পোশাক খাতে নবায়নযোগ্য শক্তি নিশ্চিত করতে ১৩ হাজার কোটি বিনিয়োগ প্রয়োজন

তৈরি পোশাক খাতে টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলোতে ১৫ হাজার ২টি যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে। এর ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। সঠিক মডেল অনুযায়ী যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ মেগাওয়াট ঘণ্টা পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে উপস্থাপিত সিপিডির গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে শিল্প কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিযোগিতামূলক কৌশল হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি’ শীর্ষক গবেষণাটি তৈরি পোশাক খাতের ৩৫০টি কারখানার তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামি মোহাম্মদ ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আতিকুজ্জামান শাজিদ। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্বে অনু

পোশাক খাতে নবায়নযোগ্য শক্তি নিশ্চিত করতে ১৩ হাজার কোটি বিনিয়োগ প্রয়োজন

তৈরি পোশাক খাতে টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

এ বিনিয়োগের মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলোতে ১৫ হাজার ২টি যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে। এর ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। সঠিক মডেল অনুযায়ী যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ মেগাওয়াট ঘণ্টা পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে উপস্থাপিত সিপিডির গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে শিল্প কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিযোগিতামূলক কৌশল হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি’ শীর্ষক গবেষণাটি তৈরি পোশাক খাতের ৩৫০টি কারখানার তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামি মোহাম্মদ ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আতিকুজ্জামান শাজিদ।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বিজিএমইএর সহসভাপতি ব্যারিস্টার বিদ্যা অমৃত খান এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণায় বলা হয়, তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ১৫.৪ শতাংশের জন্য দায়ী। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার রয়েছে। তবে বর্তমান প্রযুক্তি কাঠামোয় শুধু নতুন যন্ত্রপাতি যুক্ত করলেই জ্বালানি ব্যবহার কমবে না; বরং মূলধন ও জ্বালানি ব্যবহারের মধ্যে পরিপূরক সম্পর্ক থাকায় বিদ্যমান প্রযুক্তিতে মেশিন বাড়লে জ্বালানি ব্যবহারও বাড়তে পারে।

সিপিডির হিসাবে, সবচেয়ে বড় কারখানাগুলোর জন্যই ডিকার্বনাইজেশনের বিনিয়োগ ব্যয়ের বড় অংশ প্রয়োজন হবে। গড়ে ২ হাজার ১০৫ জন কর্মী থাকা সবচেয়ে বড় কারখানাগুলো মোট কারখানার প্রায় এক-চতুর্থাংশ হলেও প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ব্যয়ের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ তাদের জন্য প্রযোজ্য। ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নে এসব কারখানায় গড়ে ব্যয় হবে ৭৩.১ কোটি টাকা। বিপরীতে গড়ে ১১১ জন কর্মী থাকা সবচেয়ে ছোট কারখানাগুলোর জন্য মোট ব্যয়ের অংশ মাত্র ০.৩ শতাংশ।

মেশিনের ধরনভেদেও জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনায় বড় পার্থক্য রয়েছে। পোশাক খাতের মেশিন সক্ষমতার প্রায় ৮৫ শতাংশ সেলাই বিভাগে থাকলেও এ বিভাগে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সম্ভাব্য সাশ্রয় মাত্র ২.৯ শতাংশ। কারণ সেলাইয়ের অনেক মেশিন প্রযুক্তিগতভাবে অপরিহার্য। অন্যদিকে মাত্র প্রায় ৫.৫ শতাংশ মেশিন থাকা কাটিং বিভাগ থেকে মোট জ্বালানি সাশ্রয়ের ২৭.৩ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, ওয়াশিং ও ডায়িং বিভাগ সবচেয়ে বেশি জ্বালানি-নিবিড়। এ বিভাগের জ্বালানি তীব্রতা পরের সর্বোচ্চ বিভাগের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে শুধু মেশিন প্রতিস্থাপন বা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে এ বিভাগের কার্বন নিঃসরণ পুরোপুরি কমানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্যাসচালিত বয়লার ও তাপীয় প্রক্রিয়ার কারণে এখানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তবে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে কারখানার জ্বালানি ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। গবেষণার হিসাবে ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ অফসেটে গড় ব্যয় প্রায় ৫.৫ শতাংশ কমতে পারে। আর ৩০ শতাংশ সৌর অফসেটের একটি উদাহরণমূলক পরিস্থিতিতে গড় ব্যয় কমতে পারে ১৫.৭ শতাংশ। বিভিন্ন কারখানায় সাশ্রয়ের পরিমাণ ৪.৪ থেকে ২৩.৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

সিপিডি বলছে, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে প্রযুক্তি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো অর্থায়ন। এসব কারখানার জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি কারখানায় কার্যক্ষমতা-ভিত্তিক এনার্জি অডিট ও মানসম্মত নিঃসরণ প্রতিবেদন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা প্রকল্পের ঋণ অনুমোদন সহজ করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মানসম্মত মূল্যায়ন কাঠামো তৈরির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

সংলাপের সূচনা বক্তব্যে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে সমাধান বাস্তবায়নের জন্য সরকারের একটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা প্রয়োজন।

দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশের শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কাজ শুরু করতে হলে তৈরি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনির উদ্দিন শামীম বলেন, আগামী ক্রিসমাস সামনে রেখে বড় অর্ডার আছে। তবে এই খাত জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে কোনো উপায়ে উৎপাদন চলমান রাখা প্রয়োজন। শিল্প কারখানা, সংগঠনগুলোর একার পক্ষে এটা সম্ভব না। সব পক্ষকেই এখানে ভূমিকা রাখতে হবে।

কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণে সমস্যা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সমন্বয় না হলে সফলতা অর্জন করা সম্ভব না।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, রপ্তানিজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের জন্য আর কোনো বিকল্প নেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাইরে। ভিয়েতনাম, চীন; যারা আমাদের পোশাক খাতের প্রতিযোগী তারা ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ সবুজ জ্বালানি ব্যবহার করছে। পাকিস্তান ও মিয়ানমার অনেক সবুজ জ্বালানি ব্যবহার করে।

তিনি বলেন, ফান্ড অনেক জায়গাতেই আছে কিন্তু সেগুলো পাওয়া যায় না। ব্যাংকগুলোর কাছে চাওয়া হলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে যেতে বলে। বলে ছয় মাস লাগবে, টাকা ৩০ শতাংশ ইন্টারেস্টে নিতে হবে। পরে যদি টাকা পান তাহলে রিপ্লেস করে দেব। একদিকে আমরা সবুজ জ্বালানোর কথা বলছি, অন্যদিকে যেখানে হাত দেওয়া দরকার সেখানে পলিসি মেকাররা কিছু করছেন না। 

মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, পোশাক খাতে ডি কার্বনাইজেশন কেবল কোনো অপশন বা পরিবেশগত বিষয় না। এখানে খরচ, টেকশই বিনিয়োগ ও ব্যবসার দিকগুলো আছে। আগামীতে দেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

এসএম/এমআইএইচএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow