প্রবাসীর দিনলিপি
প্রবাসে ‘লং উইকএন্ড’ মানেই একটা বাড়তি ছুটির দিন। এদিন প্রবাসের রুটিন বাঁধা জীবনের কোনো ব্যস্ততা থাকে না। তাই সময়টা নিজেদের মতো করে কাটানো যায়। অবশ্য অনেকেই আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখেন কোন লং উইকএন্ড কোথায় কাটাবেন। আমি যেহেতু সেকেলে মানুষ তাই এসব হ্যাপায় যেতে ইচ্ছে করে না। আমি হলাম প্রচন্ডরকম ঘরকুণো মানুষ। সারাদিন যেখানেই থাকি দিনশেষে পরিচিত দরজা, মেঝে, দেয়ালের কাছে ফিরে আসা চায়। তাই এই বাড়তি দিনটা চেষ্টা করি একান্ত নিজের মতো করে পার করতে। দুপুরের নীল আকাশে মেঘের ভেলা “সকাল বেলা রোদ্দুর যেই মাটিতে পা ফেলেছেএকটা চড়াই অমনি দেখি এক্কা দোক্কা খেলছে।” সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে চড়ুই পাখির মতো দু’পা ফেলে চলে যায় বাড়ির পেছনে। গার্ডেন শেডের সামনে একটা অংশে কংক্রিটের মেঝে দেয়া। সেখানে প্লাস্টিকের শীতল পাটি বিছিয়ে গল্পের বই নিয়ে রোদে গা দিয়ে শুয়ে পড়ি। অবশ্য মাঝে মধ্যে ঘাসের মধ্যেও পাটি বিছিয়ে শুই যদি শিশির শুকিয়ে যায়। শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়া আর ফাঁকে ফাঁকে আকাশের দিকে তাকানো। অস্ট্রেলিয়ার আকাশ খুবই পরিষ্কার তাই এখানকার উজ্জ্বল নীল রঙের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। অবশ্য আকাশে মেঘ থাকলে তা
প্রবাসে ‘লং উইকএন্ড’ মানেই একটা বাড়তি ছুটির দিন। এদিন প্রবাসের রুটিন বাঁধা জীবনের কোনো ব্যস্ততা থাকে না। তাই সময়টা নিজেদের মতো করে কাটানো যায়। অবশ্য অনেকেই আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখেন কোন লং উইকএন্ড কোথায় কাটাবেন।
আমি যেহেতু সেকেলে মানুষ তাই এসব হ্যাপায় যেতে ইচ্ছে করে না। আমি হলাম প্রচন্ডরকম ঘরকুণো মানুষ। সারাদিন যেখানেই থাকি দিনশেষে পরিচিত দরজা, মেঝে, দেয়ালের কাছে ফিরে আসা চায়। তাই এই বাড়তি দিনটা চেষ্টা করি একান্ত নিজের মতো করে পার করতে।
দুপুরের নীল আকাশে মেঘের ভেলা
“সকাল বেলা রোদ্দুর যেই মাটিতে পা ফেলেছে
একটা চড়াই অমনি দেখি এক্কা দোক্কা খেলছে।”
সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে চড়ুই পাখির মতো দু’পা ফেলে চলে যায় বাড়ির পেছনে। গার্ডেন শেডের সামনে একটা অংশে কংক্রিটের মেঝে দেয়া। সেখানে প্লাস্টিকের শীতল পাটি বিছিয়ে গল্পের বই নিয়ে রোদে গা দিয়ে শুয়ে পড়ি। অবশ্য মাঝে মধ্যে ঘাসের মধ্যেও পাটি বিছিয়ে শুই যদি শিশির শুকিয়ে যায়।
শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়া আর ফাঁকে ফাঁকে আকাশের দিকে তাকানো। অস্ট্রেলিয়ার আকাশ খুবই পরিষ্কার তাই এখানকার উজ্জ্বল নীল রঙের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। অবশ্য আকাশে মেঘ থাকলে তাদের লুকোচুরি খেলা দেখা যায়। এর মধ্যেই গিন্নি চলে আসেন চা নাস্তা নিয়ে।
পরিবারের সবাই মিলে একসাথে বসে নাস্তাটা খাওয়া হয়। এটাকে আমি নাম দিয়েছি ক্যাম্পিং। এরপর অবশ্য সবাই দিনের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায় কিন্তু আমাকে আলসেমি পেয়ে বসে। আমি আর ওখান থেকে নড়ি না।
পেছনের বাড়ির প্রতিবেশী মিশু ভাই বাড়ি থাকলে উনাকে ডেকে নিয়ে বেড়ার দুইপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমরা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির হাতিঘোড়া মারি। সাথে সাথে বাংলাদেশি এবং অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতির তুলনামূলক আলোচনাও চলে।
এবারের আলোচনায় শুরু হলো বাংলাদেশি কমিউনিটির নতুন একটা বাতিক নিয়ে। আগে সন্তানদের জন্মদিন, সুন্নতে খৎনা, কান ফোঁড়ানো, নাক ফোঁড়ানো, নতুন শিশুর আগমণ পূর্ব অনুষ্ঠান, নতুন বাড়িতে ওঠার অনুষ্ঠানতো ছিলোই। এখন একটা অদ্ভুত বিষয় যোগ হয়েছে।
সবাই তাদের বিবাহবার্ষিকিতে নতুন করে বিবাহের সব আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে। সেখানে মেহেদী থেকে গায়ে হলুদ, বরযাত্রী এবং মেকি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাও সারা হচ্ছে। আমি ভালো মন্দের আলোচনায় যাচ্ছি না। এত প্রাণবন্ত বাংলাদেশি কমিউনিটির স্থানীয়দের সাথে সংযোগ কিন্তু নেই বললেই চলে। স্থানীয় অস্ট্রেলিয়ান প্রতিবেশীদেরকে এরা চেনে না বললেই হয়।
বিকেলের আকাশে রঙের ফেরিওয়ালা
“সেই মায়ের গানে ঘুমের পরী,
আজো থেমে আছে সময়ের ঘড়ি।
সেই ঝিম ধরা দুপুর বেলা,
ঘুমে জাগরনে হারানো খেলা
ছেলেবেলা ছেলেবেলা।”
আলোচনা শেষ করে আমি আবার আবার অকুস্থলে ফিরে আসি। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয় আর মনটা আরও উদাস হতে থাকে। দুপুর সময়টাই যেন কেমন। দুপুরের উদাস বাতাসে কতশত স্মৃতি মনের মাঝে ভিড় করে। এসময়টা তেমন কাউকে অনলাইনে পাওয়াও যায় না যে তার সাথে একটু আড্ডা দিবো বা কথা বলবো।
চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি আর মনের পর্দায় এক একটা দৃশ্য দেখি। কখনও চোখে ভাসে শৈশবের মাটির মেঝেতে পা মেলে বসে রেডিওতে গান শোনার দৃশ্য। আবার কখনও চোখে ভাসে পদ্মা নদীর পাড়ের কাকুরের ক্ষেত পাহারা দেয়ার দৃশ্য।
দলবেঁধে পদ্মা নদীতে গোসল করতে নেমে যাচ্ছি আমরা সবাই। আবার কখনও বা কৈশোরের সাইকেল চালিয়ে সারা কুষ্টিয়া শহর প্রদক্ষিণ করার দৃশ্য। তারপর একটা নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে যেয়ে থেমে যাওয়া।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে
“সন্ধ্যে নামার সময় হলে পশ্চিমে নয়, পূবের দিকে,
মুখ ফিরিয়ে ভাববোআমি কোন দেশে রাত হচ্ছে ফিকে।”
বিকেল হলেই ঘরে ফিরে এসে গোসল সেরে ছেলেকে নিয়ে চলে যায় আমরা নিজস্ব একটা জায়গায়। রেললাইন, তার নিচ দিয়ে বয়ে গেছে একটা ক্রিক (খাল), তার পাশেই অনেকখানি সবুজ মাঠ। সেই মাঠে ফুটে আছে কাঁশফুলের মতো এক ধরণের ফুল।
আর তার মাঝ দিয়ে ক্রিকের সমান্তরালে মাটির পায়েহাঁটা পথ। মনে হয় যেন দেশে ফেলে আসা গ্রাম বাংলার সেই মেঠোপথ। সেই পথের ধার থেকে আমরা কাঁশফুল তুলি।
একবার অবশ্য আমরা সেই মাঠ থেকে গায়ের টিশার্টের কোঁচ ভরে বৈথার শাক তুলে এনেছিলাম। আমরা মাঝে মধ্যে কাগজের নৌকা বানিয়ে সেই ক্রিকের পানিতে ছেড়ে দিই। আবার কখনও বা পাথর কুড়িয়ে ক্রিকের পানিতে আমরা ব্যাঙ লাফ দেয়ায়।
“সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;”
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে। ক্রিকের পানিতে গোধূলির আকাশের রঙের ছায়া পড়ে। সে এক অসম্ভব সৌন্দর্য। আমি জীবনানন্দ দাশ হলে কবেই একটা কবিতা লিখে ফেলতাম।
হাঁসের দল দিনশেষে উড়াউড়ির খেলায় মেতে উঠে। চখা পাখিগুলো পানিতে হেঁটে হেঁটে দিনের শেষ আহার করে। বকগুলো ফিরে যায় নিজ নিজ বাসায়। আর আমরা চুপচাপ শুয়ে থাকি ক্রিকের হেলানো কংক্রিটের মেঝেতে।
যতক্ষণ ভালো লাগে ততক্ষণ পশ্চিম আকাশের রঙের খেলা দেখি। পাশ দিয়ে ছুটে যায় ট্রেন। গাঢ় অন্ধকার নেমে আসলে আমরা বাড়ির পথ ধরি।
সন্ধ্যার আকাশে রঙের মেলা
“নগর জীবন একই রকম একই ধারায় বয়ে যায়
শুধু বয়ে যায় শুধু বয়ে যায়,”
এরপর বাড়ি ফিরে চলে ঘুমের প্রস্তুতি। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হয় কারণ উঠতে হয় সেই ভোর ছ'টার সময়। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার কারণে মাঝে মধ্যে ঘুম ভেঙে যায়। তখন দেশের বন্ধুদের সাথে টুকটাক কথা হয়। কখনও মন অস্থির থাকলে দেশের স্বজনদেরকে স্বপ্নে দেখি। ইদানিং বেশি বেশি দেখি আব্বা মা'কে।
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর থেকেই তাদের কাছ থেকে দূরে আছি। তাই তাদের সেবা করতে না পারার একটা অপরাধবোধ মনের মধ্যে কাজ করে। ইচ্ছে আছে ছেলে মেয়ে দুটো আঠারো পার করলে ওদের রেখে কুষ্টিয়া চলে যাবো।
এরপর উনারা যতদিন বাঁচেন দেশেই থাকবো। জানিনা সেটা সম্ভব হবে কি না। ভোরে বেশিরভাগ সময়ই ঘুম ভাঙে মুঠোফোনের এলার্মে। শুরু হয় আরেকটা দিন।
এমআরএম
What's Your Reaction?