পিরিয়ডের রক্তেই মিলতে পারে লুকিয়ে থাকা নানা রোগের ইঙ্গিত
পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবকে সাধারণত নারীর স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্রতি মাসে শরীর থেকে বের হওয়া এই রক্ত শুধু প্রজনন স্বাস্থ্যের নয়, বরং শরীরের নানা রোগ ও জটিলতার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও বহন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ুর ক্যানসার, থাইরয়েডজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিস, ভিটামিনের ঘাটতি এমনকি পরিবেশ দূষণের প্রভাব সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে মাসিকের রক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে। দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার পর রোগ শনাক্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এমা ব্যাকলুন্ড। তিনি ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক মাসিকের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। তার বয়স যখন ১১, তখনই প্রতি মাসে তীব্র পেটব্যথার কারণে তিনি হাসপাতালে নেওয়ার জন্য মায়ের কাছে অনুরোধ করতেন। স্কুলে যাওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া-সবকিছুই তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে তার ১৩ বছর সময় লেগে যায়। পরে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত। এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে জরায়ুর আস্তরণে
পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবকে সাধারণত নারীর স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্রতি মাসে শরীর থেকে বের হওয়া এই রক্ত শুধু প্রজনন স্বাস্থ্যের নয়, বরং শরীরের নানা রোগ ও জটিলতার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও বহন করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ুর ক্যানসার, থাইরয়েডজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিস, ভিটামিনের ঘাটতি এমনকি পরিবেশ দূষণের প্রভাব সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে মাসিকের রক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার পর রোগ শনাক্ত
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এমা ব্যাকলুন্ড। তিনি ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক মাসিকের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। তার বয়স যখন ১১, তখনই প্রতি মাসে তীব্র পেটব্যথার কারণে তিনি হাসপাতালে নেওয়ার জন্য মায়ের কাছে অনুরোধ করতেন। স্কুলে যাওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া-সবকিছুই তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে তার ১৩ বছর সময় লেগে যায়। পরে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত।
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে জরায়ুর আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯ কোটি মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়।
২০২৩ সালে ‘নেক্সটজেন জেন’ নামের একটি বায়োটেক প্রতিষ্ঠান গবেষণার জন্য এমার মাসিকের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে। এমা বিশ্বাস করেন, তার এই অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে অনেক নারীর দ্রুত রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ পিরিয়ডের রক্ত?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহু শতাব্দী ধরে প্রস্রাব, মল ও শিরার রক্ত পরীক্ষা করা হলেও মাসিকের রক্ত তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত ছিল। গবেষকদের মতে, পিরিয়ডের রক্তের প্রায় অর্ধেক সাধারণ রক্ত হলেও বাকি অংশে থাকে বিভিন্ন ধরনের কোষ, হরমোন, প্রোটিন, ব্যাকটেরিয়া এবং প্রজননতন্ত্রের নানা অংশ থেকে আসা জৈব উপাদান।
এই উপাদানগুলো জরায়ু, ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং যোনির স্বাস্থ্য সম্পর্কে এমন তথ্য দিতে পারে, যা সাধারণ রক্ত বা লালার নমুনা থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে অনেক গবেষক একে ‘প্রাকৃতিক বায়োপসি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
আরও পড়ুন:
- ব্রণের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে মানসিক চাপ
- মাসিক, নীরব রক্তক্ষরণের ভেতর এক সভ্যতার আয়না
- জানেন কি টাকার মতো জমিয়ে রাখা যায় ঘুমও
এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তে নতুন সম্ভাবনা
এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয়ের প্রচলিত পদ্ধতি হলো ল্যাপারোস্কোপি, যেখানে শরীরের ভেতরে ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করতে হয়। এটি সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জন্য কষ্টকর। এ কারণেই গবেষকেরা সহজ ও কম আক্রমণাত্মক বিকল্প খুঁজছেন।
‘নেক্সটজেন জেন’ ২০১৪ সাল থেকে ৩৩০ জনের বেশি নারীর দুই হাজারেরও বেশি মাসিকের নমুনা বিশ্লেষণ করেছে। তাদের লক্ষ্য হলো এমন বায়োমার্কার খুঁজে বের করা, যা দেখে দ্রুত এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
নর্থওয়েল হেলথের ফেইনস্টাইন ইনস্টিটিউটের গবেষক ক্রিস্টিন মেটজের মতে, মাসিকের রক্ত জরায়ুর স্বাস্থ্যের এমন অনেক তথ্য দেয়, যা অন্য কোনো পরীক্ষায় সহজে পাওয়া যায় না।
কী কী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত নারীদের শরীরে কিছু বিশেষ রোগপ্রতিরোধী কোষের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে। একই সঙ্গে জরায়ুর টিস্যু মেরামতকারী কিছু কোষে অতিরিক্ত প্রদাহের চিহ্নও দেখা যায়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু জিনের কার্যক্রমেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যা রোগ শনাক্তের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এসব তথ্য ব্যবহার করে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শুধু প্রজনন স্বাস্থ্য নয়
মাসিকের রক্ত নিয়ে গবেষণা এখন আর শুধু প্রজনন স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে-
- থাইরয়েডের কার্যকারিতার পরিবর্তন
- ডায়াবেটিস
- অটোইমিউন রোগ
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস
- লুপাস
- মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস
এসব সমস্যারও কিছু জৈবিক চিহ্ন মাসিকের রক্তে পাওয়া যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিউভিনের গবেষণায় দেখা গেছে, মাসিকের রক্তে থাকা গ্লুকোজের মাত্রা শরীরের সামগ্রিক রক্তে শর্করার অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই গবেষণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি মাসিকের রক্ত ব্যবহার করে শর্করা পরীক্ষার একটি পদ্ধতিও চালু করেছে।
ক্যানসার ও সংক্রমণ শনাক্তেও সম্ভাবনা
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য দায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) শনাক্তকরণ। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ ধরনের প্যাডে সংগৃহীত মাসিকের রক্তের নমুনা ব্যবহার করে এই ভাইরাস শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ক্ল্যামাইডিয়া ও গনোরিয়ার মতো যৌনবাহিত সংক্রমণ শনাক্ত করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভিটামিনের ঘাটতি ও পরিবেশ দূষণের প্রভাব
বার্লিনভিত্তিক স্টার্টআপ ‘দ্যব্লাড’-এর গবেষকেরা বলছেন, মাসিকের রক্ত থেকে শরীরে ভিটামিন এ ও ভিটামিন ডি-এর মাত্রা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের এক গবেষণায় মাসিকের রক্তে ফেনল, প্যারাবেন, থ্যালেটসহ বিভিন্ন পরিবেশ দূষণকারী রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতিও শনাক্ত করা হয়েছে। ফলে একজন নারী কী ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, সে বিষয়েও মূল্যবান তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
কেন এতদিন অবহেলিত ছিল এই গবেষণা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীস্বাস্থ্য গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও গুরুত্বের অভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য গবেষণার মোট অর্থায়নের খুবই সামান্য অংশ নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গবেষণায় ব্যয় হয়। ফলে মাসিকের রক্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক উপাদান নিয়ে গবেষণাও অনেক পিছিয়ে ছিল। এ ছাড়া সামাজিক কুসংস্কার ও ঋতুস্রাব নিয়ে অস্বস্তিকর মনোভাবও গবেষণার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
সামনে কী আসছে?
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাসিকের রক্তভিত্তিক ডায়াগনস্টিক কিট তৈরির কাজ চলছে। গবেষকেরা আশা করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাড়িতে বসেই মাসিকের রক্ত পরীক্ষা করে এন্ডোমেট্রিওসিসসহ বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গড়ে উঠছে বিশেষায়িত মাসিক বায়োব্যাংক, যেখানে গবেষণার জন্য বিপুল পরিমাণ নমুনা সংরক্ষণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, এই গবেষণা সফল হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীরা অনেক রোগ দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগ পাবেন। ফলে বছরের পর বছর অজানা যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রয়োজন হবে না এবং চিকিৎসাও শুরু করা যাবে অনেক আগেই।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, নেক্সটজেন জেন, নর্থওয়েল হেলথের ফেইনস্টাইন ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল রিসার্চ এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিবেদন
জেএস/
What's Your Reaction?