পুকুরে ঘেরা কুতুবদিয়ায় থামছে না শিশুদের মৃত্যুর মিছিল
চারদিকে পানি, ঘরের আঙিনায় পুকুর, খাল, ডোবা। কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় শিশুদের জন্য যেন প্রতিটি বাড়ির পাশেই লুকিয়ে আছে অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ। গত এক বছরেই পানিতে ডুবে মারা গেছে অন্তত ৬০ শিশু। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। মাত্র ছয় ইউনিয়নের ছোট এই দ্বীপ উপজেলা সাগর ও নদীঘেরা। এর ভেতরে অসংখ্য পুকুর, খাল, চিংড়ি ও লবণচাষের মাঠের গর্ত, বৃষ্টির পানি জমে থাকা ডোবা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। অধিকাংশ জলাশয়ই খোলা ও অরক্ষিত। শিশুদের খেলাধুলার জায়গা না থাকায় তারা ঘরের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে। আর অসতর্কতার এক মুহূর্তেই ঘটে যাচ্ছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে হাসপাতালে আনা হয়েছে ৫৩ জনকে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩, ফেব্রুয়ারিতে ৩, মার্চে ২, এপ্রিলে ২, মে মাসে ৪, জুনে ৬, জুলাইতে ৫, আগস্টে ৪, সেপ্টেম্বরে ৬, অক্টোবরে ৪, নভেম্বরে সর্বোচ্চ ৯ এবং ডিসেম্বরে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ডুবে যাওয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় আনা দুই শিশু চিকিৎসায় বেঁচে যায়। তবে এ হিসাব শুধু স
চারদিকে পানি, ঘরের আঙিনায় পুকুর, খাল, ডোবা। কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় শিশুদের জন্য যেন প্রতিটি বাড়ির পাশেই লুকিয়ে আছে অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ। গত এক বছরেই পানিতে ডুবে মারা গেছে অন্তত ৬০ শিশু।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। মাত্র ছয় ইউনিয়নের ছোট এই দ্বীপ উপজেলা সাগর ও নদীঘেরা। এর ভেতরে অসংখ্য পুকুর, খাল, চিংড়ি ও লবণচাষের মাঠের গর্ত, বৃষ্টির পানি জমে থাকা ডোবা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। অধিকাংশ জলাশয়ই খোলা ও অরক্ষিত। শিশুদের খেলাধুলার জায়গা না থাকায় তারা ঘরের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে। আর অসতর্কতার এক মুহূর্তেই ঘটে যাচ্ছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে হাসপাতালে আনা হয়েছে ৫৩ জনকে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩, ফেব্রুয়ারিতে ৩, মার্চে ২, এপ্রিলে ২, মে মাসে ৪, জুনে ৬, জুলাইতে ৫, আগস্টে ৪, সেপ্টেম্বরে ৬, অক্টোবরে ৪, নভেম্বরে সর্বোচ্চ ৯ এবং ডিসেম্বরে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ডুবে যাওয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় আনা দুই শিশু চিকিৎসায় বেঁচে যায়।
তবে এ হিসাব শুধু সরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত সীমিত। প্রত্যন্ত এলাকায় স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছে নেওয়া অন্তত পাঁচ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে গত এক বছরে অন্তত ৬০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তুলনামূলক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৬। আর ২০১৮ সালে পানিতে ডুবে এক বছরে মারা যায় ৮০ শিশু।
গত সেপ্টেম্বরে পানিতে ডুবে মারা যায় ছয় শিশু। এর মধ্যে দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নে এক দিনেই তিন শিশুর মৃত্যু হয়।
স্থানীয়রা জানান, পরিবারের অগোচরে বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে এমন দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুতুবদিয়া স্বেচ্ছাসেবী সমন্বয় ফোরামের প্রতিনিধি সেজাউল করিম মনি বলেন, ২০২২ সাল থেকে আমরা মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে প্রচার, চেয়ারম্যানদের স্মারকলিপি দেওয়া- নানা উপায়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দরিদ্র পরিবারে বাবা-মা জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত থাকেন। সব সময় ছোট শিশুদের ওপর নজর রাখা সম্ভব হয় না।
তার মতে, প্রতিটি পুকুর ও খোলা জলাশয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী না দিলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বসতঘরের একেবারে গা ঘেঁষেই গভীর পুকুর। কোথাও নেই বেড়া, নেই সতর্কবার্তা। লবণচাষ ও মাছচাষের জন্য খোঁড়া গর্তে সারাবছরই পানি জমে থাকে। অনেক সময় বাড়ির উঠানে রাখা বড় পানির পাত্রেও ছোট শিশুরা পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
দাফনেও জটিলতা:
পানিতে ডুবে শিশু মারা গেলে থানায় অবহিত করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হয়। এতে শোকাহত পরিবারগুলোকে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আগে হাসপাতালের চিকিৎসকের মৃত্যু সনদ নিয়ে দ্রুত দাফন সম্পন্ন করা যেত। এখন নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পড়ে থাকে বলে অভিযোগ স্বজনদের।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল হক বলেন, প্রতিটি অপমৃত্যুর ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা এড়াতে প্রাথমিক তদন্ত শেষে অভিভাবকের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয় বলেও জানান তিনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হাসান বলেন, সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়মিত অভিভাবকদের সতর্ক করা হচ্ছে। কিন্তু সচেতনতার ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবারে তিন থেকে চারটি সন্তান থাকায় মায়েরা একসঙ্গে সবার দিকে খেয়াল রাখতে পারেন না। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম দুর্বল থাকাও একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন।
স্থানীয়দের ভাষায়, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা এত ঘনঘন ঘটছে যে তা যেন এক ধরনের নীরব স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মাঝেমধ্যে সংবাদ প্রকাশ হলেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ির পাশের পুকুরে বেড়া দেওয়া, শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলাধুলার স্থান তৈরি, অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি নজরদারি জোরদার করা গেলে এই মৃত্যুর হার অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে কার্যকর উদ্যোগ না এলে কুতুবদিয়ার অসংখ্য পুকুর, খাল ও ডোবা শিশুদের জন্য ‘ডেথ জোন’ হয়েই থাকবে- এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।
What's Your Reaction?