আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতে জন্মানো প্রতিটি উদ্ভিদই মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করা হয়েছে। মাঠ-ঘাট, সড়কের পাশে কিংবা স্যাঁতসেঁতে পতিত জমিতে জন্মানো তেমনই এক পরিচিত উদ্ভিদ উষনি। এটি এক ধরনের ভেষজ শাক। প্রকৃতিতে এমনিতেই জন্মানো অবহেলিত এই উদ্ভিদটির রয়েছে অবিশ্বাস্য পুষ্টি ও ওষুধি গুণাগুণ।
তবে একসময় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার প্রকৃতিতে এ উদ্ভিদটির যথেষ্ট উপস্থিতি থাকলেও সচেতনতা ও সংরক্ষণের অভাব, আধুনিকতার ছোঁয়ায় আর ভেষজ চিকিৎসার প্রতি অনীহার কারণে ধীরে ধীরে উপকারী এ উদ্ভিদটি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, উষনি শাক হচ্ছে গুল্ম প্রজাতির অ্যাস্টারেসি পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এর বোটানিক্যাল নাম অ্যাকমেলা ওলেরাসিয়া। এটিকে ইলেকট্রিক প্ল্যান্ট বলা হয়। এটি একটি বর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ। বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে এই উদ্ভিদটির বিভিন্ন নাম রয়েছে। এটি একটি ভেষজ গুণ সমৃদ্ধ উদ্ভিদ। এর পাতা ও ফুলে রয়েছে নানা পুষ্টি ও ওষুধি গুণ। এ উদ্ভিদটি সাধারণত বাড়ির আশপাশে, ক্ষেতের আল, জলাশয়ের পাড়, সড়কের পাশে ও পতিত জমিতে এমনিতেই জন্মে।
ভেষজ চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উষনি শাকে রয়েছে নানা পুষ্টি ও ওষুধি গুণ। এটি প্রদাহবিরোধী ও মূত্রবর্ধক, যা শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। প্রসব পরবর্তী মায়েদের শারীরিক দুর্বলতা কমাতে এটি সহায়ক। এটি জ্বর, সর্দি-কাশি, দাঁত ব্যথা, শরীর ব্যথা নিরাময় ও উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জি উপশমে এটি বেশ উপকারী। স্ট্রোক ও ক্যান্সার, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে, নাকের পলিপাস এবং মাথাব্যথায় এটি বেশ কার্যকর। বদহজম ও গ্যাস্টিক, রক্ত পরিষ্কারে এটি বেশ সহায়ক।
এছাড়া আরও নানা রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে এই শাক বেশ উপকারী। এছাড়াও উষনি শাক পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, সোডিয়াম এবং বিভিন্ন ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ। এতে উচ্চমানের ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে উষনি শাক আজ অনেকটাই অবহেলিত। অথচ নিয়মিত খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই শাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংরক্ষণের অভাবে উষনি শাক ছাড়াও উপকারী বহু ভেষজ উদ্ভিদ প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রকৃতির ভারসাম্য যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি মানুষ হারাচ্ছে প্রাকৃতিক চিকিৎসার সম্ভাবনা।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আশরাফ আলী বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের মা-চাচিরা এ শাক কুড়িয়ে এনে রান্না করতেন। অন্যান্য শাকের মতোই এ শাকও প্রায়ই খাওয়া হত। সেই সময় আধুনিক চিকিৎসা ততটা সহজলভ্য ছিল না। তাই সেসময় শরীর ব্যথা বা সর্দি-জ্বরসহ নানা অসুখে বয়োজ্যেষ্ঠরা শাক রান্না করে খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। এতে নানা রোগও ভালো হয়ে যেত। এটা খুবই উপকারী শাক। এখনকার মানুষ অসুখ-বিসুখে আধুনিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই শাকটি আগের মতো এখন আর দেখা যায় না।
উপজেলার শিদলাই ইউনিয়নের শিদলাই এলাকার বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বলেন, এ শাক এ প্রজন্মের অনেকেই চিনে না। এই শাকের গুণাগুণ সম্পর্কেও জানে না। এক সময় দেখেছি আমাদের মায়েরা মহিলাদের প্রসবের পর এ শাক রান্না করে খাওয়াতেন। এতে শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি পেত। এছাড়াও অন্যান্য আরও রোগে এই শাক এর ফুল ব্যবহার করা হতো। এটি খুবই উপকারী একটি শাক। তবে আগের তুলনায় এ শাকের উপস্থিতি অনেকটাই কমে গেছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) ডা. সোহেল রানা কালবেলাকে বলেন, উষনি শাক প্রকৃতির এক মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ। এতে প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক উপাদান রয়েছে, যা বাত-ব্যথা ও শরীরের বিভিন্ন প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এটি হজম শক্তি বাড়ায় এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতে সহায়ক। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অবশ্যই ভেষজ যে কোনো উদ্ভিদ ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে মানুষ কৃত্রিম ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যার ফলে অবহেলাজনিত কারণে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো নানা ভেষজ উদ্ভিদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। উপকারী উদ্ভিদগুলোকে সংরক্ষণে আমাদের সকলকে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসা জরুরি।