প্রবাসীদের কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফেরার এই মিছিল আর কতদিন?
ড. জন্নাতুল আরিফ জীবিকার সন্ধানে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। তাদের শ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সচল রাখে। কিন্তু সেই প্রবাসীদের একটি বড় অংশ জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, নির্মাণকাজে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা অন্যান্য অস্বাভাবিক ঘটনায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকের জীবন অকালে ঝরে যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিভিন্ন সরকারি তথ্য ও গবেষণা অনুযায়ী, গত এক দশকে ৩৪ হাজারের বেশি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। ২০২৩ সালে দেশে ফিরেছে ৪ হাজার ৫৫২টি মরদেহ এবং ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮১৩-তে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৩ জনেরও বেশি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সংখ্যাকে সরাসরি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলা যাবে না। এসব মৃত্যুর মধ্যে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, স্বাভাবিক মৃত্যু এবং অন্যান্য কার
ড. জন্নাতুল আরিফ
জীবিকার সন্ধানে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। তাদের শ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সচল রাখে। কিন্তু সেই প্রবাসীদের একটি বড় অংশ জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, নির্মাণকাজে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা অন্যান্য অস্বাভাবিক ঘটনায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকের জীবন অকালে ঝরে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিভিন্ন সরকারি তথ্য ও গবেষণা অনুযায়ী, গত এক দশকে ৩৪ হাজারের বেশি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। ২০২৩ সালে দেশে ফিরেছে ৪ হাজার ৫৫২টি মরদেহ এবং ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮১৩-তে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৩ জনেরও বেশি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সংখ্যাকে সরাসরি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলা যাবে না। এসব মৃত্যুর মধ্যে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, স্বাভাবিক মৃত্যু এবং অন্যান্য কারণ রয়েছে। সমস্যাটি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয় না।
২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে ফেরত আসা ১৮ হাজারের বেশি প্রবাসী কর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ৩ হাজার ৬৯৮ জনের মৃত্যু কর্মক্ষেত্র-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। একই সময়ে অনেক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ‘হার্ট অ্যাটাক’, ‘স্ট্রোক’ বা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এসব মৃত্যুর পেছনে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, প্রচণ্ড তাপমাত্রা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, শারীরিক ও মানসিক চাপ কিংবা কর্মক্ষেত্রের অন্য কোনো ঝুঁকি ছিল কি না তা সবসময় যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি।
সম্প্রতি সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৭ বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনা আবারও আমাদের সামনে সেই কঠিন প্রশ্নটি হাজির করেছে। বিদেশে কর্মরত একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবন কি শুধু তার পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাবেই মূল্যায়িত হবে? তার নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
মৃত্যুর পর শুধু মরদেহ ফেরত আনাই যথেষ্ট নয়
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেখানে শেষ হতে পারে না। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
মৃত্যুর ঘটনা ঘটার পর সাধারণত পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিপূরণ পাওয়া এবং সত্য জানা। কিন্তু বিদেশি কর্তৃপক্ষের দেওয়া একটি মৃত্যু সনদে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ লেখা থাকলেই বিষয়টি শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। যদি মৃত্যুর পরিস্থিতি সন্দেহজনক হয়, তাহলে বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে যথাযথ তদন্ত, প্রয়োজন হলে ময়নাতদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। একজন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা গেলে তার পরিবার শুধু একজন স্বজনকে হারায় না; অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও হারায়। ফলে ক্ষতিপূরণ, বীমা বা সরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
সরকারের করণীয় কী?
প্রথমত, বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর বিষয়ে একটি কেন্দ্রীয় ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। কোন দেশে কতজন মারা যাচ্ছেন, তাদের বয়স কত, কোন পেশায় ছিলেন, মৃত্যুর কারণ কী, মৃত্যু কর্মক্ষেত্রে নাকি কর্মক্ষেত্রের বাইরে, নিয়োগকর্তা কে, ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেছে কি না এসব তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অস্বাভাবিক ও দুর্ঘটনাজনিত প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে দূতাবাসকে সক্রিয় তদন্তের দায়িত্ব দিতে হবে। শুধু কাগজপত্র সম্পন্ন করা নয়; দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তদন্তের তথ্য সংগ্রহ এবং পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় আইনি সহায়তা দেওয়াও দূতাবাসের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, যেসব দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত, সেসব দেশের সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মঘণ্টা, আবাসন, চিকিৎসা, বীমা এবং দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ বিষয়ে আরও শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
চতুর্থত, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেক কর্মীকে শুধু কাজের প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; তাকে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্থানীয় শ্রম আইন, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তার অধিকার সম্পর্কে কার্যকর প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
পঞ্চমত, কোনো প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর পর তার পরিবারকে শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়। বিশেষ করে পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, বিধবা বা নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান নিয়ে আমরা প্রায়ই গর্ব করি। রেমিট্যান্সের রেকর্ড, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কিংবা প্রবাসীদের আয় নিয়ে আমরা পরিসংখ্যান প্রকাশ করি। কিন্তু সেই পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা মানুষটির নিরাপত্তা নিয়ে কি আমরা যথেষ্ট ভাবছি? একজন প্রবাসী শ্রমিকের জীবনের মূল্য তার পাঠানো রেমিট্যান্সের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি একটি পরিবারের সন্তান, বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বিদেশের মাটিতে তার মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্নের আকস্মিক মৃত্যু। তাই প্রবাসীদের মৃত্যুর পর কেবল শোকবার্তা, মরদেহ দেশে ফেরত আনা এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের মধ্যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কেন তারা মারা যাচ্ছেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ জানা, প্রতিটি দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের মৃত্যু প্রতিরোধ করা এই তিনটি বিষয়কে প্রবাসী কল্যাণ নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফেরার এই মিছিল কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার আগে তারা মানুষ, তারা আমাদের দেশের নাগরিক। তাদের নিরাপদে কর্মস্থলে যাওয়া এবং সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরে আসার অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
লেখক: গবেষক, নর্থ চায়না ইলেকট্রিক পাওয়ার ইউনিভার্সিটি, বেইজিং, চীন
কেএসকে
What's Your Reaction?

