প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে ‘ইসলামী ফাইন্যান্স’ বিশেষজ্ঞ জরুরি কেন
মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারপ্রধানের সাফল্য কেবল রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় নয়, বরং তার ব্যক্তিগত সচিবালয়ের (PMO) বিশেষায়িত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত টিমে একজন ‘ইসলামী ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ’ থাকা সময়ের দাবি। এটি কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত সংস্কার, সুদী ঋণের বোঝা লাঘব এবং বৈশ্বিক কূটনীতির এক অপরিহার্য অংশ। ১. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আস্থা পুনরুদ্ধার : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শরিয়াহভিত্তিক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিগত আমলে রাষ্ট্রীয় মদদে এবং নীতিমালার দুর্বলতায় এই খাতের ব্যাংকগুলো ভয়াবহ লুটপাট ও অনিয়মের শিকার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একজন নিজস্ব বিশেষজ্ঞ থাকলে তিনি সরাসরি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং শরিয়াহসম্মত লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্টে প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারবেন। ২. সুকুক : মেগা প্রজেক্ট ও সুদী ঋণের টেকসই বিকল্প বর্তমানে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের কিস্তি ও চড়া সুদ পরিশোধে হিমশিম খ
মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারপ্রধানের সাফল্য কেবল রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় নয়, বরং তার ব্যক্তিগত সচিবালয়ের (PMO) বিশেষায়িত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত টিমে একজন ‘ইসলামী ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ’ থাকা সময়ের দাবি। এটি কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত সংস্কার, সুদী ঋণের বোঝা লাঘব এবং বৈশ্বিক কূটনীতির এক অপরিহার্য অংশ।
১. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আস্থা পুনরুদ্ধার : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শরিয়াহভিত্তিক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিগত আমলে রাষ্ট্রীয় মদদে এবং নীতিমালার দুর্বলতায় এই খাতের ব্যাংকগুলো ভয়াবহ লুটপাট ও অনিয়মের শিকার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একজন নিজস্ব বিশেষজ্ঞ থাকলে তিনি সরাসরি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং শরিয়াহসম্মত লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্টে প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারবেন।
২. সুকুক : মেগা প্রজেক্ট ও সুদী ঋণের টেকসই বিকল্প বর্তমানে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের কিস্তি ও চড়া সুদ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ‘সুকুক’ (Islamic Bond) এখন বিশ্বে সমাদৃত। এটি প্রচলিত ঋণের মতো চক্রবৃদ্ধি সুদের বোঝা তৈরি করে না। বরং সম্পদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে। মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদশালী দেশগুলো এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে বড় বিনিয়োগ আনতে একজন বিশেষজ্ঞ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারেন। তিনি প্রচলিত ঋণের বদলে অংশীদারিত্বমূলক ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের নতুন পথ উন্মোচন করতে সক্ষম হবেন। সুকুক সেরকমই একটি ফাইন্যান্সিয়াল টুল। এর মাধ্যমে সরকারের ঋণ কাঠামো পুরোটাই নতুন করে ঢেলে সাজানো সম্ভব।
৩. বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত : সফল রাষ্ট্রনায়কদের কৌশল : উন্নত ও মুসলিম বিশ্বের সফল দেশগুলো তাদের সরকারপ্রধানের দপ্তরে এই বিশেষায়িত পদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
-মালয়েশিয়া : সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তার কার্যালয়ে দক্ষ অর্থনৈতিক টিম রেখেছিলেন বলেই মালয়েশিয়া আজ বিশ্বের এক নম্বর সুকুক বাজার। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তার 'Madani Economy' ভিশন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (PMO) অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কমিটিতে ইসলামী অর্থনীতিবিদদের অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে শরিয়াহ-সম্মত নীতি তদারকি করা জরুরি।
-সৌদি আরব ও কাতার : সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের অধীনে থাকা ‘Council of Economic and Development Affairs (CEDA)’-তে সরাসরি বিশেষজ্ঞ রয়েছেন যারা ‘Vision 2030’-এর বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তদারকি করেন। কাতারের আমিরের দপ্তরেও (Amiri Diwan) একই ধরণের ব্যবস্থা রয়েছে যা সরাসরি বিনিয়োগের শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে।
-যুক্তরাজ্য : অমুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও লন্ডনে ইসলামী ফাইন্যান্সের বাজার প্রসারে ব্রিটিশ সরকার তাদের ট্রেজারি বিভাগে নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ প্যানেল রেখেছে।
৪. ট্রিলিয়ন ডলারের ‘হালাল ইকোনমি’ ও সম্ভাবনা : বর্তমানে বৈশ্বিক ইসলামী আর্থিক সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি হালাল ফুড, কসমেটিকস ও ফার্মাসিউটিক্যালসের বৈশ্বিক বাজার এখন ট্রিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশের এই বিশাল বাজারে শক্তিশালী অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষ কৌশলের অভাবে আমরা পিছিয়ে আছি। প্রধানমন্ত্রীর টিমে বিশেষজ্ঞ থাকলে তিনি এই খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবং ওআইসি (OIC) দেশগুলোতে রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
৫. সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা : ইসলামী ফাইন্যান্সের মূল ভিত্তি হলো সামাজিক সমতা। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি ও যাকাত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপের অভাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত টিমে এই খাতের বিশেষজ্ঞ থাকলে এই বিশাল সম্পদকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করে দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। এটি সাধারণ মানুষের মাঝে সরকারের প্রতি নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যে ফ্যামেলি কার্ডের কথা বলেছেন সেটিও কিন্তু যাকাত ও ওয়াকফ এর মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
উপসংহার : একজন প্রধানমন্ত্রীকে শত শত জটিল ফাইল ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে কারিগরি ও বিশেষায়িত বিষয়ে (যেমন ইসলামী ফাইন্যান্স) তাৎক্ষণিক সঠিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একজন নিজস্ব বিশেষজ্ঞ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে নীতিনির্ধারণী ভুল যেমন কমবে, তেমনি দেশের অর্থনীতি একটি নৈতিক ও শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।
লেখক : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) -এর শরিয়াহ উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য
What's Your Reaction?