বঙ্গোপসাগরে থামছে না অবৈধ ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্য
বঙ্গোপসাগরে দিন দিন বেড়েই চলেছে রূপান্তরিত অবৈধ ট্রলিং বোটের ব্যবহার। এর প্রভাবে শুধু ইলিশ নয়, পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। শনিবার (৪ জুলাই) সরেজমিন দেখা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা, মহিপুর, আলীপুর ও আশাখালী উপকূলসংলগ্ন সাগরে এসব ট্রলিং বোট অবাধে চলাচল করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের আশ্বাসের পরও বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিংয়ের দৌরাত্ম্য থামছে না। এর ফলে সমুদ্রে মাছের সংকটে নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো প্রান্তিক জেলে, বিপর্যস্ত হচ্ছে উপকূলীয় অর্থনীতি এবং অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে দেশের সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনমি। সরকার ঘোষিত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বুকভরা আশা নিয়ে সাগরে যান হাজারো জেলে। কিন্তু লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে জ্বালানি, বরফ ও রসদ সংগ্রহের পরও অধিকাংশ ট্রলার প্রায় খালি হাতে ফিরে এসেছে। জেলেদের অভিযোগ, তারা জাল ফেলার আগেই শক্তিশালী ট্রলিং সিন্ডিকেট সমুদ্র থেকে নির্বিচারে মাছ আহরণ করে নিচ্ছে। উপকূলের জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইন, নিষেধাজ্ঞা এবং অসংখ্য অভিযোগ থাকার
বঙ্গোপসাগরে দিন দিন বেড়েই চলেছে রূপান্তরিত অবৈধ ট্রলিং বোটের ব্যবহার। এর প্রভাবে শুধু ইলিশ নয়, পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) সরেজমিন দেখা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা, মহিপুর, আলীপুর ও আশাখালী উপকূলসংলগ্ন সাগরে এসব ট্রলিং বোট অবাধে চলাচল করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের আশ্বাসের পরও বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিংয়ের দৌরাত্ম্য থামছে না। এর ফলে সমুদ্রে মাছের সংকটে নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো প্রান্তিক জেলে, বিপর্যস্ত হচ্ছে উপকূলীয় অর্থনীতি এবং অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে দেশের সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনমি।
সরকার ঘোষিত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বুকভরা আশা নিয়ে সাগরে যান হাজারো জেলে। কিন্তু লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে জ্বালানি, বরফ ও রসদ সংগ্রহের পরও অধিকাংশ ট্রলার প্রায় খালি হাতে ফিরে এসেছে। জেলেদের অভিযোগ, তারা জাল ফেলার আগেই শক্তিশালী ট্রলিং সিন্ডিকেট সমুদ্র থেকে নির্বিচারে মাছ আহরণ করে নিচ্ছে।
উপকূলের জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইন, নিষেধাজ্ঞা এবং অসংখ্য অভিযোগ থাকার পরও বছরের পর বছর অবৈধ ট্রলিং বন্ধ হচ্ছে না কেন? তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট প্রশাসনের দুর্বল তদারকি কিংবা কিছু অসাধু ব্যক্তির প্রশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে সাগরে যাই, কিন্তু মাছ পাই না। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক প্রকাশ্যে অবৈধ ট্রলিং চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এগুলো বন্ধ করা সম্ভব। তাহলে বন্ধ হচ্ছে না কেন?’
স্থানীয় সূত্র জানায়, সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর এসব বোটের সংখ্যা আরও বেড়েছে। এসব বোটে অত্যাধুনিক ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী এসব ট্রলিং বোটের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কথা থাকলেও তারা উপকূলের কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যেই নির্বিচারে মাছ শিকার করছে। অবৈধ ট্রলিংয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো ‘বটম ট্রলিং’। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে টেনে নেওয়ায় প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জালে প্রতিদিন ধরা পড়ছে বিপুল পরিমাণ মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ির রেণু ও কাঁকড়ার বাচ্চা।
জেলে আবুল কাশেম বলেন, ‘ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য রেণু ধ্বংস হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সাগরে আর মাছই থাকবে না।’
ক্ষুদ্র নৌকার জেলেদের অভিযোগ, বিশাল ট্রলিং বোটগুলো তাদের জালের ওপর দিয়েই চলাচল করে। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে যায়। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, প্রতিবাদ করলেও জোটে হুমকি-ধমকি। এক বছর আগে শত শত জেলে মানববন্ধন করে অবৈধ ট্রলিং বন্ধের দাবি তুললেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে দাবি তাদের।
মহিপুরের আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে যে পরিমাণ মাছ ঘাটে আসত, এখন তার এক-চতুর্থাংশও আসে না। ফলে ইলিশ, রূপচাঁদা, লইট্টাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষণের পাশাপাশি অবৈধ ট্রলিং এখন সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের অন্যতম বড় হুমকি। এভাবে চলতে থাকলে শুধু ইলিশ নয়, বঙ্গোপসাগরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং লাখো মানুষের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। আমরা নিয়মিত তৎপর থাকলেও গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ‘অবৈধ ট্রলিং সম্পূর্ণ বন্ধে কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অভিযান এবং নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।’
উপকূলবাসীর দাবি, অবৈধ ট্রলিং এখন আর শুধু আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামুদ্রিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।
তাদের প্রত্যাশা, আশ্বাস নয়—দৃশ্যমান অভিযান, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অবৈধ ট্রলিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় রুপালি ইলিশের জন্য খ্যাত বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর একদিন সত্যিই মাছশূন্য হয়ে পড়তে পারে।
What's Your Reaction?