের ট্রেকিং করতে হয়। কখনো ঝিরিপথ, কখনো কাদা মাটির সরু পথ, আবার কোথাও উঁচু পাহাড়ি ঢাল। প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটার পর আমরা পৌঁছলাম শীলবান্ধা পাড়ায়। সেখানে একটি ছোট ঝরনার কলকল শব্দ আর চারপাশের সবুজ উপত্যকার দৃশ্য মুহূর্তেই আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিলো।

সেখান থেকে আরও প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর অবশেষে দেখা মিলল সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত দেবতাখুমের। দুই পাশে বিশাল পাথুরে পাহাড়, আর মাঝখানে শান্ত সবুজ পানি। স্থানীয়দের মতে, এই খুমের কিছু জায়গায় পানির গভীরতা ৫০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত।

খুমের ভেতরে ঘুরতে হলে বাঁশের ভেলা আর লাইফ জ্যাকেট নিতে হয়। জনপ্রতি ১৫০ টাকা দিয়ে আমরা বোটে চড়ে খুমের গহীনে ঢুকে পড়লাম। বোট যত ভেতরে এগোতে লাগল, মনে হচ্ছিল বাইরের পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। চারদিকে সুনসান নীরবতা—শোনা যাচ্ছে শুধু পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়া পানির টুপটাপ শব্দ আর বোটের দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ। সূর্যের আলোও খুব কম ঢোকে, তাই পুরো জায়গাটির মধ্যে এক ধরনের রহস্যময় আবহ তৈরি হয়েছে।

বোটে করে প্রায় ৬০০ ফুট পথ পাড়ি দিতে আমাদের প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগল। কোথাও সরু গিরিখাত, কোথাও বিশাল পাথরের দেওয়াল। খুমের শেষ প্রান্তে গিয়ে পানির স্রোত আর পাথরের দৃশ্য দেখে মনে হলো যেন কোনো ছোট্ট সমুদ্রের অংশ চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।

দেবতাখুমের প্রতিটি বাঁক যেন নতুন এক বিস্ময়। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে যখন সূর্যের আলো পানির ওপর পড়ে; তখন পুরো খুম সোনালি আভায় ঝলমল করে ওঠে। মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে এই নিস্তব্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়—আমরা যেন প্রকৃতির এক আদিম জগতে এসে পড়েছি।

চান্দের গাড়িতে পাহাড়ি রাস্তার রোমাঞ্চ, ঝিরিপথে ট্রেকিং আর শেষে নিস্তব্ধ খুমে ভেলায় ভেসে বেড়ানো—সব মিলিয়ে দেবতাখুম ভ্রমণ সত্যিই এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। দিন শেষে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, যেন কোনো রহস্যময় জগৎ ঘুরে এলাম।

বিকেলে কচ্ছপতলিতে ফিরে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম। তারপর আবার রওয়ানা হলাম বান্দরবান শহরের পথে। গাড়িতে ওঠার আগে শেষবারের মতো পাহাড়গুলোর দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছিল, এই তিনদিনে আমরা শুধু পাহাড় দেখিনি—আমরা একে অপরকে আরও ভালোভাবে চিনেছি, একসঙ্গে হেসেছি, আর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করেছি।

সন্ধ্যায় বান্দরবান শহরে পৌঁছে আমরা এককাপ গরম চা খেলাম। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও মনে ছিল অদ্ভুত প্রশান্তি। রাত দশটার দিকে আমরা ঢাকা ফেরার গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলে মনে হলো—এই তিনদিনের ভ্রমণ শুধু পাহাড় দেখা নয় বরং বন্ধুত্ব, হাসি আর স্মৃতিতে ভরা অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ভোরে যখন ঢাকা পৌঁছলাম, তখনো মনে হচ্ছিল পাহাড় যেন আমাদের সঙ্গে রয়ে গেছে! আমাদের উদার হওয়ার মন্ত্র শেখাচ্ছে!

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow