বছর ঘুরলেই বাড়তি বাড়িভাড়ার চাপ
বছর বদলালেই যেমন ক্যালেন্ডারে নতুন সংখ্যা যোগ হয়, তেমনি ঢাকাবাসীর জীবনে যোগ হচ্ছে বাড়তি বাড়িভাড়ার চাপ। ২০২৫ পেরিয়ে ২০২৬ আসা যেমন অনিবার্য, তেমনি রাজধানীতে বাড়িভাড়া বাড়ানোও যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বছরের প্রথম মাসেই ভাড়াটিয়াদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত এক থেকে তিন হাজার টাকা। নতুন বাসা নিতে হলে দিতে হচ্ছে দুই থেকে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া সঙ্গে চলতি মাসের ভাড়া, যা জোগান দিতে অনেককে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন ঋণ নিতে। ঢাকায় বাড়িভাড়া এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। উদ্যোগ আছে, কিন্তু সর্বজনীন নয়। নতুন বছরে নগরবাসীর প্রত্যাশা— বাড়িভাড়া যেন আরেকটি অদৃশ্য কর হয়ে না দাঁড়ায়, বরং মানবিকতা ও আইনের শাসনের মধ্যদিয়ে একটি সহনীয় সমাধান আসুক। ২৫ বছরে ৪০০ শতাংশ বেড়েছে বাড়ি ভাড়াভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাসা-ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। ক্যাবের আরেক গবেষণায় দেখা যায়— ঢা
বছর বদলালেই যেমন ক্যালেন্ডারে নতুন সংখ্যা যোগ হয়, তেমনি ঢাকাবাসীর জীবনে যোগ হচ্ছে বাড়তি বাড়িভাড়ার চাপ। ২০২৫ পেরিয়ে ২০২৬ আসা যেমন অনিবার্য, তেমনি রাজধানীতে বাড়িভাড়া বাড়ানোও যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বছরের প্রথম মাসেই ভাড়াটিয়াদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত এক থেকে তিন হাজার টাকা। নতুন বাসা নিতে হলে দিতে হচ্ছে দুই থেকে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া সঙ্গে চলতি মাসের ভাড়া, যা জোগান দিতে অনেককে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন ঋণ নিতে।
ঢাকায় বাড়িভাড়া এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। উদ্যোগ আছে, কিন্তু সর্বজনীন নয়। নতুন বছরে নগরবাসীর প্রত্যাশা— বাড়িভাড়া যেন আরেকটি অদৃশ্য কর হয়ে না দাঁড়ায়, বরং মানবিকতা ও আইনের শাসনের মধ্যদিয়ে একটি সহনীয় সমাধান আসুক।
২৫ বছরে ৪০০ শতাংশ বেড়েছে বাড়ি ভাড়া
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাসা-ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। ক্যাবের আরেক গবেষণায় দেখা যায়— ঢাকার ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করেন কেবল বাসা-ভাড়ার পেছনে, আর ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি।
মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস
বেসরকারি চাকরিজীবী মাহমুদ হোসেনের মতো অসংখ্য মানুষ বছরের শুরুতেই চরম চাপের মুখে পড়েন। বাচ্চার স্কুল ভর্তি, ইউনিফর্ম, বই-খাতা, পাশাপাশি বাড়িভাড়া— সব মিলিয়ে নতুন বছর তাদের কাছে উৎসব নয়, বরং বাড়তি দুশ্চিন্তার নাম।
সাব্বির আহমেদ বলেন, “বছর না ঘুরতেই মালিক আবার ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছেন। এ বছর থেকে অতিরিক্ত এক হাজার টাকা গুনতে হবে। কথা বললে বলেন, না পোষালে বাসা ছেড়ে দিতে। বাসা ছাড়াও সহজ নয়। স্কুল, কর্মস্থল, যাতায়াত খরচ— সব কিছু হিসাব করে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে একই বাসায় থেকে যাচ্ছেন।
সাবলেট ও মেসে ঠাঁই নিচ্ছেন পরিবারগুলো
আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে না পেরে অনেক পরিবার সাবলেটের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ আবার পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে একা থাকছেন শহরে।
কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী শফিউল্লাহ বলেন, ‘ছোট ফ্ল্যাট ছেড়ে সাবলেটে ওঠেছি। পরিবার গ্রামে পাঠানো ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু সাবলেটেও নেই স্বস্তি। বাড়তি নিরাপত্তা বিল, বাড়তি ভাড়া— সব মিলিয়ে সেখানেও বাড়ছে খরচ ও মানসিক চাপ।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেস সংঘের মহাসচিব আয়াতুল্লাহ আক্তার বলেন, ‘বাসার মালিকরা প্রতিবছরই ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন এটা অন্যায়-অন্যায্য। আমরা এর প্রতিকার চেয়ে সমাবেশ-মানববন্ধন করেও কোনো ফল পাইনি। সরকারের কাছে দাবি জানাই, কোনোভাবেই যেন বাসা ভাড়া না বাড়ানো হয়, প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করতে হবে।’
শিক্ষার্থীদের অবস্থাও নাজুক
মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের অবস্থাও একই রকম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার পাখি জানান, টিউশনি ও খণ্ডকালীন চাকরি করেও মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না। ভাড়া আর খাবারের খরচ বেড়েছে। আগে একটু সঞ্চয় থাকতো, এখন সেটুকুও নেই।
ইয়ারুল নামে অপর শিক্ষার্থী বলেন, ‘গত সপ্তাহে মেস মালিক নোটিশ দিয়ে জানিয়েছেন নতুন বছর থেকে ৫০০ টাকা করে রুম প্রতি বেশি দিতে হবে। মালিকের নাকি অনেক বাড়তি খরচ হচ্ছে বিদ্যুৎ বিল, পানি ও গ্যাস বিলের পেছনে। এ কারণে তিনি বাড়তি ভাতা নেবেন।’
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
বাংলাদেশে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ অনুযায়ী, বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া দুই বছরের মধ্যে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে মালিকেরা প্রায়ই নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন।
আইনজীবী আক্তারুজ্জামান ডালিম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী অযৌক্তিক ভাড়া আদায়যোগ্য নয়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট চুক্তি না থাকায় ভাড়াটিয়ারা আইনি পথে যেতে ভয় পান বা আগ্রহ হারান।’
মালিকদের যুক্তি ও বাস্তবতা
অন্যদিকে, বাড়ির মালিকদের দাবি, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যয় বেড়েছে। মগবাজারের বাসা মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সব খরচ বাড়ছে। আমাকেও তো চলতে হবে।’
কে কোথায় কত আয় করলে থাকতে পারে?
রিহ্যাবের এক গবেষণায় উঠে এসেছে— ঢাকায় ২০ হাজার টাকা আয়েও মানুষকে থাকতে হচ্ছে ঝুপড়ি ঘরে। মানসম্মত আবাসনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৫০ হাজার টাকা মাসিক আয়। এক লাখ টাকার কম আয় হলে ভালো মানের ফ্ল্যাট পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসির উদ্যোগ
বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আগামী ২৭ নভেম্বর বাড়ি মালিক ও ভাড়াটিয়াদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। বৈঠকে বাড়িভাড়া নির্ধারণের হার ও বছরে ভাড়া বাড়ানোর বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা জানান, দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই এ বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমে নগরবাসীর জন্য একটি কার্যকর সমাধান বের করার আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডিএনসিসির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টে নানান প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বিদ্যমান বাসাভাড়া নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ এলাকাভিত্তিক স্কয়ার ফিট অনুযায়ী সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।
ডিএনসিসি জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন বলেন, বৈঠকে হাউজিং প্রতিষ্ঠান, কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধি ও ভাড়াটিয়ারা নিজ নিজ মতামত তুলে ধরবেন। সেই মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডিএসসিসির নীরবতা
অন্যদিকে, ৭৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচি নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ এলে করপোরেশন তা সমাধানের চেষ্টা করে। একই শহরে ডিএনসিসির উদ্যোগের বিপরীতে ডিএসসিসির এ নীরবতা নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তুলছে।
ইএআর/এমএএইচ/জেআইএম
What's Your Reaction?