প্রবাসে ‘ছোট কাজ’ বনাম দেশে অবমূল্যায়ন

এমকে হক, জার্মানি আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে- ‘প্রবাসে গিয়ে তো মানুষ শুধু সাধারণ বা ছোটখাটো কাজই করে, এর চেয়ে দেশে থাকাই অনেক ভালো।’ আপাতদৃষ্টিতে কথাটিকে দেশপ্রেম বা স্বস্তিজনক মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। আজ যদি আমরা একটি বাস্তবসম্মত ও বাস্তবিক হিসাব মেলাই, তবে দেখতে পাবো—দেশে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির পর একজন মানুষের জীবন কেমন কাটে, আর প্রবাসে (যেমন জার্মানিতে) সমপরিমাণ বা তার চেয়ে কম পরিশ্রম করলে জীবনযাত্রার মান কেমন হয়। পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। বাংলাদেশে ১২ ঘণ্টার শ্রম: যেখানে প্রাপ্তি কেবলই অবমূল্যায়ন আমাদের দেশে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান বা দোকানে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন এমন মানুষের সংখ্যা অসংখ্য। মাস শেষে তাদের অনেকেরই বেতন হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। দিনশেষে তীব্র যানবাহনের জট, কর্মক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অপেশাদার আচরণ আর পকেটে কোনো সঞ্চয় না থাকা—এটাই এদেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত কর্মজীবীর নির্মম বাস্তবতা। সবচেয়ে বড় সংকট হলো মনস্তাত্ত্বিক; আমাদের সমাজে এই ধরনের কঠোর পরিশ্রমকে এখনো শ্রমের মর্যাদা দিয়ে মূল্যায়ন করা

প্রবাসে ‘ছোট কাজ’ বনাম দেশে অবমূল্যায়ন

এমকে হক, জার্মানি

আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে- ‘প্রবাসে গিয়ে তো মানুষ শুধু সাধারণ বা ছোটখাটো কাজই করে, এর চেয়ে দেশে থাকাই অনেক ভালো।’ আপাতদৃষ্টিতে কথাটিকে দেশপ্রেম বা স্বস্তিজনক মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

আজ যদি আমরা একটি বাস্তবসম্মত ও বাস্তবিক হিসাব মেলাই, তবে দেখতে পাবো—দেশে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির পর একজন মানুষের জীবন কেমন কাটে, আর প্রবাসে (যেমন জার্মানিতে) সমপরিমাণ বা তার চেয়ে কম পরিশ্রম করলে জীবনযাত্রার মান কেমন হয়। পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল।

বাংলাদেশে ১২ ঘণ্টার শ্রম: যেখানে প্রাপ্তি কেবলই অবমূল্যায়ন

আমাদের দেশে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান বা দোকানে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন এমন মানুষের সংখ্যা অসংখ্য। মাস শেষে তাদের অনেকেরই বেতন হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

দিনশেষে তীব্র যানবাহনের জট, কর্মক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অপেশাদার আচরণ আর পকেটে কোনো সঞ্চয় না থাকা—এটাই এদেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত কর্মজীবীর নির্মম বাস্তবতা।

সবচেয়ে বড় সংকট হলো মনস্তাত্ত্বিক; আমাদের সমাজে এই ধরনের কঠোর পরিশ্রমকে এখনো শ্রমের মর্যাদা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না, বরং এক ধরনের হীনমন্যতার চোখে দেখা হয়।

জার্মানিতে কর্মঘণ্টা: যেখানে প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব হয়

অন্যপক্ষে, জার্মানির শ্রমবাজারের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে ‘ন্যূনতম মজুরি’ আইন অত্যন্ত কঠোরভাবে বজায় রাখা হয়, যার ফলে প্রতি ঘণ্টার কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট এবং সম্মানজনক পারিশ্রমিক নিশ্চিত থাকে।

একজন শিক্ষার্থী যদি সেখানে আইনি কর্মঘণ্টা বজায় রেখে কিংবা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোনো সাধারণ কাজও করেন- যেমন রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতান কিংবা পণ্য সরবরাহ- তবুও মাস শেষে তার আয় বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দেড় লাখ টাকা বা তারও বেশি ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ, সেখানে শ্রমের অপচয় হয় না।

দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবধান: কাজের সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা

আর্থিক বিষয়ের চেয়েও বড় যে পার্থক্যটি চোখে পড়ে, তা হলো কাজের প্রতি সামাজিক সম্মান। জার্মানিতে কেউ রাস্তা পরিষ্কারের কাজ করুন, বিক্রয়কর্মী হোন কিংবা কোনো তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী- সমাজ সবাইকে সমান নাগরিক সুবিধা ও শ্রদ্ধা দেয়।

সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা একই টেবিলে বসে কফি খাচ্ছেন বা মধ্যাহ্নভোজ করছেন, এমন দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক। কোনো কাজকে ‘ছোট’ বা ‘নিচু’ করে দেখার মানসিকতা তাদের সামাজিক সংস্কৃতিতেই নেই।

পরিশ্রম আমাদের সবখানেই করতে হবে; জীবনের উন্নতির জন্য কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। কিন্তু দিনশেষে মৌলিক প্রশ্নটি হলো- আমরা আমাদের মূল্যবান শ্রম আর ঘাম কোন মাটির ওপর ফেলছি?

যেখানে মেধার ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন নেই সেখানে, নাকি যেখানে শ্রমের প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব ইউরোপীয় মুদ্রায় দেওয়া হয় এবং দিনশেষে মানুষ হিসেবে শতভাগ মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়?

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow