চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ এলাকার পয়ঃবর্জ্য এখনো খাল–নালায় গিয়ে পড়ে। দুর্গন্ধ আর দূষণের এই সমস্যা কমাতে ২০১৮ সালে বড় একটি পয়োনিষ্কাশন প্রকল্প নেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় আট বছরেও কাজ শেষ হয়নি। এখন আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে সংস্থাটি।
জানা গেছে, এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় তিন বছর পরও কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭৩ শতাংশ। হাতে আছে আরও তিন মাস সময়। এই সময়ে বাকি ২৭ শতাংশ কাজ শেষ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম মহানগরের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা স্থাপন’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে তিন দফা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ধীরগতির কারণে কাজ শেষ হয়নি। এমনকি পাইপলাইন স্থাপনের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারেরা কয়েক বার বিল না পেয়ে কাজও বন্ধ রেখেছেন।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীতে আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এর প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য দৈনিক ১০ কোটি লিটার বর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা সম্পন্ন একটি কেন্দ্রীয় পয়োশোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি দৈনিক ৩০০ ঘনমিটার সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একটি আলাদা শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পয়োপাইপলাইন স্থাপন করা হবে। বাসাবাড়ি থেকে পয়োবর্জ্য সংগ্রহ করে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে তা কেন্দ্রীয় শোধনাগারে নিয়ে পরিশোধন করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর ২২টি ওয়ার্ডের প্রায় ৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ মানুষ আধুনিক পয়োনিষ্কাশন সুবিধা পাবেন। প্রায় ২৮ হাজার বাসাবাড়িকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ওয়াসা কর্মকর্তারা জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পয়োবর্জ্য পাইপলাইনের মাধ্যমে হালিশহরে নির্মিত কেন্দ্রীয় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে নেওয়া হবে। সেখানে তা পরিশোধন করা হবে। হালিশহর এলাকায় প্রায় ১৬৫ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে এই কেন্দ্রীয় শোধনাগার।
বর্তমানে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের সিভিল কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে মেকানিক্যাল কাজের অগ্রগতি তুলনামূলক কম—শেষ হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ হয়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশ।
প্রকল্পের সময় যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ব্যয়ও। ২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদনের সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। ২০১৮ সালে যখন প্রকল্প নেওয়া হয়, তখন ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। মুদ্রামূল্যের এই পরিবর্তনের কারণে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্পের নকশা আরও টেকসই করার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে আরও দুটি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণের সুযোগ রাখতেই নকশায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটির শুরু থেকেই সময়ক্ষেপণের অভিযোগ রয়েছে। ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। একই বছরের নভেম্বরে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপর ঠিকাদার নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০২০ সালের অক্টোবরে। টেন্ডার মূল্যায়ন শেষে তা গ্রহণ করা হয় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পরে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়ার তাইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ফলে প্রকল্প অনুমোদনের পর কাজ শুরু করতেই প্রায় তিন বছর সময় লেগে যায়।
প্রকল্প পরিচালক ও ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৭৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। হাতে আর তিন মাস সময় আছে। প্রকল্পের মেয়াদ আবারও বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আশা করছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
কেন পাঁচ বছরের প্রকল্প আট বছরেও শেষ হচ্ছে না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুরুতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব হয়েছিল। এরপর করোনা মহামারির কারণে কাজ শুরু করতেও কিছুটা দেরি হয়। এখন নগরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে কাজ করতে হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান সড়ক, বন্দর সড়ক ও বড়োপোল সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাইপলাইন বসাতে গিয়ে যান চলাচল ও নিরাপত্তা বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতেও সময় লাগছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি পেতে বিলম্ব হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনেক সময় দিনে কাজ করা যায় না, রাতে কাজ করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তির মুখেও পড়তে হয়। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটও পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে এসব কারণেই প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বল পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতিই মূল সমস্যা। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপিতে সাধারণত বছরভিত্তিক কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করা থাকে। কোনো প্রতিবন্ধকতা এলে তা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিও সেখানে উল্লেখ থাকে। কিন্তু এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান কালবেলাকে বলেন, দেশে উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে থাকা এখন এক ধরনের অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পনার সময় বাস্তবতা বিবেচনা না করলে পরে বারবার মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে।
তিনি বলেন, প্রকল্প প্রণয়নের সময় দক্ষতা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাস্তবায়নের সময় অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণের সময় যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে কাজের সময় বাড়াতে হয় এবং ব্যয়ও বাড়তে থাকে। এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ঘটে।
আগামী বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হবে কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ওয়াসার আগের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা খুব ভালো নয়। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সংস্থাটির ভাবমূর্তির জন্যই প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করা জরুরি। কারণ এই প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে নগরীর পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়টি।