বর্জ্যের বোঝা বইছে পুরানপাড়ার মানুষ
নগরীর বুকে দুই দশকের পুরোনো ময়লার ভাগাড়ে অতিষ্ঠ বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউনিয়া পুরানপাড়া ময়লাখোলা এলাকার হাজারো বাসিন্দা। দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব, শ্বাসকষ্ট ও পরিবেশদূষণে নিত্যদিনের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তাদের। আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘেরা এই ডাম্পিং স্টেশন দ্রুত সরিয়ে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবি স্থানীয়দের। সিটি করপোরেশনও শিগগির স্থানান্তরের আশ্বাস দিয়েছে। জানা গেছে, পুরানপাড়া ময়লাখোলার পাশে প্রায় তিন হাজার লোকের বসবাস। এর পাশেই রয়েছে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি কলেজসহ অন্তত ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১০-১২টি মসজিদ। ভাগাড়ের ৪০ গজ দূরেই রয়েছে কাউনিয়া হাউজিং প্রকল্প। সেখানে অন্তত ৫০০ পরিবারের বাস। এই ময়লাখোলাই এখন এলাকার প্রধান সমস্যা। তবে শিগগির এ ময়লাখোলা স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনে প্রশাসক। ‘এত দুর্গন্ধ যে ঘরে বসে খেতে পারি না। শ্বাস কষ্ট হয়, খাওয়ার সময় দুর্গন্ধ নাকে লেগেই থাকে। গন্ধে রাতে ঘুমাতেও পারি না। তাছাড়া যাওয়া-আসার পথে কুকুরের উৎপাতও সহ্য করতে হয়’ ময়লাখোলা এলাকার বাসিন্
নগরীর বুকে দুই দশকের পুরোনো ময়লার ভাগাড়ে অতিষ্ঠ বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউনিয়া পুরানপাড়া ময়লাখোলা এলাকার হাজারো বাসিন্দা। দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব, শ্বাসকষ্ট ও পরিবেশদূষণে নিত্যদিনের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তাদের। আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘেরা এই ডাম্পিং স্টেশন দ্রুত সরিয়ে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবি স্থানীয়দের। সিটি করপোরেশনও শিগগির স্থানান্তরের আশ্বাস দিয়েছে।
জানা গেছে, পুরানপাড়া ময়লাখোলার পাশে প্রায় তিন হাজার লোকের বসবাস। এর পাশেই রয়েছে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি কলেজসহ অন্তত ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১০-১২টি মসজিদ। ভাগাড়ের ৪০ গজ দূরেই রয়েছে কাউনিয়া হাউজিং প্রকল্প। সেখানে অন্তত ৫০০ পরিবারের বাস। এই ময়লাখোলাই এখন এলাকার প্রধান সমস্যা।
তবে শিগগির এ ময়লাখোলা স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনে প্রশাসক।
‘এত দুর্গন্ধ যে ঘরে বসে খেতে পারি না। শ্বাস কষ্ট হয়, খাওয়ার সময় দুর্গন্ধ নাকে লেগেই থাকে। গন্ধে রাতে ঘুমাতেও পারি না। তাছাড়া যাওয়া-আসার পথে কুকুরের উৎপাতও সহ্য করতে হয়’
ময়লাখোলা এলাকার বাসিন্দা শাহিন হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, বর্জ্যের দুর্গন্ধে ছেলে-মেয়ে ঘরের বাহিরে যেতে চায় না। সারাদিন ঘরে বসে মোবাইল দেখে। কোনো আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসে না। অবস্থা এমন যে বাড়ি বিক্রি করে চাইলেও কেউ কিনতে চাচ্ছে না। ঠিকমতো দামও কেউ বলে না।

শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভার
তিনি আরও বলেন, এই বর্জ্যের জন্য সারাবছর এলাকায় মশা-মাছির উপদ্রব থাকে। শীত ও বৃষ্টির সময় এই সমস্যা আরও বেশি হয়। কারণ শীতে পুরা ময়লাখোলার ময়লায় আগুন ধরায় দেওয়া হয়। তখন বাতাসে এর দুর্গন্ধ চারোদিক ছড়িয়ে পড়ে।
ময়লাখোলা সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘ দুই দশক আগে বরিশাল প্রথম শ্রেণির পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়েছে। এত বছরে বিভাগীয় এ শহরের যেমন আয়তনে বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে লোকসংখ্যা। কিন্তু এত বছরেও এই শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন হয়নি।
ময়লার ভাগাড়ের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ জনজীবন/ ছবি: জাগো নিউজ
তিনি বলেন, গোটা নগরীর বর্জ্য এখন ফেলা হচ্ছে নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউনিয়া এলাকার বিশাল এই স্থানজুড়ে। ওই ভাগাড়ের চারপাশেই আবাসিক এলাকা। এই ময়লার ভাগাড় নিয়ে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। সারা বছরই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকতে হয়। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সবারই এজমাজনিত রোগ লেগেই থাকে। দুর্ভোগ এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া করে থাকছেন। এই খোলা ময়লার ভাগাড় এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ায় এই এলাকার বাসিন্দাদের প্রধান দাবি।
কাউনিয়া পুরানপাড়া ময়লাখোলা এলাকার স্কুলছাত্র শাহারিয়ার ইসলাম শুভ্র বলেন, এত দুর্গন্ধ যে ঘরে বসে খেতে পারি না। শ্বাস কষ্ট হয়, খাওয়ার সময় দুর্গন্ধ নাকে লেগেই থাকে। গন্ধে রাতে ঘুমাতেও পারি না। তাছাড়া যাওয়া-আসার পথে কুকুরের উৎপাতও সহ্য করতে হয়।
‘নগরীতে প্রতিদিন ২০০ টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্য অপসারণে ৭২৬ জন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থানটি স্থানান্তরের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি জমি দেখা হয়েছে। এখন কাগজপত্র যাচাই-বাছাই চলছে। শিগগির জমি নির্ধারণ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থানটি স্থানান্তর করা হবে’
বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর ২০০২ সালে ৬ একর জমির ওপর ময়লা ফেলার জন্য ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউনিয়া পুরানপাড়ায় জমি অধিগ্রহণ করে সিটি করপোরেশন। এরপর ২০০৪ সাল থেকে ৩০টি ওয়ার্ডের ময়লা ফেলা শুরু হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে পুরানপাড়া এলাকাটি ময়লাখোলা নামে পরিচিতি লাভ করে।
বিসিসি সূত্রে আরও জানা গেছে, ৫৮ বর্গকিলোমিটারের বরিশাল সিটিতে প্রায় ছয় লাখ মানুষের বসবাস। সেই মানুষের ব্যবহৃত গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা থেকে নগরীতে প্রতিদিন উৎপন্ন হয় প্রায় ২০০ টন বর্জ্য। ৩০টি ওয়ার্ডে বিভক্ত এ সিটির বর্জ্য অপসারণে বিসিসির পরিচ্ছন্ন শাখায় স্থায়ী ও অস্থায়ী নিয়োগে রয়েছেন ৭২৬ জন কর্মী। পরিচ্ছন্নকর্মীরা বর্জ্য সংগ্রহের পর ট্রাকে কাউনিয়া পুরানপাড়ার ময়লাখোলা ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে ফেলে।
তবে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পরও নগরীতে গড়ে ওঠেনি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সেই পুরানো সনাতন পদ্ধতিতেই চলছে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনটি নগরীর মধ্যে হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। তাছাড়া উন্মুক্তভাবে ফেলা বর্জ্যের ময়লা পানি পাশের সাপানিয়া খালে গিয়ে নামছে। সেই খালের পানি যাচ্ছে কীর্তনখোলায়। এতে কীর্তনখোলা নদীর পানিও দূষিত হচ্ছে।
‘ময়লা খোলার দুর্গন্ধে ছেলে-মেয়ে ঘরের বাহিরে যেতে চায় না। সারাদিন ঘরে বসে মোবাইল দেখে। কোনো আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসে না। অবস্থা এমন যে বাড়ি বিক্রি করে চাইলেও কেউ কিনতে চাচ্ছে না। ঠিকমতো দামও কেউ বলে না’
সরেজমিনে পুরানপাড়া ময়লাখোলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য পলিথিন, কাগজ, খাবারের উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের ময়লার উটকো গন্ধ এলাকাজুড়ে। ময়লার স্তূপের ওপর কুকুর, শূকর, কাক ও বিভিন্ন ধরনের পাখি খাবার খাচ্ছে। দুর্গন্ধে নাক চেপে চলাচল করছেন পথচারীরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলেন, নগরীর অলিগলি ও সড়কের অন্তত দেড়শ স্থানে খোলা ডাস্টবিনে (অস্থায়ী) আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে খোলা ডাস্টবিনে। পরে সেই বর্জ্য খোলা ট্রাকে নেওয়া হচ্ছে উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনে। এতে নগরীর পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে আরও আন্তরিক হতে হবে। কার্যকর ও স্বাস্থ্যসম্মত বর্জ্য সংগ্রহ পদ্ধতি, জনসচেতনতা বাড়ানো, ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা উন্নত করা, বর্জ্য পৃথকীকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন শোধন পদ্ধতি ব্যবহার করে ডাম্পিং স্টেশনে যাওয়া বর্জ্যের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে।
বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস.এম. মনজুর-এ-এলাহী বলেন, আমরা সিটি করপোরেশনের সভায় বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি, অচিরেই ময়লার ভাগারটি স্থানান্তর করা হবে। তখন আর এ জনদুর্ভোগ থাকবে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, এই ময়লার ভাগাড় পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজ না, এটা স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের কাজ। বিষয়টি সমাধানে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কাজ করবেন বলে আসা রাখছি। এছাড়া ওই এলাকার যদি কেউ অভিযোগ করে তাহলে আমরা বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করবো।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী জাগো নিউজকে বলেন বলেন, নগরীতে প্রতিদিন ২০০ টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্য অপসারণে ৭২৬ জন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থানটি স্থানান্তরের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি জমি দেখা হয়েছে। এখন কাগজপত্র যাচাই-বাছাই চলছে। শিগগির জমি নির্ধারণ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থানটি স্থানান্তর করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পুরাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাদ দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণ করা প্রক্রিয়া চলছে। এজন্য চীন ও কোরিয়ার দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে হয়েছে। এর মধ্যে কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কথাবার্তা ফাইনাল হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থানটি পরিদর্শন করে গেছেন। এখন নতুন জায়গা নির্ধারণ করা হলেই আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন জাগো নিউজকে বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরো ঢেলে সাজানো হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের মতো বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এজন্য দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা হয়েছে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এরই মধ্যে কয়েকটি জায়গা দেখা হয়েছে। জায়গা নির্ধারণ করা হলেই পুরানো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থানটি স্থানান্তর করা হবে। সেই সঙ্গে আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনা হবে।
এনএইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?

