পাহাড়-নদী-লোককথার জনপদ, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সবুজে মোড়া পাহাড়-টিলা, কাচের মতো স্বচ্ছ নদীর পানি আর ওপারে মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণি। প্রকৃতি যেন দুই হাত ভরে সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়েছে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দাকে। ইতিহাস, লোককাহিনি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ জনপদে রয়েছে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লোককাহিনি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এমন অনন্য সমন্বয় থাকা সত্ত্বেও পর্যটন খাতে কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটেনি কলমাকান্দার। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পর্যটকবান্ধব সুযোগ-সুবিধার অভাবে অপার সম্ভাবনাময় এ অঞ্চল এখনও জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। পাহাড় আর স্বচ্ছ নদীর মায়াবী সৌন্দর্য ভারত সীমান্তঘেঁষা কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ তিনটি ইউনিয়ন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কোলঘেঁষা। এর মধ্যে রংছাতির চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন এলাকা পাহাড়ের ভাজে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। যেখানে আছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, পাহাড়ের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা রং-বেরঙের পাথর, ঝরণার মতো স্বচ্ছ জলরাশি ও সিলিকা

পাহাড়-নদী-লোককথার জনপদ, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সবুজে মোড়া পাহাড়-টিলা, কাচের মতো স্বচ্ছ নদীর পানি আর ওপারে মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণি। প্রকৃতি যেন দুই হাত ভরে সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়েছে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দাকে। ইতিহাস, লোককাহিনি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ জনপদে রয়েছে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লোককাহিনি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এমন অনন্য সমন্বয় থাকা সত্ত্বেও পর্যটন খাতে কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটেনি কলমাকান্দার। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পর্যটকবান্ধব সুযোগ-সুবিধার অভাবে অপার সম্ভাবনাময় এ অঞ্চল এখনও জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

পাহাড় আর স্বচ্ছ নদীর মায়াবী সৌন্দর্য

ভারত সীমান্তঘেঁষা কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ তিনটি ইউনিয়ন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কোলঘেঁষা। এর মধ্যে রংছাতির চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন এলাকা পাহাড়ের ভাজে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। যেখানে আছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, পাহাড়ের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা রং-বেরঙের পাথর, ঝরণার মতো স্বচ্ছ জলরাশি ও সিলিকা বালুর চর। সবকিছু মিলে যেন নৈসর্গিক রূপের রহস্যে ঘেরা ও নানা কিংবদন্তিতে সমৃদ্ধ এক জনপদ; যা খুলে দিতে পারে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা।

চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবনের একটু দূরেই লেংগুরা ইউনিয়নের সাত শহীদের মাজার। আর এসব এলাকার ঠিক উত্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণি। সীমান্তের যে-কোনো প্রান্তে দাঁড়ালেই ধনুকের মতো বাঁকানো পাহাড়পুঞ্জের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করা যায়। সেই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ওই স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যান। অবশ্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পর্যটকদের ভ্রমণে কিছুটা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফের সার্বক্ষণিক কড়া পাহারা চলে। চন্দ্রডিঙা থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে হাতিবেড় এলাকায় বসানো হয়েছে বিজিবি চেকপোস্ট।

পাহাড়-নদী-লোককথার জনপদ, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

লোককথায় ঘেরা চন্দ্রডিঙা

হাতিবেড় গ্রামসংলগ্ন চন্দ্রডিঙা পাহাড়টিকে নিয়ে এলাকায় একটি ঐতিহাসিক জনশ্রুতি রয়েছে। পঞ্চদশ শতকে রচিত মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যতম চরিত্র চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে এ লোককাহিনি। বিদেশি ধনাঢ্য বণিক চাঁদ সওদাগর বাণিজ্য করতে এসে এই স্থানে সর্পদেবী মনসার অভিশাপে তার ডিঙি বা নৌকা আটকে যায়। এরপর থেকে স্থানটির নামকরণ হয় চন্দ্রডিঙা। অবশ্য এর সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ বা ইতিহাস পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয়রা লোককাহিনিটি বিশ্বাস করে আসছেন যুগ যুগ ধরে।

পাহাড়টির মাঝখানে বিশাল পাথরের আংশিক অংশ নৌকার মাস্তুলের মতো দেখতে হওয়ায় সেখানে প্রতিবছর হাজং ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মনসাপূজা ও চাঁদ সওদাগরের পূজা করে থাকেন। এ ছাড়া প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার সেখানে ধূপ ও প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়। সেখানে একটি শতবর্ষী বটগাছ, গাছের নিচে ছড়া ও কাছে ঝরনা থাকায় স্থানটি দর্শনার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

সেখানে ঘুরতে যাওয়া জেলার পূর্বধলা উপজেলার তৌহিদ খান রাসেল বলেন, এ স্থানটি প্রকৃতির আশীর্বাদ। প্রায়ই পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসি। বছরজুড়েই লোকজনের আনাগোনা ঘটে। তবে শুকনো মৌসুমে ভিড় বাড়ে। আইন মেনে পরিবারের লোকজন নিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করি।

পাহাড়-নদী-লোককথার জনপদ, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

এলাকাটিতে গিয়ে দেখা গেছে, বিজিবির চেকপোস্টের কাছে বেশ কিছু দোকান ও খাবার হোটেল গড়ে উঠেছে। শত শত পর্যটকের ভিড় জমেছে। নিয়ম মেনে তারা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।

পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা মহাদেও

চন্দ্রডিঙা থেকে ১৫ মিনিটের পথ পাতলাবন সীমান্ত। একটু এগোলেই চোখে পড়বে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝরনাধারার মতো নেমে আসা মহাদেও নদ। নদটির উত্তর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সবুজ অরণ্যে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়। যত দূর চোখ যায় ধনুকের মতো বাঁকা পাহাড়ের সারি যেন মিশে গেছে মেঘমালার সঙ্গে।

মহাদেও নদের রয়েছে কাচের মতো পরিষ্কার পানির ঐতিহ্য। এর বুকজুড়ে পড়ে আছে সমুদ্রের বালুরাশির মতো সিলিকা বালুর স্তর। শুষ্ক মৌসুমে পর্যটকেরা চাইলে গা ভিজিয়ে নিতে পারেন, এমনকি হাঁটতেও পারেন বালুরাশিতে। বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা নদের খরস্রোত বহু শতবর্ষ ধরে বয়ে আনছে বালু, নুড়ি পাথর আর কয়লা। এসব এখানকার মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস।

স্থানীয়দের ভাষায়, মহাদেওর পানি আর পাহাড়ের দৃশ্য একবার দেখলে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে।’

সাত শহীদের মাজার ও ফুলেশ্বরীর সৌন্দর্য

পাতলাবন থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ লেংগুরা ইউনিয়নের সাত শহীদের মাজার। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এ স্থান শুধু ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এই মাজারটির সংলগ্ন মেঘালয় থেকে নেমে আসা ফুলেশ্বরী নদী। এর আগে চমৎকার দুটি পাহাড় রয়েছে, যেখান থেকে ভারতের অনেক পাহাড় দেখা যায়। নদীটি যেন সাপের মতো পেঁচিয়ে আছে দুপাশ। হঠাৎ দেখলে মনে হবে এটি কোনো স্বপ্নপুরীর রাজ্য।

পাহাড়-নদী-লোককথার জনপদ, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা নদের খরস্রোতের সঙ্গে বহু শতবর্ষ ধরে বয়ে আনছে বালু, নুড়ি পাথর আর কয়লা। এসব এখানকার মানুষের জীবিকার উৎস। নদের বালু নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত হয়। এতে পর্যটকেরা সৌন্দর্য আরও উপভোগ করতে পারছেন।

পাতলাবন এলাকার বাসিন্দা আরমান আলিফ ও ঝুমুর মারাক বলেন, পাতলাবন, বেতগড়া, চন্দ্রডিঙা ও এর পাশে গোপালবাড়ির চেংগ্নী এলাকা, পাশের ইউনিয়ন লেংগুরার ফুলবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধে ‘সাত শহীদের’ মাজার এলাকাসহ সবুজে আচ্ছাদিত ছোট-বড় পাহাড় আর ওপরে মেঘালয়ের পাহাড় চোখের তৃষ্ণা মেটায় পর্যটকদের। চেংগ্নী পাহাড়ে হাজং সম্প্রদায়ের গোপালপুর মন্দিরে ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী মেলা হয়ে আসছে। ওই সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষের ভিড় আরও বাড়ে।

গাজীপুর থেকে আসা পর্যটক কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘আমি অনেক স্থান দেখেছি। চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন একটু আলাদা। এমন নীরব মনোমুগ্ধকর এলাকা আর দেখিনি। মন প্রশান্ত করতে চাইলে যে কেউ ঘুরে যেতে পারেন। অনেক ভিডিও ও ছবি তুলেছি। তবে বিজিবি নিষেধ করায় সব এলাকায় ঘুরতে যেতে পারিনি।’

পাহাড়-নদী-লোককথার জনপদ, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

তিনি জানান, পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা, ভালো হোটেল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হলে স্থানটি আরও আকর্ষণীয় হবে।

পর্যটন শিল্প ঢেলে সাজানোর সরকারি উদ্যোগ

নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা-দুর্গাপুরে অনেক সুন্দর সুন্দর পর্যটন এলাকা রয়েছে। তার মধ্যে কলমাকান্দা সীমান্তে চন্দ্রডিঙা, পাতলাবন ও সাত শহীদের মাজার অন্যতম।’

তিনি বলেন, এলাকাগুলোতে যাতে পর্যটকেরা সহজে যেতে পারেন, সেজন্য তাদের নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে যাতায়াত সহজ করতে সোমেশ্বরী ও গণেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণের জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলের সামগ্রিক পর্যটন শিল্পকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে ঢেলে সাজাতে সরকার নানামুখী দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।

এইচ এম কামাল/কেএইচকে/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow